আমি জাহাজে পা দেবার মিনিট দশেকের মধ্যেই ওয়াট সদলবলে সেখানে হাজির হল। চারজনেরই দল বটে। চারজন বলতে দুবোন, নতুন বৌ আর শিল্পী ওয়াট নিজে। লক্ষ্য করলাম শিল্পী ওয়াটের মধ্যে আগেকার যে মানববিদ্বেষী মেজাজ মর্জি অব্যাহতই রয়েছে।
ওয়াটের মেজাজ মর্জির সঙ্গে আমি তো আগে থেকেই পরিচিত। তাই সেটাকে তেমন পাত্তা দিলাম না। সে কিন্তু তার সদ্যবিবাহিতা সহধর্মিণীকেও আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল না। তার আচরণে অবাক না হলেও ব্যাপারটা আমার কাছে সৌজন্য বহির্ভূতই মনে হল।
শেষপর্যন্ত ওয়াটের কোনো মেরিয়ান দাদার সৌজন্য ও কর্তব্যের ঘাটতিটুকু পূরণ করতে এগিয়ে এলো। রূপসি-বুদ্ধিমতি মেয়েটা মিষ্টি মধুর সুরেলা কণ্ঠে দু-চার কথার মাধ্যমে নতুন বৌয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিল। আমিও মুচকি হেসে সৌজন্যের পরিচয় দিতে ভুললাম না।
মিসেস ওয়াটের মুখটা দেকতে পেলাম না। কারণ, ওড়না দিয়ে মুখটাকে আড়াল করে রাখা হয়েছে। আমার অভিবাদন গ্রহণ করার জন্য সৌজন্যবশত সে ওড়নাটাকে মুখের ওপর থেকে সরিয়ে নিল। অস্বীকার করব না, তার মুখের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ হতেই আমি থমকে না গিয়ে পারলাম না। আমি মুহূর্তের জন্য বিস্ময় বিস্ফারিত চোখে তার মুখের দিকে তাকালাম।
সত্যি কথা অকপটে স্বীকার করলে, তাকে দেখে আমার ধারণা ছিল, সাধারণ অর্থে সুন্দরী না বলে সাদামাটা রূপ বলতে যা বোঝায় মহিলাটি হয়তো ঠিক সেরকমই কিছু একটা অথবা কুৎসিত বলতে যা বোঝায় তার কাছাকাছি এক মহিলা। মোদ্দা কথা, একেবারে কুৎসিত তাকে বলা যায় না। আরও খোলসা করে বললে, সুন্দর আর কুৎসিতের মাঝামাঝি তার রূপ।
এক মুহূর্তের মধ্যে মিসেস ওয়াটের আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে নিয়ে আমি লক্ষ্য করলাম, তার পোশাক আশাক মার্জিত এবং মার্জিত রুচির পরিচয় বহন করছে, সত্য। অতএব ভদ্রমহিলাটি সে বিচক্ষণতা আর মনের রমণীয়তার গুণেই আমার মেজাজি বন্ধুবরের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছে, এ বিষয়ে সামান্যতমও সন্দেহের অবকাশ নেই।
মিসেস ওয়াটের সঙ্গে কয়েকটা মাত্র কথা হতে-না-হতেই বন্ধুবর ওয়াটের বোন মেরিয়ান তাকে নিয়ে শোবার ঘরের উদ্দেশে পা-বাড়াল।
পুরনো কৌতূহলটা আবার আমার অন্তরের অন্তঃস্থলে চাঙা হয়ে উঠল। ওই পরিচারকের ব্যাপারটার কথা বলতে চাচ্ছি। আমি নিঃসন্দেহ হলাম, মি. ওয়াটের দলে কোনো পরিচারক নেই। তবে? তবে কি তার সঙ্গে অতিরিক্ত এমন কোনো মালপত্র রয়েছে সেগুলোকে সে নজরের আড়ালে, মাল গুদামে রাখতে আগ্রহী?-তাই যদি সত্যি হয়ে থাকে সেগুলো এখন কোথায় আছে।
