বানররা সত্যিই সমুদ্র বন্ধন করেছিল? রামবাহিনী কি সমুদ্র পেরিয়ে লঙ্কায় পৌঁছেছিলেন? রামায়ণে উল্লিখিত রাবণের লঙ্কা কি বর্তমানের শ্রীলঙ্কা। যদি শ্রীলঙ্কা হয়, তাহলে নিশ্চয় সমুদ্রবন্ধনের মতো দূরহ কাজ করার প্রয়োজন আছে। এখানেও প্রশ্ন, লঙ্কা লক্ষ করে শত্রুপক্ষ সেতুবন্ধনের মতো কর্মজ্ঞ হয়ে গেল, আর রাবণ ঘৃণাক্ষরেও জানতে পারলেন না? না, সমুদ্রবন্ধনের মতো কোনো কর্মকাণ্ডই ঘটেনি। দুস্তর সমুদ্রও কারোকে অতিক্রম করতে হয়নি, লঙ্কা পৌঁছোতে যদি দুস্তর সমুদ্র পেরতে হত, তাহলে সেই সমুদ্র অতিক্রম করে দাক্ষিণাত্য জুড়ে রাক্ষসদের অবাধ বিচরণ থাকত না, এত আসা-যাওয়া থাকত না।
রামায়ণে উল্লিখিত লঙ্কা বর্তমানের শ্রীলঙ্কা নয়। তাই সমুদ্রবন্ধনের অতিরঞ্জিত গল্পটিও ধোঁপে টেকে না। কোনো ইতিহাসবিদ কিন্তু কখনোই এই তত্ত্বে বিশ্বাস করে না। কারণ শ্রীলঙ্কা বা ‘লঙ্কা’ নামটি আধুনিক, ১৯৩৫ সালে সিংহলের নামকরণ করা হয় শ্রীলঙ্কা। এর আগে শ্রীলঙ্কার নাম ছিল ‘সিংহল’, আর সিংহল নামটি এসেছে বঙ্গদেশের রাঢ়ের নির্বাসিত রাজপুত্র বিজয় সিংহের নামানুসারে। এই রাজপুত্র নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে খ্রিস্টজন্মের ৫৪৩ বছর আগে এই দেশ জয় করেন ও নিজনামে এর নামকরণ করেন, ‘সিংহল’। এর আগে অর্থাৎ ৫৪৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সিংহলের নাম ছিল ‘তাম্রপর্ণী’। রামের লঙ্কাজয়ের কাহিনি আমরা বাল্মীকি রচিত মহাকাব্য রামায়ণ থেকে জানতে পারি, আর রামায়ণের রচনাকাল Buckner B.Trawick–এর মতে খ্রিস্টজন্মের ২০০-ঊর্ধ্বে ৫০০ বছর আগে। তার মানে রামায়ণ রচনাকালে শ্রীলঙ্কা বলে কোনো দেশ ছিল না, ছিল ‘সিংহল। রামের লঙ্কা জয়ের কয়েক শত বছর পর রামায়ণ লেখা হয়েছে ধরে নিলেও বলতে হয় তখন এর নাম ছিল “তাম্রপর্ণী’ নিশ্চিত। আর আধুনিক শ্রীলঙ্কাই যে রামায়ণে বর্ণিত লঙ্কা নয়, তার সবথেকে শক্ত প্রমাণ দক্ষিণ ভারতের এত দূর পর্যন্ত কস্মিনকালেও আর্য অধিকারভুক্ত ছিল না। দক্ষিণ ভারতের একমাত্র আর্য জনপদ হচ্ছে অস্মক। মালায়লাম, কানাড়ি, তামিল, তেলেগু এসব দক্ষিণ ভারতীয়দের গায়ের রং ও শারীরিক আকার নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে এদের শরীরে বিন্দুমাত্রও আর্যরক্ত নেই। নৃবিজ্ঞান মতেও এরা অবিমিশ্র অনার্য দ্রাবিড় জাতি, আর্যরা যদি সত্যিই শ্রীলঙ্কা জয় করত তাহলে তার আগে তাঁদের নিশ্চিতভাবে দক্ষিণ ভারতের বিশাল ভূখণ্ড জয় করতে হত।
বস্তুত লঙ্কা একটি লম্ব বা ত্রিকূট পর্বতে অবস্থিত ক্ষুদ্র পার্বত্য রাজ্য, যার চতুর্দিক বিস্তীর্ণ পরিখা দিয়ে ঘেরা। লঙ্কা সম্ভবত কোনো বিশেষ দেশের নাম ছিল না, সোনায় মোড়া লঙ্কা ছিল প্রাসাদের নাম। যাই হোক, প্রাচীন যুগে রাজারা নিজের রাজ্যকে সুরক্ষিত রাখতে এবং শত্রুরা যাতে অতর্কিতে আক্রমণ করতে না-পারে সেজন্যই রাজ্যের চারদিকে গভীরভাবে পরিখার সৃষ্টি করে রাখতেন সেই রাজ্যের রাজারা, রাবণ হয়তো সেই পরিখা সমুদ্র কেটে রাজ্যের চারদিক ঘিরেছিলেন। রামবাহিনী যথাসম্ভব সেই পরিখাই অতিক্রম করেছেন সেতু নির্মাণ করে। বাল্মীকির যুদ্ধকাণ্ডে বলা হয়েছে, মহাবল বানরগণ সমুদ্রবন্ধনের জন্য হস্তীতূল্য বৃহৎ পাথর উৎপাটিত করেছেন। না, কাঁধে তুলে নয়। যন্ত্রযোগেই সেই কাজ সমাধা হয়েছিল–
“হস্তিমাত্রান মহাকায়াঃ পাষাণাংশ্চ মহাবলাঃ/পর্বতাংশ্চ সমুৎপাট্য যন্ত্রৈঃ পরিবহন্তি চ।”
পার্শ্ববর্তী জঙ্গল থেকে ভারি ভারি গাছের গুঁড়ি কেটে আনা হয়, আনা হয় বড়ো বড়ো পাথর। নলের নেতৃত্বে শুরু হল সেতু তৈরি কাজ–“পাষাণ ও পর্বত বেগে যেমন প্রক্ষিপ্ত হইতেছে সমুদ্রের জল অমনি উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিতেছে এবং ঊর্ধ্ব হইতে আবার তৎক্ষণাৎ নিম্নদিকে নামিতেছে।” অবিশ্রান্ত কর্মতৎপরতার পর পাঁচদিনে সেতুনির্মাণ করে দিলেন বানরসেনাপতি নল। ভাবুন, টানা পাঁচদিন ধরে তুমূল কলরবে সেতু তৈরি হয়ে গেল, অথচ রাবণ জানতে পারল না, দ্বাররক্ষীরা জানতে পারল না। সবাই পরম নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছিলেন নাকি? গুপ্তচরেরা কী করছিলেন?
