শূর্পণখা : ভাগবতে এক কুজাকে পাওয়া যায়। এ কুজা অবশ্য কৈকেয়ীর দাসী ‘কুজা মন্থরা নন, ইনি রামায়ণে রাবণের বোন। বস্তুত কুজা ছিলেন দ্বাপর যুগের নারী। কাহিনি বলছে–কৃষ্ণ যখন জগৎ উদ্ধারের জন্য জন্মগ্রহণ করেন, তখন কুজাও মথুরা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বয়সকালে কুজা ছিলেন সৈরিষ্ক্রী বা দাসী। ইনি রাজা কংসের সারা শরীরে গন্ধদ্রব্য মাখিয়ে দেওয়ার কাজে নিযুক্ত ছিলেন। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে কুজা ছিলেন খুবই কুরূপা এক নারী। কৃষ্ণ যখন মথুরায় কংস বধের জন্য আসেন, তখন তাঁর সঙ্গে কুজার দেখা হয়। একদিন এক শুভক্ষণে হাজার হাজার নারীদের মাঝখানে দাঁড়িয়েছিলেন কুৎসিত কুজা। কৃষ্ণের দৃষ্টি গেল তাঁর দিকে। অমনি ঘটে গেল অলৌকিক ও অদ্ভুত কাণ্ড! কৃষ্ণের দৃষ্টিপাতে কুৎসিত কুজার স্বাভাবিক শরীরসম্পন্না ও পরমাসুন্দরী হয়ে গেলেন। এ ঘটনায় কৃষ্ণের বান্ধব উদ্ধব বিস্ময় প্রকাশ করলেন, জানতে চাইলেন এর রহস্য কী! তখন কৃষ্ণ বলেন–“শোনো উদ্ধব, আমি শুধু শুধু এই নারীর প্রতি দৃষ্টিনিক্ষেপ করিনি। এই নারীর পিছনে একটা বিরাট ইতিহাস আছে৷ ইনি কুজা ত্রেতা যুগে আমি রাম অবতার হয়ে পৃথিবীতে জন্ম নিই। এ সময় রাবণও জন্ম নেয়। রাবণ নিধনের নিমিত্তেই আমার এই জন্ম। আর কুজা হলেন রাবণের বোন৷ এই কুজার নাম হয় শূর্পণখা। যিনি পঞ্চবটি বনে সীতা ও আমাকে দেখে মুগ্ধ হলেন। রামকে কামনা করে বসলেন। আমি বিবাহিত বারবার বলা সত্ত্বেও সে নারী কোনোরূপ কর্ণপাত করলেন না। ঈর্ষাকাতর হয়ে সীতার উপর আক্রমণ করতে গেলে লক্ষ্মণ তাঁর নাক-কান দুটোই কেটে দিয়েছিল। শূর্পণখা এমতাবস্থায় স্থান ত্যাগ করে পলায়ণ করলেন এবং দাদা রাবণকে সবিস্তারে বর্ণনা করলেন। রাবণ ক্রুব্ধ হলেন এবং সীতাকে অপহরণ করেন। এই নারীর কারণেই রাবণের সঙ্গে যুদ্ধ হয়েছিল। রাম-রাবণের যুদ্ধ হলেও আমাকে না-পাওয়ার খেদ শূর্পণখার যায়নি। সে রাম হিসাবে আমাকে না-পাওয়ায় যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে পড়েন এবং পরজন্মেও যাতে রামকে তিনি পান সে কারণে তিনি তপস্যায় গেলেন। অবশেষে তাঁর তপস্যাকে সম্মান। দিতে আমি কুজার গৃহে গেলাম।” শূর্পণখার সঙ্গে এক যুবকের ভালোবাসা হয়েছিল, তাঁরা পালিয়ে বিবাহ করেছিল। কারণ সেই রাক্ষস রাবণের সমকক্ষ ছিলেন না, ফলে উভয়ের প্রকাশ্যে বিবাহ হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। এরপর রাবণ তাঁদের খুঁজে বোনের স্বামীকে হত্যা করে। শূর্পণখা প্রতিশোধের বীজ বুকে নিয়ে বিধবা হয়ে লঙ্কায় থাকতে লাগলেন।