ব্যস, আমার মাথার পোকাগুলো আবার অস্থির হয়ে পড়ল। আমার পক্ষে আর কিছুতেই হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা সম্ভব হলো না। ব্যস, অস্থিরচিত্ত আমি মি. ওয়াটের অতিরিক্ত মালপত্রের খোঁজে বেরিয়ে পড়লাম। অবর্ণনীয় কৌতূহল বুকে নিয়ে জোর তল্লাশি চালাতে লাগলাম।
আমি বহু খোঁজাখুঁজি করেও যখন আমার বাঞ্ছিত মালপত্রের হদিস পেলাম না তখন হতাশ হয়ে জাহাজঘাটের রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ালাম।
মিনিট কয়েকের মধ্যেই বেশ বড়সড় আয়তাকার একটা কাঠের বাক্স নিয়ে একটা গাড়ি এসে দরজার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে পড়ল। সেটাকে ধরাধরি করে জাহাজে তুলে নেওয়া হল।
একটু পরেই খালাসিরা নোঙর তুলল। অচিরেই জাহাজটা নড়েচড়ে উঠল। এবার জাহাজটা হেলেদুলে ধীর মন্থর গতিতে বন্দর থেকে ক্রমেই দূরে সরে যেতে লাগল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের জাহাজ উত্তাল-উদ্দাম সমুদ্রের বুকে গিয়ে পড়ল।
যে বাক্সটার কথা উল্লেখ করেছি সেটা যে আয়তাকার তা-তো আগেই বলেছি। সেটার দৈর্ঘ্য ছয় ফুট আর প্রস্থ আড়াই ফুট। সত্যি বাক্সটা বিচিত্র আকার বিশিষ্টই বটে।
বাক্সটাকে দেখেই আমি বুঝে নিয়েছি যা অনুমান করেছিলাম সেটা অবিকল সেইরকমই একটা সামগ্রী। আর আপনাদের অবশ্যই স্মরণ থাকার কথা, আমি আর যা-কিছু অনুমান করেছিলাম, আমার শিল্পী বন্ধু ওয়াটের বাড়িতে অমূল্য সম্পদ বলতে যা-কিছু আছে তা হচ্ছে–কয়েকটা চিত্রশিল্প, অন্তত একটা শিল্পকর্ম তো আছেই। এরকম কথা কেন বলছি? আমি নিশ্চিত করে জানি সপ্তাহ কয়েক আগে থেকেই সেনিকোলিনোর একটা ছবির ব্যাপারে দরকষাকষি করছিল।
আর এখন চোখের সামনে যে আয়তাকার বাক্সটা দেখতে পাচ্ছি এটা দেখলেই সহজেই অনুমান করে নেওয়া যেতে পাওে, এর ভেতর কৃতী চিত্রশিল্পী লিয়োনাদ্রোর ‘শেষ ভোজ’ চিত্রশিল্পটা ছাড়া অন্য কোনো সম্পদ থাকতে পারে না, কিছুতেই না।
আর বন্ধুবর ওয়াট যখন ফ্লোরেন্স শহরে বসবাস করছিল তখন তার পরিচিত তরুণ চিত্রকর রুবিনির নিপণ তুলির টানে আঁকা ‘শেষ ভোজ’ ছবিটার একটা কপি কিছুদিন ধরে নিকোলিনোর জিম্মায় আছে বলেই আমার জানা আছে। অতএব আমি মনে করি যে, এসব ব্যাপারের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়ে গেছে।
এসব ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে আমি নিজের বুদ্ধিসুদ্ধি দেখে মনে মনে না হেসে পারলাম না।
ওয়াটের ব্যাপার-স্যাপার দেখে আমি ধরেই নিলাম, যে তার শিল্প সম্বন্ধীয় কাজকর্মের ব্যাপারে আমার কাছে কিছু গোপন করতে পারে। অর্থাৎ তার শিল্প জগৎ সম্বন্ধে কিছু কিছু ব্যাপার আমার কাছে গোপন করার মানসিকতা তার মধ্যে জেগেছে। এই প্রথম, এর আগে আমার চোখে এরকম কোনো ব্যাপার কোনোদিনই পড়েনি।