রামায়ণের লঙ্কাকে একটি দ্বীপ বলা হয়েছে। আর এই দ্বীপে যাওয়ার জন্য রাম বানরসেনাদের দ্বারা নির্মিত সেতুর উপর দিয়েই সাগর পার হয়েছিলেন। ভারত ও শ্রীলঙ্কার মাঝে অবস্থিত আদমসেতু (Adam’s Bridge)-কে ‘রামসেতু’ নামে আখ্যায়িত করে থাকেন। রামায়ণ মতে, “রাম বানরের সেতুর সাহায্যে সাগর পেরিয়ে লঙ্কায় পৌঁছান”। অথচ রামেশ্বরমের মন্দিরের রেকর্ড অনুযায়ী, ১৪৮০ সালেও এই রামসেতুর সাহায্যে পায়ে হেঁটে শ্রীলঙ্কা যাওয়া যেত। তাদের কথাটা কি সাংঘর্ষিক নয়? পায়ে হেঁটেই যদি যাওয়া যেত ১৪৮০ সাল পর্যন্ত তাহলে তো ১ কোটি ২০ লাখ বছর আগেও রাম তাঁর সেনাদল ও বানরসেনাদের নিয়ে পায়ে হেঁটেই শ্রীলঙ্কা যেতে পারতেন, তাহলে আর বানরদের এত কষ্ট করে সেতু বানানোর কী প্রয়োজন ছিল? কিছু বিশেষজ্ঞ নামধারী ব্যক্তি সম্প্রতি দাবি করেছে যে আদম সেতুই বানরদের তৈরি করা সেই সেতু।
বাংলাদেশের ইতিহাসবেত্তারা বলেন, বাংলাদেশের কুমিল্লাই রামায়ণের লঙ্কা। এই কুমিল্লা’ শব্দটি এসেছে। ‘কমলঙ্কা’ শব্দ থেকে। শ্রী শ্রী ভঙ্গাল মৃগাঙ্কস্য পট্টিকেরা রণবঙ্কমল্ল দেবের তাম্রশাসনে এটিকে ‘কমলঙ্কা’ নামেই আখ্যায়িত করা হয়েছে। কিন্তু এই কমলঙ্কা আধুনিক কুমিল্লা শহর ছিল না। বরং এর অবস্থান লালমাই ময়নামতি পাহাড়ের অদূরেই এর দুর্গপ্রাচীরের ধ্বংসাবশেষের দৈর্ঘ্যই ১ মাইল। নলীনকান্ত ভট্টশালী ও আয়েশা বেগমের মতে এটিই প্রাচীন কমলঙ্কা, আর রাবণের রাজধানী লঙ্কাই বিবর্তনের মাধ্যমে কমলঙ্কায় রূপান্তরিত হয়। সম্প্রতি মেহেরকুল দুর্গের ধ্বংসাবশেষে বড়ো দাঁত ও চোখের গর্তের চারিপাশের লাল রঙের চিহ্নবিশিষ্ট ‘রাক্ষস মুখোস’ এই কথাকেই সমর্থন দেয়। সে যুগে প্রত্যেক দুর্গের চারিপাশে গভীর ও চওড়া পরিখা খনন করা হত, পরিখাগুলি এত গভীর করে খনন করা হত যে ১২ মাস তাতে জল থাকত। আর সেকারণেই এগুলিকে দ্বীপ বলেই মনে হত। কমলঙ্কা দুর্গনগরীর তিনদিকে পরিখার চিহ্ন আজও দেখা যায়। আর-এক দিকে বয়ে যেত ক্ষিরোদা নদী, যার খাত আজও দেখা যায়। লঙ্কা যদি শ্রীলঙ্কাই হত তাহলে ভারত থেকে শ্রীলঙ্কা যাওয়ার পথে ছিল পক প্রণালী ও আদমসেতু। একটা প্রণালীর উপর দিকে কি আদৌ সেতু তৈরি করা। সম্ভব? প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন ও মধ্যযুগে পরিখা, নদী পেরুবার জন্য কাটারি ও মানিকী এই দুই ধরনের নৌকার সাহায্যে সেতু নির্মাণ করা হত। এধরনের নৌকার সেতু বাংলাদেশে এখনও দেখা যায়।
