মিনিট কয়েক তিনি পাথরের মূর্তির মতো এমন নিশ্চল-নিথরভাবে বসে রইলেন যে, তিনি যেন নিজেরই খুনি আত্মার ধ্যানে মগ্ন। আকস্মাৎ বিদ্যুতের চমকের মতো তার মনের ভাবটা সবার সামনে প্রকাশিত হয়ে গেল। তিনি অতর্কিতে টেবিলের ওপর উঠে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লেন। তারপর দ্রুতকণ্ঠে সে নির্মম-নিষ্ঠুর জঘন্যতম অপরাধের স্বীকারোক্তি ব্যক্ত করতে লাগলেন যার জন্য অভিযুক্ত হয়ে বেচারা যুবক মি. পেনিফেদার অন্ধকার কারাকক্ষে মৃত্যুর প্রতীক্ষায় প্রহর গুনে চলেছে।
বুড়ো চার্লি গুডফেলো স্বতঃউৎসারিত কণ্ঠে যে স্বীকারোক্তি দিলেন তা সংক্ষেপে মোটামুটি এরকম–বুড়ো চার্লি গুডফেলো সেদিন তার বন্ধু মি. বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দি পিছন পিছন জলাভূমিটা পর্যন্ত যান। সেখানে পৌঁছেই অতর্কিতে তার ঘোড়াটাকে গুলিবিদ্ধ করেন। তারপর অশ্বারোহীকে বন্দুকের কুঁদোর আঘাতে আঘাতে খতম করে দেন। তার পকেট থেকে ডায়েরিটা বের করে আত্মসাৎ করেন।
তারপর ঘোড়াটা মারা গেছে মনে করে সেটাকে শরীরের সর্বশক্তি নিয়োগ করে টানতে টানতে ঝোঁপটা পর্যন্ত নিয়ে যান। এবার মি. বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দি-র লাশটাকে নিজের ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে জঙ্গলের গভীরে নিয়ে গিয়ে লুকিয়ে রাখলেন।
মৃতদেহটার তল্লাশি চালাতে গিয়ে রক্তমাখা ছুরি, ওয়েস্টকোট, বুলেট আর ডায়েরি যেটা, সেখানে পাওয়া গেছে তিনিই সেগুলোকেই গোপনে যথাস্থানে রেখেছেন। তার এ কাজের উদ্দেশ্য একটাই ছিল যুবক মি. পেনিফেদারের ওপর প্রতিশোধ নিয়ে মনের ঝাল মেটানো।
আর রক্তাপ্লুত জামা আর রুমালটাকে আবিষ্কারও তো তিনি নিজেই করেছেন।
বুক-কাঁপানো খুনের বর্ণনাটা দিতে গিয়ে বেচারা খুনির কণ্ঠস্বরটা মাঝে-মাঝেই বন্ধ হয়ে আসতে চায়, কোনো অদৃশ্য হাত যেন কণ্ঠটা থেকে চেপে ধরে। খুনের ঘটনাটার আদ্যোপান্ত বিবরণ দেবার পর তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। কাঁপা-কাঁপা পায়ে টেবিলটা থেকে সামান্য পিছিয়ে যেতেই আচমকা মেঝেতে আছড়ে পড়লেন। ব্যস, তার মৃত্যু হল।
তার মুখ থেকে যে উপায় অবলম্বন করে সময়মত স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়, তা নেহাৎই সহজ-সরল।
সত্যি কথা বলতে কি, বুড়ো চার্লি গুডফেলোর মাত্রাতিরিক্ত উদারতা গোড়া থেকেই আমার মনে সন্দেহের সঞ্চার করেছিল।
আমার উপস্থিতিতেই যুবক পেনিফেদার তাকে আঘাত হেনেছিল। তখন তার মুখে মুহূর্তের জন্য হলেও যে শয়তানীর ছাপটা সুস্পষ্ট হয়ে দেখা দিয়েছিল, তা লক্ষ্য করেই আমার মধ্যে নিশ্চিত বিশ্বাস জন্মেছিল, যে প্রতিহিংসার হুমকি তিনি দিলেন তখন একটু মওকা পেলেই তিনি তাকে বাস্তবায়িত করবেনই করবেন। তাই শহরের ভালো-মানুষ বুড়ো চার্লি গুডফেলো-র প্রতিটা পদক্ষেপের দিকে আমি কড়া নজর রেখে চলতে লাগলাম। তাই আমার চোখে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যা-কিছু ধরা পড়ল, সবকিছুর মূলে যে তিনি নিজেই তা লক্ষ্য করলাম।
