পুরাণশাস্ত্রাদি ঘেঁটে জানা যায়, হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলের ফর্সা-ফর্সা অপ্সরা এবং দাক্ষিণাত্যের কালা-কালা সুন্দরীদের সঙ্গে দেবসম্প্রদায়ের পুরুষদের অবাধ যৌনমিলনের ফলেই দেব-ঔরসজাত বানর জাতীয়রা জন্ম হতে থাকে। এর ফলে আর্য-অনার্য সংমিশ্রণে এইসব বানরপ্রজাতিরা বিভিন্ন দেহবর্ণ লাভ করে। বস্তুত সুগ্রীব ও অন্যান্য বানরদের গায়ের রং ছিল হেমপিঙ্গল। অবশ্য জিনগত কারণে কিছু বানর কৃষ্ণবর্ণও ছিল। দেবমন্ত্রী ব্রহ্মা এঁদেরকে নিয়েই কিষ্কিন্ধ্যায় একটি সেনাদলও তৈরি করে রাখলেন, যাতে প্রয়োজনে রামকে সাহায্য করতে পারে।
বাল্মীকি তাঁর রচিত রামায়ণে ১০৮০ বার ‘বানর’ শব্দটি উচ্চারণ করেছেন। ৪২০ বার বানরদের ‘কপি’ সম্বোধন করেছেন। বানরদের ‘হরি’ সম্বোধন করা হয়েছে ৫৪০ বার। ছদ্মবেশ ধারণে পটু হওয়ায় বানরদের ‘কামরূপীন’ও বলা হয়েছে। হেমপিঙ্গল ও কৃষ্ণকায় দুই রঙেরই বানর ছিল। কৃষ্ণকায় বানরদের বলা হয়েছে ‘গোলাঙ্গুলা’। বলা হয়, আর্যদেবতাদের আনুকূল্যেই আর্য-অনার্য মিশ্রণে বানরদের জন্ম হয়েছে। বলা হয়েছে, রাবণের সঙ্গে রামচন্দ্রের যুদ্ধের কাজে লাগে, সেই কারণে দেবমন্ত্রী ব্রহ্মা বানরদের নিয়ে সহায়ক বাহিনী তৈরি করেছেন। রামায়ণে উল্লেখিত বানররা শাখামৃগ নয়। আসলে এরা টোটেমীয় বানর সম্প্রদায়। কোনো দেবদেবতা বা দেবদেবতাদের ঔরসজাত হতেই পারে।
মনুসংহিতায় এই ধরনের বিজাতীয় যৌনসম্পর্কের ফলে সন্তান জন্মের উল্লেখ আছে। যেমন–চণ্ডাল পুরুষের সঙ্গে নিষাদ স্ত্রীর যৌনমিলনের সন্তানকে বলা হত ‘অন্ত্যাবসায়ী’, বৈদেহক ও কারাবরের মিলনজাত সন্তান ‘অন্ধ্র’, ব্রাহ্মণ পুরুষ ও বৈশ্য স্ত্রীলোকের মিলনজাত সন্তান ‘অন্বষ্ঠ’, ব্রাহ্মণ পুরুষ ও অম্বষ্ঠ স্ত্রীর মিলনজাত সন্তান ‘আভীর’, শূদ্র ও বৈশ্যার সন্তান ‘আয়োগব’, ব্রাত্য ব্রাহ্মণ ও সবর্ণা স্ত্রীর সন্তান আবষ্য’, ব্রাহ্মণ পুরুষ ও উগ্র স্ত্রীর সন্তান আবৃত’, ক্ষত্রিয় পুরুষ ও শূদ্রার সন্তান ‘উগ্র’, শূদ্র পুরুষ ও ক্ষত্রিয় স্ত্রীর সন্তান ‘ক্ষত্তা’, চুচুক পুরুষ ও ব্রাহ্মণ স্ত্রীর সন্তান ‘তক্ষক’ ইত্যাদি। অনুরূপ আর্য পুরুষ ও অনার্য স্ত্রীর অথবা অনার্য পুরুষ ও আর্য স্ত্রীর মিলনজাত সন্তান ‘বানর’ হলে অবাক হব কেন? অতএব এঁরা কিলকিলা রকারী প্রজাতি শাখামৃগ মোটেই নয়। অবাঙালিরা যেমন বাঙালিদের ‘কিচিরমিচির’ রবকারী প্রজাতি বলত, পাখি বলত। আর্যদেবতারা তো কেউ বানর ছিলেন না–তাহলে ঔরসজাত সন্তানরা বানর হবে কেন? ‘বানর’ আর্যদেবতাদেরই দেওয়া নামকরণ। প্রখ্যাত স্থপতি বিশ্বকর্মা বানর জাতির কৃতিপুরুষ। কেউ কেউ বলেন অনার্যদের স্থপতি ময়দানব বিশ্বকর্মারই পুত্র। বিশ্বকর্মার দুই পুত্র–ময়দানব ও নল। বানর-স্থপতি নলই লঙ্কা পৌঁছোনোর জন্য সমুদ্রের সেতুনির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন। ময়দানব ও নল দুজনেই পিতার মতো স্বনামধন্য স্থপতি। অনার্য বানর প্রজাতির বিশ্বকর্মা পরে আর্যদের কুক্ষিগত হয়। ঠিক যেমনভাবে অনার্য পশুপতি আর্যদের কৈলাশপতি হয়ে যান।
রামায়ণে উল্লিখিত বানরজাতির বাসস্থানের নিখুঁত বর্ণনা বাল্মীকি দিয়েছেন–“অন্যে ঋক্ষবতঃ প্রস্থানুপতস্তুঃ সহস্রশঃ।/অন্যে নানাবিধাচ্ছৈলান্ কাননানি চ ভেজিরে।” অর্থাৎ বহু সহস্র বানর ঋক্ষবা পর্বতের উপত্যকায় বসবাস শুরু করলেন, বাকি নানা পর্বতে ও কাননে আশ্রয় নিলেন। ঋক্ষবান পর্বতের অবস্থান মনুষ্য-কল্পিত স্বর্গ আকাশে নয়, ঋক্ষবান পর্বত এই ধরাধামেই বিন্ধ্য পর্বতমালার পশ্চিমাংশ। এই পর্বত তুঙ্গভদ্রার তীরে অবস্থিত। এই বানরজাতির স্বতন্ত্র গোষ্ঠী ও গোষ্ঠীপতিদের পরিচয় পাওয়া যায়–“সূর্যপুত্রং চ সুগ্রীবং শত্রুপক্ষং চ বালিনম্।/ভ্রাতরাবুপতস্তুস্তে সর্বে চ হরিযুথপাঃ।/নলং নীলং হনুমন্তমন্যাংচ হরিযুথপান্।”
রামায়ণে গল্পে বানরের সেতুবন্ধনের ব্যাপারটি বেশ জনপ্রিয়। এ গল্পে আছে সমুদ্রকে দু-দিকে সরিয়ে দেওয়া, শিলা যাতে জলে ভাসে সেজন্য প্রতিটি শিলায় শ্রীরাম’ লিখে দেওয়া, কাঠবিড়ালির শিলা বহন করা ইত্যাদি। এখন প্রশ্ন তর্কের খাতিরে যদি ধরেই নিই সমুদ্র দু-দিকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাহলে ‘শ্রীরাম’ লিখে দেওয়া শিলা কোথায় ভাসল? সমুদ্র দু-দিকে সরিয়ে দেওয়া কি আদৌ সম্ভব? যদি সম্ভব হয় এমন কোনো জলযান নির্মাণ করা গেল না, যাতে চড়ে লংকায় পৌঁছোনো সম্ভব। রামায়ণে প্রচুর আকাশযান বা বিমানের কথা উল্লেখ আছে। যে বিমান রাবণ ব্যবহার করেছেন, হনুমান ব্যবহার করেছেন, রাম ব্যবহার করেছেন, আর্যদেবতারা ব্যবহার করেছেন। আকাশযানের ব্যবহার যাঁরা জানেন, তাঁদের জলযান ছিল না! খামোকা সমুদ্র ফাঁক করে, শ্রম নষ্ট করে, সময় নষ্ট করে এ কর্মযজ্ঞের প্রয়োনীয়তা কী? হাজার হাজার বানরসেনা থাকতে সেতুবন্ধনের জন্য কাঠবিড়ালির ভূমিকা কতটকু? কাঠবিড়ালির পক্ষে কি সম্ভব শিলা বহন করা? সেতুবন্ধনের কাজে কাঠবিড়ালিকে আমদানি করেছেন কৃত্তিবাস, বাল্মীকি নয়। আর রামের কোমল স্পর্শে কাঠবিড়ালির পিঠের উপর লম্বা লম্বা দাগগুলি, যা রামচন্দ্রের নখের আঁচড় বল হয়, এটি আমদানি করেন রঙ্গনাথ, বাল্মীকি নয়। তাছাড়া কালাপানি বা সমুদ্র পার করা তো নিষিদ্ধই ছিল, তাহলে কেন সমুদ্র অতিক্রম করার প্রসঙ্গ?
