দীর্ঘ সময় ধরে ভাবনার জট ছাড়াতে ছাড়াতে আমি এক সময় স্বগতোক্তি করে উঠলাম– চতুর্থ লোকটা, যে আমার মাথায় দীর্ঘ সময় ধরে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছে সে পরিচারকই হবে। হায়! আমি সত্যি একজন আহাম্মকের শিরোমণি! অনেক আগেই তো এমন সহজ সরল একটা সমাধান আমার মাথায়ই এলো না?’
আমি একপা-দুপা করে হাঁটতে হাঁটতে স্ত্রী-তালিকায় এগিয়ে গেলাম। তালিকাটার কাছে গিয়েই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। চোখ তুলে তালিকাটার দিকে তাকালাম। নামগুলো আবারও এক এক করে পড়তে লাগলাম। স্পষ্ট দেখতে পেলাম, দলটার সঙ্গে কোনো পরিচারকই যাচ্ছে না। তবে এও সত্য যে, আসলে দলটার সঙ্গে একটা পরিচারক নেবার কথা ছিল। কেন এমন কথা বলছি, তাই? গোড়াতে পরিচারক কথাটা ঠিকই লেখা হয়েছিল। পরবর্তীকালে কথাটা কেটে-ছেটে বাদ দেওয়া হয়েছে।
আমার মাথায় আবার গুচ্ছের খানেক চিন্তা এসে ভিড় জমাল। আবার চিন্তা জট ছাড়াতে ছাড়াতে এক সময় আপন মনেই বলে উঠলাম–অবশ্যই এমন কোনো অতিরিক্ত মালপত্র যা নিজের হেফাজতে–একেবারে চোখের সামনে রাখতে আগ্রহী যা গুদামে রাখার ইচ্ছে নেই, সে জন্যই হয়তো চতুর্থ শোবার কামরাটা–হঠাই কথাটা আমার চোখের ওপর ভেসে উঠল। আমি সচকিত হয়ে বলে উঠলাম–‘পেয়ে গেছি। আরে, এই তো পেয়ে গেছি–একটা চিত্রশিল্প। ছবি বা ওরকমই কিছু একটা, ইতালিবাসী বুড়ো ইহুদী নিকোলিননার সঙ্গে এটা দিয়েই দাম দস্তুর, মানে দরকষাকষি হচ্ছিল!’ কথাটা আমার মনের মতোই হলো বটে। আর এখনকার মতো মনের গভীরে। উঁকি দিয়ে ওঠা। কৌতূহলটাকে মন থেকে দূরে রাখলাম।
স্ত্রী-তালিকায় ওয়াটের দুটো বোনের নাম দেখলাম। তাদের দুজনকেই আমি চিনি, কেবল চিনি বললে ঠিক হবে না, ভালোই চিনি। তাদের সম্বন্ধে যেটুকু জানতে পেরেছি, উভয়েই যথেষ্টই বুদ্ধি ধরে আর ব্যবহার অমায়িকও বটে।
আর তার স্ত্রী সদ্যবিবাহিতা। তবে এখনও তাকে আমার চোখে দেখা হয়ে ওঠে নি।
ওয়াট অবশ্য আমাকে তার সম্বন্ধে অনেক গল্পই করেছে। আর যা-কিছু বলেছে তাতে আগ্রহ-উৎসাহ যথেষ্টই ছিল। সে যা-কিছু বলেছে তাতে করে ধরে নেওয়া যেতে পারে, তার সহধর্মিণী রূপে গুণে বাস্তবিকই অনন্যা। কেবলমাত্র সুন্দরী যে তা-ই নয়, বিভিন্ন গুণের একত্র সমাবেশ ঘটেছে তার মধ্যে। আর প্রখর বুদ্ধিও ধরে। অতএব এমন একজন মহিলার সঙ্গে পরিচিত হবার আগ্রহ যে আমার মধ্যে জেগেছিল এ-কথা স্বীকার না করলে সত্য গোপন করাই হবে। মোদ্ধা কথা, তার সঙ্গে আলাপ পরিচয়ে উৎসাহ আমার মধ্যে যথেষ্টই ছিল।
আমি যেদিন জাহাজে যাই–চৌদ্দ জুনের কথা বলছি, সেদিন ওয়াটেরও সদলবলে জাহাজে আসার কথা ছিল। আমি ক্যাপ্টেনের মুখে এরকম কথাই শুনেছিলাম–
