রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘কাব্যে উপেক্ষিতা’ রচনায় লিখেছেন–“কবিগুরু ইহার প্রতি অনেক অবিচার করিয়াছেন, কিন্তু দৈবক্রমে ইহার নাম যে মাণ্ডবী অথবা শ্রুতকীর্তি রাখেন নাই সে একটা বিশেষ সৌভাগ্য। মাণ্ডবী ও শ্রুতকীর্তি সম্বন্ধে আমরা কিছু জানি না, জানিবার কৌতূহলও রাখি না। ঊর্মিলাকে কেবল আমরা দেখিলাম বধূবেশে, বিদেহনগরীর বিবাহসভায়। তার পরে যখন হইতে সে রঘুরাজকুলের সুবিপুল অন্তঃপুরের মধ্যে প্রবেশ করিল তখন হইতে আর তাহাকে একদিনও দেখিয়াছি বলিয়া মনে হয় না। সেই তাহার বিবাহসভার বধূবেশের ছবিটিই মনে রহিয়া গেল। ঊর্মিলা চিরবধূ-নির্বাকুণ্ঠিতা নিঃশব্দচারিণী। ভবভূতির কাব্যেও তাহার সেই ছবিটুকুই মুহূর্তের জন্য প্রকাশিত হইয়াছিল-সীতা কেবল সস্নেহকৌতুকে একটিবার মাত্র তাহার উপরে তর্জনী রাখিয়া দেবরকে জিজ্ঞাসা করিলেন, বৎস, ইনি কে?’ লক্ষ্মণ লজ্জিতহাস্যে মনে মনে কহিলেন, “ওহহ, ঊর্মিলার কথা আর্যা জিজ্ঞাসা করিতেছেন।’ এই বলিয়া তৎক্ষণাৎ লজ্জায় সে ছবি ঢাকিয়া ফেলিলেন; তাহার পর রামচরিত্রের এত বিচিত্র সুখ-দুঃখ-চিত্ৰশ্রেণীর মধ্যে আর একটিবারও কাহারো কৌতূহল-অঙ্গুলি এই ছবিটির উপরে পড়িল না। সে তো কেবল বধূ ঊর্মিলা-মাত্র।”
রামায়ণে রামের মতো যেমন স্বামী আছেন, তেমনই লক্ষ্মণের মতো স্বামীও আছেন। সীতার মতো যেমন স্ত্রী আছেন, তেমনই ঊর্মিলা-মাণ্ডবী-শ্রুতকীর্তিদের মতো স্ত্রীও আছেন। কৌশল্যা-কৈকেয়ী-মন্দোদরী-সরমার মতো স্ত্রী বা মায়েরাও আছেন। বিভীষণের মতো ভাই যেমন আছেন, তেমনই লক্ষ্মণের মতো ভাইও আছেন। দশরথের মতো পিতা আছেন, রামের মতোও পিতা আছেন। কোনটা ধর্ম? কোনটা অধর্ম? কার ধর্ম অনুসরণযোগ্য?
