এবার আমার কাজ হলো মাছের একটা বড়সড় ও শক্ত তিমির হাড় জোগার করা। সহজেই পেয়েও গেলাম। এবার সেটাকে মৃতদেহটার গলা দিয়ে ঢুকিয়ে দিলাম। তারপর মদের একটা পুরনো ডবল পেটির ভেতরে মৃতদেহটাকে ভাঁজ করে এমনভাবে পেটিটার মধ্যে ঢুকিয়ে দিলাম যাতে ডালাটা আলগা হওয়ামাত্র তিমির হাড়টার সঙ্গে মৃতদেহটাও স্প্রিংয়ের মতো তড়া করে সোজাভাবে বসে পড়ে। এবার পেরেক দিয়ে ডালাটা এঁটে দিলাম।
ব্যাপারটা যে এমন ঘটবে, পেটির ডালাটা আলগা হওয়ামাত্র মৃতদেহটাও সোজা হয়ে বসে পড়বে, আমি নিঃসন্দেহ ছিলাম। কার্যত হয়ও ঠিক তাই।
যা-ই হোক, পেটিটার মধ্যে মৃতদেহটা ভাঁজ করে ঢুকিয়ে ডালাটা বন্ধ করে দিলাম। তাতে চিহ্ন আঁকলাম, নম্বর লিখলাম আর স্পষ্টাক্ষরে ঠিকানাটাও লিখে ফেললাম। এবার মৃত মি. বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দি নিয়মিত মদ কেনেন, এমন একটা দোকানের নামে একটা চিঠি লিখে আমার চাকরকে শিখিয়ে পড়িয়ে তৈরি করে রাখলাম, আমার সবুজ সঙ্কেত পাওয়ামাত্র সে যেন একটা ঠেলাগাড়ি ভাড়া করে পেটিটাকে মি. চার্লি গুডফেলোর বাড়ির সদর দরজায় পৌঁছে দেয়।
তবে এও সত্য যে, মৃতদেহের মুখ দিয়ে যে সব কথা আমি উচ্চারণ করাব বলে মনস্থ করেছিলাম তার জন্য আমাকে নিজেরই কণ্ঠস্বর উচ্চারণের ওপর নির্ভর না করে উপায় ছিল না।
আর বেচারা হত্যাকারীর বিবেকের ওপর তার ফলাফলের জন্য আমাকে নির্ভর করতে হয়েছিল। এভাবে আমি পুরো ব্যাপারটাকে একের পর এক ধাপে বিভক্ত করে নিলাম।
আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়ে গেল অদৃষ্টবিড়ম্বিত মৃতের ভাইপো যুবক মি. পেনিফেদারের মুক্তির ব্যবস্থা করলাম। সে তার হকের পাওনা উত্তরাধিকাসূত্রে তার কাকার যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মালিক হল। সে পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে লব্ধ শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে সম্পূর্ণ নতুন পথে জীবনযাত্রা শুরু করল। এবার, থেকে সে সুখ-শান্তিতে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনযাত্রানির্বাহে মন দিল।
দ্য ওবলঙ বক্স
ইন্ডিপেন্ডেন্স!
