বস্তুত অহল্যার কোনো পাষাণমূর্তি রামচন্দ্র দেখেননি। অহল্যার পাষাণীরূপের কথা গল্পমাত্র। সম্ভবত রামের ভাবমূর্তি ঐশ্বরিক করতেই এ ধরনের গল্পের অবতারণ করা। বাল্মীকির রামায়ণে অহল্যার পাষাণী মূর্তিতে পরিণতি লাভ ও রামচন্দ্রের পাদস্পর্শে পুনর্জীবন অর্জনের কোনো গল্পই নেই।
মহিরাবণ : মহিরাবণ, রামায়ণে মহিরাবণ নামে একটি চরিত্রের সন্ধান পাই। তবে মহিরাবণ চরিত্রটি বাল্মীকি সৃষ্টি করেননি। তাঁকে পাওয়া যায় কৃত্তিবাসের রামায়ণে। কৃত্তিবাস বলেছেন–মহিরাবণ রাবণের পুত্র ছিলেন। তাঁর নয়টি মাথা ছিল। তিনি শক্ৰধনু নামের এক গন্ধর্ব দেবসভায় নৃত্য করার সময় এক অপ্সরাকে দর্শন করে মুগ্ধ হয় ও তালভঙ্গ করে। ফলে ব্রহ্মা ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁকে রাক্ষস রূপে পৃথিবীতে জন্ম নেওয়ার অভিশাপ দেন। রাবণ বলির কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ফেরার সময় পথের মাঝে গৌতমের স্ত্রী অহল্যাকে দেখে এমনই কামমোহিত হন যে, সেখানেই তাঁর বীর্যপাত (এটা লক্ষণীয়, সেযুগের দেবতা-মুনি-ঋষিদের যখন-তখন গলগল করে সমুদ্র-প্রমাণ বীর্যপাত হয়ে যেত। সেই বীর্য ধারণ করার স্থান খুঁজতেই সংকট উপস্থিত হত। জন্ম নিত জারজ সন্তান। উল্টোদিকে রাজা বা ক্ষত্রিয়দের অবস্থা খুবই করুণ। তাঁদের বীর্যের খবর পাওয়া যায় না। সন্তানের পিতা হতেও অপারগ।) হয়ে যায়। সেই বীর্যে অভিশপ্ত গন্ধর্ব শক্রধনু জন্ম নেন। পৃথিবী থেকে জন্ম নেওয়ায় নাম হয় মহিরাবণ। রাবণ মহিরাবণকে লঙ্কায় এনে তাঁকে মন্দোদরীকে প্রতিপালন করতে দেন। পরে রাবণ ইন্দ্রজিতের সহায়তায় বলিকে পরাজিত করে পাতালের অন্তর্গত কাঞ্চনা নগরী অধিকার করে মহিরাবণকে তাঁর রাজা করেন। মহিরাবণ পিতা রাবণের কাছে প্রতিজ্ঞা করেন তাঁকে যে-কোনো বিপদে স্মরণ করলেই উপস্থিত হবেন। মহিরাবণ নিজের রাজধানীতে উগ্রতারার পুজো করতেন। তাঁরই বরে মহিরাবণ মায়াবিদ্যায় অর্জন করেন। মানুষ ও বানর ব্যতীত কারও হাতে তাঁর মৃত্যু হবে না–এমনই বর পান। মহিরাবণ।
গন্ধমাদন পর্বত থেকে প্রাপ্ত ঔষধি গুণে সবাই পুনর্জীবিত হলে রাবণ তাঁর পুত্র মহিরাবণকে ডাকেন। মহিরাবণকে সব ঘটনা বিস্তারিত বললে মহিরাবণ রাম ও লক্ষ্মণকে পাতালে নিয়ে গিয়ে হত্যা করবে বলে কথা দিলেন। এসময় বিভীষণ পাখির রূপ ধরে সব কথা শুনে রামকে তা জানিয়ে দেন। বিভীষণের পরামর্শে একটি গড় নির্মিত হয়। তার মাঝে রাম ও লক্ষ্মণকে রেখে চারিদিকে পাহারার ব্যবস্থা করলেন। মহিরাবণ বিভীষণের রূপ ধরে সবাইকে মায়াগ্রস্ত করে গড়ে প্রবেশ করেন এবং সুড়ঙ্গ পথে তাঁদের পাতালে নিয়ে যান। বিভীষণ এই সময় সেই স্থানে