অহল্যাকেও তিনি অভিশাপ দেন, তাঁকে বহু সহস্র বছর বায়ুভক্ষা, নিরাহারা, ভস্মশায়িনী, তপন্তী ও অদৃশ্যা হয়ে থাকতে হবে। রাম তাঁকে আতিথ্য দিলে তবেই তিনি পবিত্র হবেন ও কামরহিত হয়ে স্বামীর সঙ্গে পুনরায় মিলিত হবেন। এরপর গৌতম পর্বতের চূড়ায় গিয়ে তপস্যায় নিমগ্ন হন। মিথিলার পথে এই উপাখ্যান শুনতে শুনতে রাম ও লক্ষ্মণ গৌতম মুনির আশ্রমে এসে উপস্থিত হন, যেখানে অহল্যা পাষাণ হয়ে অবস্থান করছেন। রামের স্পর্শে অহল্যার শাপমুক্তি ঘটে। তিনি ভস্মশয্যা থেকে উঠে এসে অতিথি সৎকার করে। রাম ও লক্ষ্মণও তাঁর পদধূলি নেন। দেবতারা পুষ্পবৃষ্টি ঘটান ও অহল্যার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন। গৌতম ঋষি ফিরে আসেন এবং রামকে পুজো করে স্ত্রীকে নিয়ে তপস্যা করতে চলে যান।
শাস্ত্র ঘেঁটে অহল্যার নানাবিধ কাহিনি পাই। অহল্যা ব্রহ্মার মানস কন্যা ও গৌতম ঋষির স্ত্রী ও শতানন্দের মা। প্রজা সৃষ্টির পর সেই প্রজাদের বিশিষ্ট প্রত্যঙ্গ নিয়ে ব্রহ্মা এক কন্যা সৃষ্টি করেন। অদ্বিতীয়া সুন্দরী ও সত্যপরায়ণা বলে ব্রহ্মা তাঁর নাম রাখেন অহল্যা। ব্রহ্মা তাঁকে গৌতম ঋষির কাছে গচ্ছিত রেখেছিলেন। ইন্দ্র অহল্যার রূপে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বিয়ের কথা ভাবেন। কয়েক বছর বাদে গৌতম অহল্যাকে ব্রহ্মার কাছে ফিরিয়ে দেন। এর ফলে ব্রহ্মা খুশি হয়ে অহল্যার সঙ্গে গৌতমের বিয়ে দেন। এতে ক্রুদ্ধ হয়ে ইন্দ্র অহল্যাকে ধর্ষণ করেছিলেন। এই ধর্ষণের অপরাধে গৌতম ইন্দ্রকে অভিশাপ দেন। বলেন যে, যুদ্ধে তাঁকেও ধর্ষিত হতে হবে এবং যে ধর্ষণ প্রথার সূচনা জগতে ইন্দ্র করলেন তাঁর অর্ধেক পাপ তাঁকেই বহন করতে হবে। শুধু তাই-ই নয়, জগতে দেবরাজের স্থানও স্থাবর হবে না। এক্কেরে হাতে হাতে ফল, ইন্দ্রজিৎ ইন্দ্রকে যুদ্ধে পরাস্ত করে লঙ্কায় বন্দি করে আনেন, সেইসঙ্গে নির্যাতনও করেন। গৌতম অহল্যাকেও ছাড়েননি। তাঁকেও অভিশাপ দেন–“মমাশ্রমা সমীপতঃ যিনিধ্বংস” এবং অহল্যা অপেক্ষাও অধিক সুন্দরী পৃথিবীতে তাঁর রূপের গৌরব খর্ব করতে জন্মগ্রহণ করবেন। অহল্যা স্বামীকে বোঝান যে তিনি নির্দোষ, ইন্দ্ৰ গৌতমের রূপ ধারণ করে তাঁকে ধর্ষণ করেছেন। গৌতম তখন শান্ত হন। অভিশাপ ফিরিয়ে নেওয়া যায় না, মুক্তির পথ বাতলে দেওয়া যায়। তিনি অহল্যাকে বলেন, রামের দর্শনে তিনি পবিত্র হবেন।