ক্যাপ্টেন থার্ডির সুদৃশ্য ও সুবিশাল ডাক-জাহাজের নাম ইন্ডিপেন্ডেন্স’।
বছর-কয়েক আগেকার কথা, চার্লস্টিন, এস-সি. থেকে নিউইয়র্ক শহরে যাবার জন্য ইন্ডিপেন্ডেন্সর টিকিট কেটেছিলাম।
জুনের ১৫ তারিখে আমাদের জাহাজটার নোঙর তোলার কথা। তবে এও সত্য যে, আবহাওয়া স্বাভাবিক থাকলে তবেই জাহাজ ছাড়বে। আমি জাহাজ ছাড়ার একদিন আগে, অর্থাৎ ১৪ তারিখে জাহাজে হাজির হলাম। একদিন আগে যাওয়ার উদ্দেশ্য, শোবার ঘরের কিছু ব্যবস্থাদি করে নেওয়া দরকার। জাহাজ ঘাটায় পা দিয়ে দেখলাম, আমাদের সঙ্গে অনেক যাত্রীই উপস্থিত হয়েছে। একই জাহাজে তারাও যাবে। তবে তাদের মধ্য মহিলারাই সংখ্যায় বেশি।
আমি যাত্রী তালিকাটার ওপর চোখ বুলিয়ে দেখলাম, তাদের মধ্যে কয়েকজন আমার পরিচিত। স্ত্রী তালিকাটার ওপর চোখ বুলাতে বুলাতে অন্যান্য পরিচিতদের মধ্যে মি. কর্ণেলিয়াস ওয়াটের নামটা দেখে আমার বুকের ভেতরে রীতিমত একটা খুশির জোয়ার বয়ে চলল। সে একজন প্রখ্যাত তরুণ শিল্পী।
মি. ওয়াট আমার একজন অভিন্ন হৃদয় বন্ধু দীর্ঘদিন ধরে তার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব। মি. ওয়াট সি-বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহপাঠী ছিল। সেখানকার ছাত্রবস্থাতেই আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বের সূত্রপাত হয়। তারপর ক্রমে তা ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হতে থাকে।
সে ছিল একজন প্রতিভাসুলভ সাধারণ মেজাজ মর্জির মানুষ। তার চরিত্রে মানুষের প্রতি বিদ্বেষ, অনুভূতিপ্রবণতা আর উৎসাহ-উদ্যমের সংমিশ্রণ ঘটেছিল। এসব গুণের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে ছিল উষ্ণ ও আন্তরিক ও সহানুভূতি সম্পন্ন অনন্য হৃদয়।
আমি জাহাজে উঠে শোবার কামরাগুলোর ওপর চোখ বুলাতে বুলাতে দেখতে পেলাম, তিন-তিনটি শোবার ঘরের দরজায় তার নামের কার্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি আবার যাত্রী-তালিকাটার ওপর চোখ বুলাতে গিয়ে হঠাই আমার দৃষ্টি থমকে গেল। দেখলাম, সে নিজের নামে, স্ত্রীর আর দুবোনের জন্য টিকিট কেটেছে।
শোবার ঘরগুলো খুব বড়সড়, প্রতিটাতে দুটো বার্থের ব্যবস্থা রয়েছে। একটার ওপর কিছুটা জায়গা ছেড়ে দিয়ে আর একটা বার্থের ব্যবস্থা। তবে এও সত্য যে, বার্থগুলো এতই ছোট যে, একজনের বেশি লোক শোওয়া সম্ভব নয়। আর একটা ব্যাপারে আমার মনে খটকা লাগল। ব্যাপারটা কিছুতেই আমার মাথায় এলো না, লোকের সংখ্যা চারজন, আর সে শোবার ঘর ভাড়া করেছে তিনটি ব্যাপারটা কি? কিছুতেই মনের ধন্ধটাকে কাটাবার মতো পথ বের করতে পারলাম না।
আসলে তখন আমার মনে এমন একটা অবস্থা চলছিল যখন কোনো মানুষ খুবই নগণ্য ব্যাপার স্যাপার নিয়ে খুবই বেশি রকম কৌতূহলাপন্ন হয়ে পড়ে।
এই কারণের জন্যই তো লজ্জার সঙ্গেই আমি মেনে নিচ্ছি শোবার ঘরের এ হিসেব না মেলার ব্যাপারটাকে কেন্দ্র করে আমার অন্তরের অন্তঃস্থলে হরেক রকম অশালীন, অসঙ্গত ও অশোভন চিন্তা ভাবনার জট মাথার মধ্যে পাকাতে আরম্ভ করল।
এও সত্য স্বীকার করছি, এসব নিয়ে আমার চিন্তা-ভাবনা করানিপ্রয়োজন। সবকিছু জেনে বুঝেও আমি এ সম্যাটার সমাধান করতেই মন প্রাণ সঁপে দিলাম।
সত্যি কথা বলতে কি, সমস্যাটা আমার প্রতিটা মুহূর্ত জুড়ে রইল। দীর্ঘ সময় ধরে ভাবনা-চিন্তার পর শেষপর্যন্ত আমি এমন একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম যে কথা ভেবে আমি নিজেই যারপরনাই অবাক হয়ে গেলাম। আমি আপন মনেই বার বার বলতে লাগলাম–এতটা সময় এর জন্য ব্যয় করার তো কোনো দরকার ছিল না। আরও আগেই তো ভাবনাটা আমার মাথায় আসা দরকার ছিল। কেনই বা এতক্ষণ কথাটা আমার মাথায় আসেনি?’