ভাগবতে কুব্জা চরিত্রের বর্ণনা হয়েছে এভাবে–কুব্জা ছিলেন ‘কৃষ্ণ কামতপ্তা’। তিনি কৃষ্ণের কাছ থেকে কেবল কামই চেয়েছিলেন। কৃষ্ণ যখন কুব্জার গৃহে গিয়েছিলেন, সেই সময় কুব্জার গৃহ ছিল অশ্লীল ছবিতে পরিপূর্ণ এবং বিভিন্ন কামোদ্দীপক দ্রব্যে ভরপুর ছিল। ত্রেতাযুগের সময়কাল ছিল ১২,৯৬,০০০ এবং দ্বাপরযুগের সময়কাল ৮,৬৪,০০০–মাঝে ৪,৩২,০০ বছরের ব্যবধান। যদিও কৃষ্ণেরও মৃত্যু (দ্রষ্টব্য মহাভারত) হয়েছে, সুতরাং কৃষ্ণের আয়ুও নির্দিষ্ট৷ তবে ত্রেতাযুগের কুব্জা দ্বাপরে পাওয়া যায় কীভাবে? তবে কি জন্মান্তরবাদ তত্ত্বে পুনর্জন্মের প্রতিষ্ঠা! মনুসংহিতায় বলা হয়েছে সত্যযুগে মানুষের আয়ু ছিল ৪০০ বছর। পরবর্তী তিনযুগে ১০০ বছর করে পরমায়ু কমে যায়। সেই হিসাবে ত্রেতাযুগে ৩০০, দ্বাপরযুগে ২০০ এবং কলিযুগে ১০০ বছর মানুষের পরমায়ু হয়।
বিভিন্ন রামায়ণে শূর্পণখার নানারকম মুখরোচক বর্ণিত হয়েছে। আসল ঘটনা কী, সেটা কী কতটা গোপন রাখা হয়েছে? প্রকৃত ঘটনা হল–শূর্পণখা আসলে আর্যদেবতাদের টোপ। এ টোপ কোথায় ফেলা হয়েছিল? রাবণকে সিংহাসন থেকে অপসারণ করার জন্য শূর্পণখাকে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই ষড়যন্ত্রের পুরোধায় ছিলেন দেবমন্ত্রী ব্ৰহ্মা। বহুদিন ধরে লঙ্কায় রাবণের রাজসভার অন্দরমহলে বিদ্রোহ দানা বাঁধছিল। একটা গোষ্ঠী চাইছিল লঙ্কার সিংহাসন থেকে রাবণকে হঠিয়ে বিভীষণকে রাজা করতে। সুযোগ খুঁজছিলেন রাবণ-বিরোধীরা। শূর্পণখাও দাদার বিরুদ্ধে প্রতিহিংসায় ফুসছিলেন, মনের মধ্যে আগুন জ্বলছিল দাউদাউ করে। ফুসছিলেন, কারণ রাবণ তাঁর দিগ্বিজয় পর্বে শূর্পণখার শ্বশুরবাড়ি কালকেয় রাক্ষসজাতির দেশ অতর্কিতে আক্রমণ করলে শূর্পণখার স্বামীর ভাইয়ের মৃত্যু হয়। সেই মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে শূর্পণখার স্বামী বিদ্যুৎজিহ্ব রাবণের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করলে রাবণের হাতে তাঁর মৃত্যু হয়। পতিব্রতা শূর্পণখা স্বামীর এই মৃত্যুর জন্য দাদা রাবণকেই দায়ী করেন। অতএব রাবণ-বিরোধী গোষ্ঠীর সঙ্গে হাত মেলালেন শূর্পণখা। রামের ছায়াসঙ্গী আর্যদেবতারাও কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে শূর্পণখার শরণাপন্ন হলেন এবং সফলও হলেন। সুপরিকল্পিতভাবে শূর্পণখাকে শিখিয়ে পড়িয়ে যেমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল শূর্পণখা তেমন-তেমনভাবেই কাজগুলো করেছিলেন। শুধু শূর্পণখাই নয়, আর্যদেবতাদের দ্বারা এক পদস্থ সেনাপ্রধান অকম্পনকেও কবজা করা সম্ভব হয়েছিল।
শূর্পণখা প্রথমেই নিজেকে নিজেই বিধ্বস্ত করে খর রাক্ষসের কাছে রামের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, রাম তাঁকে ব্যাপক অপমান করেছেন এবং খরকে উপর্যুপরি উত্তেজিত করে পঞ্চবটিতে পাঠিয়ে দেন। শূর্পণখা স্বয়ং খরকে পথ দেখিয়ে পঞ্চবটিতে নিয়ে যান এবং আর্যদেবতাদের সঙ্গে সংঘর্ষে খরের মৃত্যু হয়। খর রাক্ষসের দুর্ভেদ্য দুর্গ শূর্পণখার কৃতিত্বে আর্যদেবতাদের হস্তগত হয়ে গেল। শূর্পণখার কোনো ক্ষতি হল না। কারণ শূর্পণখার এখনও আসল কাজই হয়নি।