মহাভারতে বহু জায়গায় রামায়ণের চরিত্র, রামায়ণের পুনরুল্লেখ হয়েছে। রামায়ণের কাছে মহাভারত ঋণী হয়ে আছে। কেবল উপাখ্যান, চরিত্র, ধর্মনীতিই নয়–মহাভারতের শ্লোকের সঙ্গে রামায়ণের বহু শ্লোক হুবহু মিলে যায়। বহু জায়গায় মহাভারতের বহু চরিত্র রামায়ণকে রামায়ণে আদর্শ চরিত্রগুলিকে অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। মহাভারতের বন পর্ব, দ্রোণ পর্ব, শান্তি পর্বে রামোপাখ্যানের উল্লেখ আছে। রামায়ণ গ্রন্থটি সামনে রেখে মহাভারত পাঠ করলে চোখে আঙুল দিয়ে বোঝা যায় কেবল গল্পগুলিই নেওয়া হয়নি–রামায়ণে শ্লোক, শ্লোকাংশ, শ্লোকার্ধ সবই নেওয়া হয়েছে। এমনকি বেশকিছু চরিত্রও যেমন রামায়ণে আছে, মহাভারতেও পেয়েছি। মহাভারতের বনপর্বে রামের উপাখ্যানের বক্তা মহর্ষি মার্কণ্ডেয়৷ এই বনপর্বে মোট আঠারোটি অধ্যায়ে রাম বিষয়ক উপাখ্যান বর্ণিত হয়েছে। রাবণ প্রমুখ রাক্ষস জাতির জন্ম ও তপস্যার কাহিনি রামায়ণে উত্তরকাণ্ডেই বর্ণিত হয়েছে, যা প্রক্ষিপ্ত হিসাবে আলোচিত। কিন্তু মহর্ষি মার্কণ্ডেয় সেই কাহিনি মহাভারতের বর্ণনা করেছেন। রামায়ণের উত্তরকাণ্ডে উল্লিখিত রাক্ষস প্রমুখদের বিষয়ে আলোচিত হলেও, আদিকাণ্ডের অশ্বমেধ যজ্ঞ, দশরথের পুত্রলাভ, পুত্রেষ্টি যাগযজ্ঞ, তাড়কা হত্যা, রামের হরধনু ভঙ্গ, সীতার সঙ্গে বিবাহ, অহল্যার পাষাণমুক্তির উপাখ্যানের মতো জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি মহাভারতে বর্ণিত হয়নি। এই উপাখ্যানে যেমন অনেক গৌণ বিষয় বাদ পড়েছে, তেমনই উভয়ের ঘটনামূলক অনৈক্যও লক্ষ করা যায়। সেই রামোপাখ্যানে নতুন নতুন চরিত্রও সংযোজিত দেখা যায়। রামায়ণের আদিকাণ্ড কি তবে মহাভারত রচনার পর সংযোজিত হয়েছে!! তাই-বা বলি কী করে! দণ্ডকারণ্যে বিরাধ হত্যা দিয়ে রামায়ণের অরণ্যকাণ্ডের শুরু হয়েছে, সেই কাহিনিও মহাভারতে আসেনি–অথচ এ কাহিনিতেই সীতা প্রথম পরপুরুষ দ্বারা নিগৃহীতা হন, লাঞ্ছিত হন। শরভঙ্গ মুনির আগুনে প্রবেশ এবং কুমারে পরিণত হয়ে ব্রহ্মলোকে যাওয়ার রোমাঞ্চকর কাহিনিও মহাভারতে নেই, যা রামায়ণে উজ্জ্বলভাবে আছে।
মহাভারতে দশরথের কথা স্মরণ করেছেন, তেমনি রামের কথাও উচ্চারণ করেছেন সঞ্জয়–
“মরুং মনুমিক্ষবাকুং গয়ং ভরতেমব চ।
রামং দাশরথিঞ্চৈব শশবিন্দু ভগীরথ৷৷”(মহাভারত ১/১/২২৭)
কিংবা রাবণকেও দেখা যাচ্ছে “রামায়ণমুপাখ্যানমত্রৈব বহুবিস্তরম।/যত্র রামেণ বিক্রম্য নিহতো রাবণো যুধি।”(১/২/২০০) রামায়ণের দশরথ ও রামচন্দ্রের অনুষ্ঠিত ‘অশ্বমেধ যজ্ঞ’-এর ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে। মহাভারতের ৩১ অধ্যায়ে ঘটোৎকচ অস্ত্রপ্রয়োগে অর্জুকে জামদগ্যের সমান এবং যুদ্ধে রামের সমকক্ষ বলা হয়েছে–