‘কথাসরিৎসাগর’-এ অহল্যার সঙ্গে ছুপেছুপে যৌনমিলন করে নিলেও ইন্দ্র ধরা পড়েননি। তিনি মার্জার বা বিড়ালের রূপ ধারণ করে স্থান ত্যাগ করেন। গৌতম স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন–“মার্জার চলে গেছে”। মার্জার’ কথাটি দ্ব্যর্থক–এক অর্থে ‘মৎ-জার’ অর্থাৎ আমার নিষিদ্ধ প্রেমিক, অন্য অর্থে বিড়াল। অন্য একটি মতে, গৌতমের অভিশাপে অহল্যা পাথর হয়ে যান। রামচন্দ্রের পাদস্পর্শে তাঁর মুক্তি ঘটে। আর-এক কাহিনিতে গৌতমের শাপে ইন্দ্রে সারা দেহ যোনিচিহ্নে ভরে যায়। অপর একটি মতে, অহল্যার রূপে মুগ্ধ হয়ে ইন্দ্র মোরগের বেশে মধ্যরাতে আশ্রমে উপস্থিত হন ও ডেকে ওঠেন। ভোর হয়েছে মনে করে ঋষি স্নানে চলে যান। ইন্দ্র গৌতমের ছদ্মবেশে ফিরে এসে অহল্যাকে সম্ভোগ করেন। আবার অন্য একটি মতে জানা যায়, শাপমোচনের পর গৌতম পুত্র শতানন্দকে নিয়ে আশ্রমে ফিরে এসেছিলেন এবং একসঙ্গে বসবাসও শুরু করেন। পদ্মপুরাণেও রামের পাদস্পর্শে অহল্যার মুক্তির কথা আছে।
বালী ও সুগ্রীবের উপাখ্যানে জানা যায়–গরুড়ের দাদা অরুণের দুই পুত্র অহল্যার কাছে পালিত হতে থাকে। গৌতম এঁদের সহ্য করতে না-পেরে শাপ দিয়ে বানরে পরিণত করেন। এরপর ইন্দ্র এঁদের সন্ধানে এলে অহল্যা তাঁকে গৌতমের শাপের কথা জানান। দেবরাজ ছেলেদুটিকে খুঁজে আনেন। বড়োটির লেজ বড়ো বলে নাম হয় বালী ও ছোটোটির গ্রীবা সুন্দর বলে নাম হয় সুগ্রীব। অহল্যা যখন অপ্সরা, তখন আবার গল্পও বদলে যায়–রাজা ইন্দ্রদ্যমের স্ত্রী হলেন অহল্যা। তিনি ছিলেন অপ্সরা, অপ্সরারা হলেন স্বর্গের বেশ্যা। অহল্যার উপাখ্যান শুনে অপ্সরা অহল্যা ইন্দ্র নামে এক অসুরের প্রতি আকৃষ্ট হলে রাজা তাঁকে বিতাড়িত করেন। মহাকবি কালিদাস লিখেছেন–কিছুক্ষণের জন্য অহল্যা যেন ইন্দ্রের পত্নীপদ লাভ করেছিলেন–“বাসবক্ষণকলত্রতাং যযৌ”। অতএব যা হয়েছে তার কোনোকিছুই অহল্যার অমতে হয়নি। তাই প্রণয়ীকে এবং প্রণয়ীর মানসম্ভ্রম বাঁচাতে অহল্যা ইন্দ্রকে পালাতে বললেন–“কৃতার্থাস্মি সুরশ্রেষ্ঠ গচ্ছ শীঘ্রমিতঃ প্রভৈ”।
মীমাংসা দার্শনিক কুমারিলভট্টের মতে, অহল্যার উপাখ্যানটি হল একটি রূপক। ইন্দ্র সূর্য ও অহল্যা রাত্রি বা অন্ধকারের প্রতীক। অহল্যার ধর্ষণ অন্ধকার জয়ের প্রতীক। অন্য মতে, অহল্যা উষার প্রতীক। দিনে ইন্দ্ররূপী সূর্যের উদয় হলে অহল্যারূপী উষা অসূর্যম্পশ্যা হয়। আবার একটি মতে, অহল্যা অনুর্বর জমির প্রতীক।
পণ্ডিত নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী অহল্যা প্রসঙ্গে লিখেছেন–“মূল রামায়ণে অহল্যা গৌতমের শাপে পাষাণী হননি, মুনির কোপাগ্নিতে এবং অনুতাপে তিনি হয়েছিলেন ভস্মশায়িনী, সকলের অদৃশ্যা–বাতভক্ষ্যা নিরাহারা তপন্তী ভস্মশায়িনী। অদৃশ্যা সর্বভূতানাং আশ্রমে অস্মিন বসিষ্যসি। রাম আশ্রমে আসামাত্রই অদৃশ্যা অহল্যা তপঃপ্রভায় উদ্ভাসিতা হয়ে উঠলেন, অথচ প্রাদেশিক রামায়ণগুলির সর্বত্রই অহল্যা হয়ে গেছেন পাষাণী, এবং এর উৎস বোধহয় মহাকবি কালিদাস, যিনি প্রথম বলেছিলেন, “গৌতমবধূঃ শিলাময়ী”। অহল্যার কাহিনি নিয়ে মূল। রামায়ণের সঙ্গে দেশজ রামায়ণগুলির পার্থক্য বিস্তর।”