কিন্তু সবচেয়ে বেশি করে যে ঘটনাটা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল, তা হচ্ছে ঘোড়ার বুক থেকে উদ্ধার করা বন্দুকের কার্তুজটা।
র্যাটলবরো শহরের মানুষ ভুলে গেলেও আমার মাথা থেকে কিন্তু মুহূর্তের জন্যও মুছে যায়নি আহত ঘোড়াটার গায়ে একটা গর্ত ছিল। বন্দুকের কার্তুজের গর্ত। সে গর্তটার বিপরীত দিকেও আর একটা গর্ত ছিল। কাতুর্জটা বেরিয়ে যাওয়ার গর্ত। কিন্তু সেই বেরিয়ে যাওয়া কার্তুজটাই আবার ঘোড়াটার বুক থেকে পাওয়া গেল, তখন নিঃসন্দেহ হলাম, আহত ঘোড়াটার আবিষ্কর্তা নিজেই উদ্যোগি হয়ে গোপনে সেটাকে ঘোড়াটার ক্ষতস্থানে গুঁজে দিয়েছিলেন।
কার্তুজের ব্যাপারটাই রক্তাপ্লুত জামা আর রুমালের দিকে আমার দৃষ্টিকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করল। কারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিঃসন্দেহ হলাম, সেগুলো রক্ত অবশ্যই নয়, নিছকই লাল মদ।
এবার এরকম সব চিন্তা-ভাবনা মাথায় নিয়ে যখন কৃপণ বুড়ো চার্লি গুডফেলো দরাজ হাত, অর্থাৎ অকৃপণ হাতে দান ধ্যান শুরু করে দিয়েছেন দেখলাম, ঠিক তখনই আমার মনে সন্দেহটা আরও বদ্ধমূল হয়ে উঠল।
আমি এবার তলে তলে মৃত বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দির মৃতদেহটা তল্লাস করতে জোর মেতে গেলাম। কোথায়, কোনোদিকে তল্লাসির কাজে বেশি জোর দিলাম, তাই না? বুড়ো চার্লি গুডফেলোক সে দিকে আর অনুসন্ধানকারী দলকে নিয়ে যাননি, সে দিকে, তৎপরতার সঙ্গে তল্লাসি চালাতে চালাতে কয়েক দিন পরেই একটা শুকনো কুয়া আমার চোখে পড়ল। দেখলাম, সেটার মুখটা ঝুলে-পড়া ডালপালায় চাপা পড়ে প্রায় চোখের আড়ালে পড়ে রয়েছে। কেমন যেন সন্দেহ হল। ডালপালা সরিয়ে কুয়াটার ভেতরের দিকে চোখ ফেলতেই আমি রীতিমত যন্ত্রচালিতের মতো দাঁড়িয়ে পড়লাম। দেখলাম, কুয়োর ভেতরে ক্ষত-বিক্ষত বীভৎস ও রক্তাপ্লুত একটা মৃতদেহ পড়ে রয়েছে। সেটা এতই ভয়ালদর্শন হয়ে পড়েছে যে, এক ঝলকে দেখামাত্রই আমার শরীরের সবকটা স্নায়ু একই সঙ্গে ঝনঝ নিয়ে উঠল। সর্বাঙ্গ থর থরিয়ে কাঁপতে লাগল। যাক, আমার বাঞ্ছিত মৃতদেহটা হাতের মুঠোয় পেয়ে যাওয়ায় আমি খুবই আশান্বিত হলাম।
আর কয়টা দিন আগে ঘটনাচক্রে দু-বুড়োর কিছু কথাবার্তা আমার কানে এসেছিল। আলাপ-আলোচনার ফাঁকে বুড়ো চার্লি গুডফেলো গৃহকর্তা বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দিকে খুশি করতে গিয়ে দুম করে একটা ডবল পেটি শাতুমার্গো উপহার দেবার প্রতিশ্রুতি দেন আমি তা স্পষ্ট শুনেছিলাম। সে কথাটাকে বাস্তবায়িত করে আমার উদ্দেশ্যসিদ্ধ করার পরিকল্পনা নিয়ে নিলাম।
