এরপর যাতে সীতাকে অপহরণ করা হয়, সে ব্যাপারে রাবণকে প্ররোচনা দিতে থাকেন শূর্পণখা ও অকম্পন। শূর্পণখা যথাসম্ভব নিকৃষ্টভাবে রাবণকে প্ররোচনা দিতে থাকলেন, শত্রুর প্রশংসা করতে থাকলেন–“শোনা গেছে সীতার সৌন্দর্যবর্ণনা, যেমন সীতার নেত্র আকর্ণ আয়ত। মুখ পূর্ণচন্দ্র সদৃশ এবং বর্ণ তপ্ত কাঞ্চনের ন্যায়। সে সুনাসা এবং সুরূপা। উহার কটিদেশ ক্ষীণ, নিতম্ব নিবিড় এবং স্তনদ্বয় স্কুল ও উচ্চ… এইরূপ নারী আমি পৃথিবীতে আর কখনো দেখি নাই।… রাবণ! সেই সুশীলা তোমারই যোগ্য … আমি তোমারই জন্য উহাকে আনিবার উদযোগে ছিলাম।“ আর এই মহান কাজটি করতে গিয়েই রাম তাঁকে প্রচণ্ড অপমান করেছেন। অতএব কেল্লা ফতে!
শূর্পণখা আর অকম্পনের প্ররোচনার ফাঁদে পা দিলেন রাবণ এবং প্রচণ্ড ক্ষুবধ হলেন। রাবণ অকম্পনের কাছে জানতে চাইলেন–“অকম্পন! রাম কি ইন্দ্রাদি দেবগণের সঙ্গে জনস্থানে আসিয়াছে?” অকম্পন স্বীকার করলেন না যে, রাম নয়, পঞ্চবটিতে আর্যদেবতারাই শেষ কথা–রাম উপলক্ষ্যমাত্র। বললেন–“উহার (রামের) সহিত যে সুরগণ (দেবতারা) আইসে নাই ইহা নিশ্চয় জানিবেন।”
অনেক কবি শূর্পণখাকে কুৎসিত কিম্ভুতকিমাকার করে চিত্রায়িত করেছেন। বাল্মীকির রামায়ণে শূর্পণখা বিকৃতদর্শনা নন, তিনি প্রকৃতই অপরূপ সুন্দরী। রক্তোৎপলবর্ণ কখনোই কুরূপা বোঝায় না। যদি কুরূপাই হতেন, তাহলে তাঁকে বিরূপা করার আদেশ দিতেন না লক্ষ্মণকে। বিরূপা হলে কীভাবে আবার বিরূপা করা সম্ভব! বাল্মীকি ছাড়া অন্যান্য কবিয়া রাক্ষস মানেই বোঝাতে চেয়েছেন বিশালাকৃতির শরীর, কুলোর মতো কান, মূলোর মতো দাঁত, আলকাতরা-কালো গায়ের রং, মানুষখেকো ইত্যাদি। রাক্ষস মানে অদ্ভুত কিছু নয়–দৈত্য, নাগ, বানর, ভল্লুক, কুকুর জাতীয় ভিন্ন ভিন্ন মানবগোষ্ঠীমাত্র। মনুষ্যেতর অপর কোনো জীব তারা ছিলেন না। শ্রীকৃষ্ণের জ্ঞাতিগোষ্ঠী যদুবংশের এক শাখা কুকুর জাতি ছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ বিয়েই করেছিলেন ভল্লুক জাতির মেয়ে জাম্ববতাঁকে। শাম্ব কৃষ্ণ-জাম্ববতীরই সন্তান।
কুন্তী, তুলসী, অহল্যাদের মতো শূর্পনখা পরপুরুষে আসক্ত ও দ্বিচারিণী ছিলেন না। তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ প্রেমিকা। তিনি রামকে বলছেন ‘আমাকে ভোগ করো, একথা অতি কষ্টকল্পনা, অসভ্য কবিরাই এমন বর্ণনা লিপিবদ্ধ করতে সক্ষম হবেন। স্বামী বিদ্যুৎজিহ্বার মৃত্যুর পর রাবণ বহু চেষ্টা করেও বোন শূর্পণখার বিয়ে দিতে পারেননি। খর আর দূষণ তাঁকে নিয়ে দেশে দেশে ঘুরেছেন, কিন্তু কোনো পুরুষকেই তিনি পছন্দ করে উঠতে পারেননি। কারণ তাঁর স্মৃতি আর প্রেমে স্বামী ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের জায়গা নেই যে! এমন এক পতিব্রতার চরিত্রহনন করে একমাত্র বিভিন্ন নোংরা যৌন আবেদনপূর্ণ রচনার কথকতাতেই শূর্পণখা চরিত্রটি কুশ্রী কামুকি চরিত্রে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। আসলে এক শ্রেণির অর্বাচীন কবি বাল্মীকির রামায়ণকে বিকৃতি করে রামচন্দ্রকে ‘দেবতা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা এবং শূর্পণখার সঙ্গে দেবতাদের ষড়যন্ত্রের ইতিহাসটি চাপা দেওয়ার সার্থক চেষ্টা। সুনীতি চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘দ্বীপময় ভারত’ গ্রন্থে লিখেছেন–প্ৰাম্বানানের মন্দিরের রামকথা দেখা যায় .. শূর্পণখার একসঙ্গে আট আটটি রাক্ষস স্বামীর কল্পনা (প্রত্যেকেরই মুখ মোষ এবং শুয়োরের ভাব মিলিয়ে তৈরি করা মুখোশে ঢাকা–এই মহিষশৃঙ্গ শুয়োরের আটটি রাক্ষস যেন বর্বরতা ও মূর্খতার প্রতীক)–শূর্পণখার বিরহে আটজন স্বামীর নাচগানেরমাধ্যমে চিত্তের অধৈর্য প্রকাশ এবং দণ্ডকারণ্য থেকে শূর্পণখার ফিরে আসার যুগপৎ আট স্বামীর সোল্লাস নৃত্য–অদ্ভুত ও বীভৎস মিশ্র হাস্যরসের এক অনপ্রেক্ষিত পরিবেশ সৃষ্টির দ্বারা এইভাবে পল্লবিত রামকথা যবদ্বীপে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।
অহল্যা : রামায়ণে অন্তর্ভুক্ত অহল্যার কাহিনিটি বেশ জনপ্রিয়। ‘ভগবান’ রামের পাদস্পর্শে ‘অভিশপ্ত’ অহল্যার পাষাণমুক্তির জন্যই হয়তো। ভক্তিরসে পরিপূর্ণ।
বাল্মীকির রামায়ণে মহর্ষি গৌতম স্নানে গেছেন। কিন্তু কে জানে কী হয়েছিল অহল্যার, তিনি শৃঙ্গারোচিত প্রসাধনে চঞ্চলা হৃদয়ে বসেছিলেন–“সঙ্গমোচিতরূপ-প্রসাধনবতি”। পর্ণশালায় স্বামী গৌতম নেই, কামজর্জরিতা অহল্যা একা। এই অবসরে ইন্দ্রও চলে এসেছেন তাঁর ঘরে, কামনিবৃত্তিতাৰ্থে। কামমোচনের কোনো সময় হয় না। মানুষের কামমোচনের সময় সব ঋতুতে সবসময়–“সঙ্গমং তু অহমিচ্ছামি ত্বয়া সহ সুমধ্যমে”। অহল্যা পূর্বেই ইন্দ্রকে চিনতেন, ইন্দ্রও অহল্যাকে চিনতেন। বাল্মীকি এ সত্য লুকাননি। অহল্যাও জানতেন ইন্দ্র তাঁকে বহুকাল ধরে তাঁর শরীরী সঙ্গ চান–“বহুকালম্ অভিলাষশ্রবণাৎ”। ইন্দ্রের দর্শনমাত্রই অহল্যার ধৈর্যচ্যুতি ঘটল, মিলিত হলেন ইন্দ্রের শরীরে–“মতিং চকার দুর্মেধা দেবরাজকুতূহলাৎ”। ইন্দ্রের সঙ্গে যৌনমিলনে তীব্র কামেচ্ছা পূর্ণ হওয়ার পর তৃপ্ত অহল্যা বললেন–“আমি আজ কৃতার্থ হয়েছি, সুরশ্রেষ্ঠ। এখন আমি এবং আপনি এই নিন্দাপঙ্ক থেকে উদ্ধার পাই, সেইজন্য এই মুহূর্তে আপনি পলায়ন করুন–“কৃতার্থাস্মি সুরশ্রেষ্ঠ গচ্ছ শীঘ্রমিতঃ প্রভো”। না, কামরসিক ইন্দ্র পালাতে পারেননি। গৌতমের কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ে গেলেন। কপালে ছিল হেনস্থা হওয়ার! ইন্দ্র খুব করে হেনস্থা হলেন গৌতমের কাছে। শুধু হেনস্থাই নয়, গৌতমের অভিশাপও খেলেন–“বিফলঃ ত্বং ভবিষ্যসি”। ইন্দ্রের অণ্ডকোষ খসে পড়ল মাটিতে। খসে পড়ল, নাকি শাস্তিস্বরূপ কেটে নেওয়া হল ইন্দ্রের অণ্ডকোষ! কিন্তু এই ধরনের শাস্তি? অণ্ডকোষ কেটে নিলে সে ব্যক্তি নিশ্চয় সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতা হারাবে, কিন্তু কারোর যৌনক্ষমতা হারাবে না। সে যাই হোক, প্রাদেশিক কবিরা ইন্দ্রের শরীর থেকে যোনিচিহ্ন মুছে দিয়ে ‘সহস্রলোচন’ করে দিলেও, বাল্মীকি ইন্দ্রের অণ্ডশূন্য স্থানে মেষের অণ্ডকোষ শল্য করে দিলেন, ইন্দ্রের নতুন নাম হল ‘মেষবৃষণ’।