ছিলেন না। তিনি ফিরে এলে সবাই খুব অবাক হয়ে যায়। কারণ সবাই তাঁকে এইমাত্র গড়ে প্রবেশ করতে দেখেছেন। তাঁরা সবাই গড়ে গিয়ে দেখেন রাম ও লক্ষ্মণ সেখানে নেই। জাম্ববান এক সুড়ঙ্গ লক্ষ করেন। হনুমান সেই সুড়ঙ্গপথে গিয়ে এক বৃদ্ধার কাছে জানতে পারেন দুই সুদর্শন যুবককে পাতালে আনা হয়েছে, যাঁদের দেবী মহামায়ার কাছে বলি দেওয়া হবে। হনুমান মাছির রূপ ধরে কারাবন্দি রাম ও লক্ষ্মণের কাছে গেলেন। অতঃপর নিজের আসল রূপে তাঁদের অভয় দিলেন। পুনর্বার হনুমান মাছির রূপ। ধরে প্রাসাদে স্থাপিত দেবীর কানের কাছে বসে তাঁর অভিমত জানলেন। দেবীও মহিরাবণের বিনাশ চান। হনুমান ফিরে এসে রাম ও লক্ষ্মণকে বললেন মহিরাবণ যখন তাঁদের দেবীকে প্রণাম করতে বলবে তাঁরা যেন বলেন আমরা প্রণাম জানি না। এরপর মহিরাবণ দুই ভাইকে বলি দেওয়ার জন্য মন্দিরে নিয়ে চললেন। তিনি তাঁদের দেবীকে প্রণাম করতে বললেন, কিন্তু তাঁরা হনুমানের নির্দেশমতো কথা বললেন। মহিরাবণ তখন ভূমিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম কীভাবে করে তা দেখাতে লাগলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে হনুমান নিজের রূপ ধরে দেবীর খড়া দিয়ে তাঁর মস্তক দ্বিখণ্ডিত করলেন। অত্যন্ত অন্যায়ভাবে হত্যা করা হল মহিরাবণকে। এমন হত্যা কোনো মাহাত্ম থাকে না হনুমানের, রাম-লক্ষ্মণেরও। রাম-লক্ষ্মণ যুদ্ধের মাধ্যমে মহিরাবণকে হত্যা না-করে কেন চালাকির আশ্রয় নিলেন? কেন নিজেরা হত্যাটা না-করে হনুমানকে দিয়ে করালেন? হনুমানের পিছন দিক থেকে মহিরাবণকে হত্যাই রামদের বাঁচানো গেল, বিনা যুদ্ধেই। আবারও নৈতিকভাবে পরাজিত রাম, বীরধর্মচ্যুত। না-হলে সবই ঠিকঠাক ছিল, সেদিনই রাম-লক্ষ্মণ নিকেশ হয়ে যেত নিশ্চিত।
উপেক্ষিত হয়েছেন লক্ষ্মণের স্ত্রী ঊর্মিলা, ভরতের স্ত্রী মাণ্ডবী এবং শত্রুঘ্নর স্ত্রী শ্রুতকীর্তিও। ঊর্মিলা ছিলেন সীতার বোন, জনকরাজার কন্যা। কুশধ্বজের দুই কন্যা মাণ্ডবী ও শ্রুতকীর্তির সঙ্গে যথাক্রমে ভরত ও শত্রুঘ্নের বিবাহ হয়। স্বয়ং লক্ষ্মণ রামের সঙ্গে ১৪ বছর বনবাসকালে একবারের জন্যেও স্মরণ করেননি। মাণ্ডবী আর শ্রুতকীর্তিকে তো বিবাহ অনুষ্ঠানে ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যায়নি৷ চরিত্র সৃষ্টি করেও পরিণতি প্রাপ্ত হল না কেন? সেই উত্তর কবি কোথাও দেননি। আসলে দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি হয়তো। রামকে নিয়েই কবির সমগ্র চিন্তা এবং ব্যস্ততা। তাই রামের মাথার উপরই সার্চ লাইট, তাই সর্বত্র সমানভাবে আলোকপাত করতে ব্যর্থ হয়েছেন বলা যায়। অন্য কবিরাও বাল্মীকির পথেই নিরাপদে হেঁটেছেন।
