কিন্তু বুড়ো চার্লি গুডফেলো যখন শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে অনাবিল আনন্দের স্রোতে গা-ভাসিয়ে দিয়েছেন ঠিক তখনই একটা ঠিকানা হাতে পেলেন যা তার মধ্যে অভাবনীয় বিস্ময় উৎপাদন করল। ঠিকানাটা হচ্ছে–চার্লস গুডফেলো, এস্কোয়ার, ব্যাটলবরো–প্রেরক–এইচ. এফ. বি. অ্যান্ড কোং শাত, সার এ-নং ১-৬ ডজন বোতল (১/২ গ্রাম)।
সুপ্রিয় চার্লস গুডফেলো, এস্কোয়ার,
মহাশয়,
আমাদের পরম শ্রদ্ধাভাজন পত্ৰলেখক মি. বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দি প্রায় দুমাস আগে যে অর্ডার পাঠিয়েছিলেন সে অনুযায়ী আজ সকালে হরিণচিহ্নসমেত ও বেগুনি সিলমোহর অঙ্কিত শাতুমার্গো-র একটা ডবল পেটি আপনার ঠিকানায় পাঠিয়ে দিলাম। সেটির নম্বর আর চিহ্ন নিচে উল্লেখ করা হল।
আপনার বিশ্বস্ত
হগস ফ্লস বগস অ্যান্ড কোং
টাউন, ২১ জুন, ১৮
পুঃ এ চিঠিটা আপনার হাতে পৌঁছাবার পরদিন পেটিটা মালগাড়িযোগে আপনার হাতে পৌঁছে যাবে। মি. শাটলওয়ার্দিকে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাবেন।
এইচ. এফ. বি. অ্যান্ড কোং।
সত্যি কথা বলতে কি, বুড়ো চার্লি গুডফেলো মি. বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দি-র আকস্মিক মৃত্যুর পর তার প্রতিশ্রুতি শাতু মার্গোর পেটি পাবার আশা মন থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলে দিয়েছিলেন। অতএব এরকম ধারণার বশবর্তী হওয়ার জন্যই তিনি হগস ফ্রগর্স হগস অ্যান্ড কোম্পানির চিঠিটাকে একটা বিশেষ কৃপার ব্যাপার প্রতীক হিসেবেই জ্ঞান করলেন।
শাতুমাগোর ডবল পেটি হস্তগত হওয়া উপলক্ষে তিনি আনন্দে এতই অভিভূত ও উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়লেন যে, নিজেকে সামাল দিতে না পেরে পরদিন ভোর হতে না হতেই ইয়ার দোস্তদের সান্ধ্য-ভোজসভায় যোগদানের জন্যনিমন্ত্রণ করতে মেতে গেলেন। আসলে বন্ধুবর বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দি-র উপহারস্বরূপ প্রদত্ত মদগুলোর উপযুক্ত ব্যবহার করাই তার এ আকস্মিক ভোজসভার আয়োজন। তবে এও সত্য যে, আমন্ত্রণলিপিতে তিনি কিন্তু ভুলেও এ-কথাটা উল্লেখ করলেন না। কিন্তু কেন যে তিনি প্রসঙ্গটা চেপে গেছেন, দীর্ঘসময় ধরে ভাবনা-চিন্তার মাধ্যমেও আমার পক্ষে তার কারণ বের করা সম্ভব হলো না।
রাত কাটল। পূর্ব আকাশে ভোরের আলো ফুটে উঠল। এলো পরদিনের সকাল–বহু প্রতীক্ষিত সকাল।
পরিকল্পনা অনুযায়ী মি. চার্লি গুডফেলোর বাড়ির সদর দরজায় ছোট-বড় বহু গাড়ি এক এক করে জড়ো হতে আরম্ভ করল। সেগুলো থেকে নেমে এলেন শহরের বিভিন্ন প্রান্তের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। সত্য গোপন করব না, নিমন্ত্রিত শহরের অর্ধেক অতিথির মধ্যে আমিও তার বাড়িতে আসন লাভে ধন্য হলাম।
কিন্তু শাতু মার্গোর পেটিটা গৃহকর্তাকে খুবই অস্বস্তি ও বিব্রতের মধ্যে ফেলে এক ঘণ্টা দেরি করে তার বাড়িতে এলো। তবে শেষ-মেষ সেটাকে বাহকেরা বাড়ির দরজায় নামাল সেটা বিশাল একটা পেটি।
