তবে একটা ব্যাপার আমাকে রীতিমত গোলকধাঁধায় ফেলে দিয়েছে। যাকে বলে আমি একেবারে চক্করে পড়ে গেলাম।
সত্যি বলছি, পরিস্থিতিটা আমাকে এমন বোকা বানিয়ে দিল যা আমি স্বপ্নেও কোনোদিন ভাবতে পারিনি। আয়তাকার সে বাক্সটাকে অতিরিক্ত কামরাটায় আদৌ ঢোকানো হলো না। অথচ আমি শতকরা একশ ভাগই নিশ্চিত ছিলাম যে, বাক্সটাকে সে কামরাটাতেই রাখার ব্যবস্থা করবে। কিন্তু সময়মত দেখা গেল, সেটাকে ওয়াট তার নিজের ঘরেই রাখার নির্দেশ দিল।
ওয়াটের নির্দেশে বাক্সটাকে ওয়াটের ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া হল। আর দেখা গেল, সেটা ঘরের প্রায় পুরো মেঝেটাই দখল করে নিয়েছে।
কিন্তু কার্যত যা ঘটল তা হল, বাক্সটা কামরাটা জুড়ে থাকায় আমার শিল্পী বন্ধু আর তার স্ত্রীর পক্ষে চলাফেরাই সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। আর যা সমস্যা হবে বলে আমার মনে হলো তা হচ্ছে, বাক্সটার গায়ে আলকাতরা দিয়ে বড় বড় হরফে যা লেখা রয়েছে তা থেকে সে উগ্র, একেবারেই অসহনীয় ও অবাঞ্ছিত গন্ধ বেরোচ্ছে তা অবশ্যই বিরক্তির উদ্রেক ঘটাবে।
বাক্সটার গায়ে আলকাতরা দিয়ে বড় বড় হরফে লিখে রাখা হয়েছে মিসেস এডিলেড মার্টস, আলবানি, নিউইয়র্ক। অবধায়ক কর্ণেলিয়াস ওয়াট, এস্কয়ার। আর লেখা হয়েছে–এটা ওপরের দিক।’ সবার তলায় আছে–‘সাবধানে ব্যবহার করবেন। এবার আমার ভালোই জানা আছে, আলবানির মিসেস এডিলেড কার্টিস হচ্ছেন আমার শিল্পী বন্ধু ওয়াটের শাশুড়ি ঠাকুরাণী। কিন্তু বাক্সটার গায়ে লেখা পুরো ঠিকানাটাই আমার মধ্যে কেমন যেন রহস্যের সঞ্চার করল। আমি নিজের বিচার বিবেচনা বোধ অনুযায়ী যা বুঝলাম আমাকে হকচকিয়ে দেওয়াই যেন তার উদ্দেশ্য। নইলে এমন একটা ঠিকানা সে কেনই বাক্সটার গায়ে লিখতে যাবে?
আমি ভেবে চিন্তে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম, রহস্য সঞ্চারকারী কাঠের বাক্সটা এবং তার ভেতরে সে মালপত্রই থাক না কেন সেগুলোকে কিছুতেই আমার মানববিদ্বেষী বন্ধুবর ওয়াটের নিউইয়র্কের অন্তর্গত চেম্বার্স স্ট্রিটের স্টুডিও ছাড়িয়ে আরও উত্তর দিকে কিছুতেই নিয়ে যেতে দেব না। যে কোন মূল্যেই হোক, আমাকে সে-কাজে বাধা দিতেই হবে। আমাদের জাহাজ উত্তাল-উদ্দাম সমুদ্রের বুক চিড়ে তরতর করে এগিয়ে চলল। আবহাওয়া ছিল। জাহাজের যাত্রীদের মনে আনন্দ অব্যাহতই রইল। তারা পুলকানন্দে পরস্পরের সঙ্গে গল্পগুজবে মেতে রইল।
তবে একটা ব্যাপার আমার নজর এড়াল না। অন্য সব যাত্রীর মতো আমার বন্ধুবর ও তার বোনরা যেন মন খুলে অন্য সবার মতো আনন্দ করতে পারছে না। তারা যেন কেমন ব্যতিক্রম। অন্য সবার সম্পর্কেও আমার ধারণা উল্লেখযোগ্য ভালো। হলো না।
খুবই সত্য যে, বন্ধুবর ওয়াটের আচার আচরণকে আমি বিশেষ গুরুত্ব দেই না। তাকে পাত্তা দেওয়ার দরকারই আমি মনে করি না। তবে তাকে একটু বেশি রকম মনমরা বলেই মনে হল। তাকে অধিকাংশ সময়ই কেমন যেন গোমরা মুখ করেই থাকতে দেখলাম। তবে এও সত্য যে, বন্ধুবরের খামখেয়ালিপনা সম্বন্ধে আমি মনে মনে তৈরি হয়েই ছিলাম। আর এও স্বীকার করে নিচ্ছি, তার বোনদের ব্যাপার-স্যাপার সম্বন্ধে আমার পক্ষে কোনো অজুহাত খাড়া করা সম্ভব নয়।