“কার্তবীর্যসমো বীর্যে সাগরপ্রতিমো বলে।
জামদগ্ন্যসমো হ্যন্ত্রে সংখ্যে রামসমোঅর্জুনঃ।”
লোমশমুনি যুধিষ্ঠিরের কাছে রাম কর্তৃক পরশুরামের তেজ কীভাবে নষ্ট করেছিলেন, সেই বর্ণনা করেছেন। যুধিষ্ঠিরকে বলেছেন–
“শৃণু রামস্য রাজেন্দ্র ভার্গবস্য চ ধীমতঃ।
জাতত দশরথস্যাসীৎ পুত্রো রামো মহাত্মনঃ।”
গন্ধমাদন পর্বতে ভীমের সঙ্গে হনুমানের দেখা হলে হনুমান ভীমের পরিচয় জানতে চান।ভীম সীতার জন্য সমুদ্রলঙ্ঘনকারী হনুমানের ভাই বলে পরিচয় দেন–“রামপত্নীকৃতে যেন শতযোজনবিস্তৃতঃ।/সাগরঃ প্লবগেণে ক্রমেণৈকেন লঙ্ঘিতঃ।” মহাভারতের কাছে রামায়ণ যেন একমাত্র দৃষ্টান্ত। রামায়ণের কাছ শিক্ষা নিয়েছে মহাভারত, বারবার–বাঁকে বাঁকে। দ্রৌপদী যখন কীচকের দ্বারা অপমানিতা হন, তখন ভীম সীতার কথা বলেন, বলেন–“রক্ষসা নিগ্রহং প্রাপ্য রামস্য মহিষী প্রিয়া। ক্লিশ্যমানাপি সুশ্রোণ রামমেবান্ধপদ্যত।” এমনকি ধৃতরাষ্ট্র সঞ্জয়ের কাছে অশ্বত্থামার গুণাবলির বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন–অশ্বত্থামা বেদবিদ, ব্রতপরায়ণ, ধনুর্বেদ বিশারদ এবং দাশরথি রামের মতো সমুদ্র-গম্ভীর প্রকৃতির।
বানর এবং হনুমান : মানুষ না ভগবান, নাকি মানবেতর প্রাণীমাত্র?
রামায়ণের বানর কখনোই আমাদের গাছে-গাছে লাফিয়ে বেড়ানো বাঁদর বা শাখামৃগ নয়। যে হনুমানকে দেখে আমরা বলি এই হনুমান কলা খাবি?’–এ হনুমান রামায়ণের হনুমান নয়। রাগ করবেন না, ব্যাখ্যায় আসছি। রামায়ণের উল্লখযোগ্য বানর-চরিত্র বালী ও সুগ্রীব। পৌরাণিক মতে বিশ্বকর্মাকেও বানর জাতীয় বলা হয়েছে। বিশ্বকর্মার আর-এক পুত্র ছিলেন, তিনি বানর যুথপতি নল। এই নল রাম-রাবণের যুদ্ধের প্রাক্কালে সেতুবন্ধনের কাজে বড়ো ভূমিকা পালন করেছিলেন। এঁদেরকে রামায়ণে ‘বানর’ বলেই পরিচয় দেওয়া হয়েছে, বাঁদর নয়। এই বানর কি শাখামৃগ? আমরা সিনেমা-টিনেমাতে দেখেছি এঁদের মুখটা বাঁদর বা হনুমানের মতো, সারাক্ষণ চোখ পিটপিট করে। অনেকটা সুকুমার রায়ের হাঁসজারু কিংবা বকচ্ছপের মতো কিছু একটা–আধা বানর, আধা মানুষ। অর্থাৎ পুরোপুরি মানুষও নয়, আবার পুরোপুরি বাঁদরও নয়। মুখটা বাঁদর বা হনুমানের মতো হলেও বাকি শরীর মানুষের মতো–আবার দীর্ঘ লেজও আছে। এই বানরেরা মানুষের মতো কথা বলে বটে, কিন্তু বাঁদরের মতো লাফায়–এমনকি সমুদ্র-টমুদ্রও পার করে ফেলে! অনেকে এই বানরদের একপ্রকার মনুষ্য প্রজাতি’ মনে করেন। তবে এটা তো ঠিক, একদা ভারতে নানা জাতি প্রজাতির মানুষ বসবাস করতেন, এখনও বসবাস করেন। তাঁদের দেখতেও আলাদা, আকৃতিও আলাদা। প্রাচীন যুগে বহু জাতি থাকলেও আজ হয়তো কিছু জাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