পেটিটা দেখামাত্রইনিমন্ত্রিত অতিথিদের পুরো দলটাই ধরতে গেলে আনন্দে উচ্ছ্বাসে নাচানাচি জুড়ে দিলেন।
আলোচনার মাধ্যমে সবার মতো অনুযায়ী স্থির হলো পেটিটাকে খাবারের টেবিলের ওপর তুলে তার ভেতর থেকে মদের বোতলগুলোকে টেবিলে সাজিয়ে ফেললেই ভালো হবে। এতে পরিবেশনের সুবিধা যে হবে এতে কোনো সন্দেহই নেই।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই কাজ শুরু করা হল। আমিও অন্য সবার সঙ্গে কাজে মেতে গেলাম।
অনেক কষ্টে চাঙা করে তুলে পেটিটাকে খাবারের টেবিলের ওপর তুললাম।
ইতিমধ্যেই বুড়ো চার্লি গুডফেলোর মদের নেশা রীতিমত চড়ে গেছে। মুখটা অস্বাভাবিক লাল হয়ে উঠেছে। তিনি একটা ডিফেন্টারকে টেবিলের ছাউনির ওপর সজোরে ঠুকতে ঠুকতে বললেন–‘পেটি থেকে বোতলগুলো বের করার সময় সবাই ধৈর্য্য ধরে হৈ হট্টগোল না করে মাথা ঠাণ্ডা রাখবেন।’
পেটিটার ডালা খোলার দায়িত্ব আমার ওপর বর্তাল বলে আমি ভেতরে ভেতরে খুবই খুশি হয়ে কাজ শুরু করলাম।
একটা বাটালি পেটিটার গায়ে বসিয়ে হাতুড়ি দিয়ে মাত্র কয়েক ঘা দিতেই দুম্ করে ডালাটা খুলে ছিটকে মেঝেতে গিয়ে পড়ল। ঠিক সে মুহূর্তেই পেটিটার ভেতরে অতর্কিতে যন্ত্রচালিতের মতো এক লাফে উঠে গৃহকর্তার মুখোমুখি বসে পড়ল মি. বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দি-র রক্তাপুত, ক্ষত-বিক্ষত প্রায় গলিত মৃতদেহটা। আর তার মুমূর্ষ, অচঞ্চল চোখের মণি দুটো মেলে বিষণ্ণ দৃষ্টিতে বুড়ো চার্লি গুডফেলারের দিকে তাকালেন। গম্ভীর, অথচ স্পষ্ট স্বরে ধীর-স্থির গলায় বললেন–‘তুমিই সেই লোক! তুমিই সে লোক!’
ব্যস, আর কোনো কথা নেই। পর মুহূর্তেই তিনি পেটিটার পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ার মতো উঠে টেবিলটার ওপর পরম তৃপ্তিতে সটান শুয়ে পড়লেন। তার হাত-পা গুলো–সর্বাঙ্গ অস্বাভাবিক রকম কাঁপতে লাগল।
এবার যে ঘটনা ঘটল তা ভাষায় বর্ণনা করা নিতান্তই সাধ্যাতীত। ঘরের ভেতরে নিমন্ত্রিত অতিথি অভ্যাগতরা দরজা-জানালা দিয়ে ঘর ছেড়ে যাবার জন্য এমন ঠেলাঠেলি ধাক্কাধাক্কি জুড়ে দিল, যাকে একমাত্র দক্ষযজ্ঞের সঙ্গেই তুলনা করা চলে। জনাকয়েক মোটাসোটা লোক তো আতঙ্কে সংজ্ঞা হারিয়ে মেঝেতে পড়ে মৃগী রোগীর মতো গোঙাতে শুরু করে দিল।
হৈ-হট্টগোল চিল্লাচিল্লির প্রথম ধাক্কাটা সামলে নেবার পর কিছুটা প্রকৃতিস্থ হবার পর এবার সবার দৃষ্টি গেল গৃহকর্তা বুড়ো চার্লি গুডফেলোরের দিকে। একটু আগে যার মুখে জয়ের অফুরন্ত আনন্দ আর মদের নেশায় সুস্পষ্ট রক্তিম ছোপ বিরাজ করছিল, এখন তা-ই জমাটবাধা আতঙ্কে চকের মতো ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে, মৃত্যুর চেয়েও অনেক, অনেক যন্ত্রণার ছাপ প্রকট হয়ে পড়েছে। তার মুখের আকস্মিক পরিবর্তনটুকু হাজার বছর পৃথিবীতে বেঁচে থাকলেও আমার পক্ষে ভোলো সম্ভব হবে না।