আমি লক্ষ্য করলাম, ওয়াটের বোন দুটো পুরো সমুদ্রযাত্রার বেশিরভাগ সময়ই নিজেদের শোবার ঘরের মধ্যেই কাটিয়ে দিচ্ছে। জাহাজের অন্য যাত্রীদের সঙ্গে কথাবার্তা বলা ও মেলামেশা করার জন্য বার বার বলা সত্ত্বেও তাদের উৎসাহি করা গেল না। বরং নিজেদের কামরাটার মধ্যে নিজেদের বন্দি করে রাখতেই তাদের বেশি। আগ্রহী দেখা গেল।
আর মিসেস ওয়াট? তাকে একটু বেশিমাত্রায় হাসিখুশি–প্রাণোচ্ছল মনে হল। আসলে মহিলাটি খুবই গল্পবাজ ও ফুর্তিবাজ। আর সমুদ্রযাত্রার পক্ষে ব্যাপার খুবই আকর্ষণীয়, তুচ্ছ করার অবশ্যই নয়। বিশেষ করে জাহাজের মহিলা যাত্রীদের সঙ্গে তো অচিরেই তার হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে উঠল। রসান দিয়ে দিয়ে তুচ্ছ ঘটনাকেও হৃদয়গ্রাহী করে পরিবেশন করার ক্ষমতা দিয়ে সে আমাদের সবাইকে রীতিমত মাতিয়ে রাখল।
প্রকৃত ব্যাপারটা অল্পকালের মধ্যেই আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। অনুসন্ধিৎসু চোখে তার ভাবসাব লক্ষ্য করে আমি বুঝে নিলাম, মিসেস ব্লউর গল্প কথা শুনে অন্যরা যত না হাসে, আনন্দে গদগদ হয়ে ওঠে তার চেয়ে অনেক, অনেক বেশি হাসাহাসি করে তাকে দেখে।
রুচিশীল ভদ্ৰব্যক্তি তার সম্বন্ধে আড়ালেও তেমন কিছু বলাবলি করে না। কিন্তু মহিলারা মুখে কলুপ এঁটে থাকতে পারল না। তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগল–‘ভদ্রমহিলার মনটা পরিষ্কার। তার কাছে কিছুই ঢাকঢাক গুড়গুড় নেই–যাকে বলে পুরোপুরি খোলা মনের মানুষ। তবে তিনি কিছুটা উদাসীন প্রকৃতির মানুষ, অস্বীকার কার নয়। একেবারেই অশিক্ষিত, অবশ্যই সভ্যতা-ভব্যতা বলতে কিছুই জানে না।
আমি ভদ্রমহিলাকে যতই দেখতে লাগলাম ততই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়তে লাগলাম, আমার শিল্পমনকে বন্ধুবর ওয়াটসনের মানুষ কি করে এরকম একজন মহিলার জালে ধরা দিল! সত্যি ব্যাপারটা আমাকে যারপরনাই বিস্মিত করল।
আরও ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্তে পৌঁছালাম। মালকড়ি, মানে ধন-সম্পদ এ সমস্যার একটা সমাধান হতে পারত সত্য। কিন্তু ওয়াটের বক্তব্য অনুযায়ী তা-ও তো না। কারণ ওয়াট তো আমাকে খোলাখুলিই বলেছে, মহিলা একটা কাণাকড়িও নিয়ে আসেনি। অর্থাৎ একেবারেই নিঃস্ব রিক্ত অবস্থায় সে তার ঘর করতে এসেছে। আর সে এও বলেছে মহিলাটি ভবিষ্যতে উত্তরাধিকার সূত্রে যে কিছু এমন পাবে তার কোননা। সম্ভাবনাও নেই। তবে কীসের মোহে যে আমার বন্ধুবর তার খপ্পরে পড়েছে তার কূলকিনারা করা আমার পক্ষে সম্ভব হলো না। ওয়াট আমার প্রশ্নের উত্তরে অবশ্য একবার বলেছিল, –’ভালোবাসার খাতিরেই সে বিয়ে করেছে। একমাত্র ভালোবাসার খাতিরেই। আর এও বলেছে–তার স্ত্রীরত্বটি ভালোবাসার তুলনায় যোগ্যতরই বটে।