‘ওয়াট সদলবলে আসবে জানতে পেরে আমি তার আসার অপেক্ষায় নানা অজুহাতে অতিরিক্ত এক ঘণ্টারও কিছু বেশি সময় জাহাজে অপেক্ষা করছিলাম।
ঠিক তখনই মার্জনা ভিক্ষাসহ একটা চিঠি এলো। চিঠির বক্তব্য, মিসেস ডব্লউ হঠাৎ একটু শারীরিক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তার পক্ষে আজ আর জাহাজে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অতএব বাধ্য হয়েই ওয়াটকে আজকের পরিকল্পনা বাতিল করতে হচ্ছে। অর্থাৎ আগামীকাল জাহাজ নোঙর তোলার সময়ের আগে তার পক্ষে জাহাজে উপস্থিত হওয়া কিছুতেই সম্ভব হচ্ছে না। এর জন্য ক্যাপ্টেন যেন তাকে নিজগুণে মার্জনা করে দেন ইত্যাদি। পূর্বকথিত আগামীকাল এলো, সকালে আমি হোটেলে জাহাজঘাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগলাম। এমন সময় আমার ঘরের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হল।
আমি খুলতেই দেখি ক্যাপ্টেন হার্ডি দাঁড়িয়ে। সাদর অভ্যর্থনাসহ তাকে ঘরের ভেতরে নিয়ে বসালাম।
ক্যাপ্টেন হার্ডি কোনোরকম ভূমিকা না করেই সরাসরি বললেন–বিশেষ কোনো জরুরি প্রতিকূল অবস্থার জন্য আমি সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি দু-একদিনের মধ্যে ‘ইন্ডিপেন্ডেস’ যাত্রা করবে না।’
‘তবে?’ আমি বললাম।
ক্যাপ্টেন হার্ডি বললেন–শুনুন, যাবতীয় সমস্যা কাটিয়ে যাত্রার ব্যবস্থা করে আমি নিজেই এসে আপনাকে যাত্রার দিন ও সময় প্রভৃতি জা নিয়ে যাব।
ক্যাপ্টেনের সিদ্ধান্তের কথা শুনে আমি যারপরনাই অবাক হলাম। কারণ, বাতাস যথেষ্টই আছে, আর তা দক্ষিণমুখিও বটে। অথচ ক্যাপ্টেন বললেন, অবস্থা প্রতিকূল। ব্যাপারটা কিছুতেই আমার মাথায় ঢুকল না।
উপায়ান্তর না দেখে আমি হোটেল ছেড়ে বাড়ি ফিরে আসতে বাধ্য হলাম। আমার পক্ষে ধৈর্য ধরা সম্ভব না হলেও নিজেকে কোনোরকমে সামলে সুমলে রাখা ছাড়া গত্যন্তরও তো কিছু ছিল না। ফলে গভীর উল্কণ্ঠার সঙ্গে ক্যাপ্টেনের তলবের অপেক্ষায় প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহূর্ত কাটাতে লাগলাম।
একদিন, দুদিন করে প্রায় একটা সপ্তাহ কেটে যেতে লাগল। কিন্তু হায়। এর মধ্যে ক্যাপ্টেন হার্ডির কাছ থেকে প্রত্যাশিত আহ্বানটা পেলাম না। আমি ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়তে লাগলাম। শেষপর্যন্ত একদিন বহু আকাঙ্ক্ষিত খবরটা এলো। তিনি জাহাজ নোঙর তোলার দিনক্ষণ আমাকে জানালেন। ব্যস, আর দেরি নয়; আমি যথাসময়ে জাহাজে উপস্থিত হলাম। জাহাজ পা দেবার আগেই দেখি রীতিমত যাত্রীর মেলা বসে গেছে। চারদিকে হৈ চৈ শুরু হয়ে গেছে। কত রকম যে কথাবার্তা আর চিৎকার চ্যাঁচামেচি কানে আসতে লাগল, তা বলে শেষ করা যাবে না।
