নিরুদ্দিষ্ট বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দির সুযোগ্য ভাইপোর অপরাধ সম্পর্কে কারো মনে আর তিলমাত্র সন্দেহও রইল না। উপযুক্ত তদন্তের জন্য তাকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হল। এখানেই প্রমাণ হয়ে যাবে সে দোষী, কি নির্দোষ।
এবার ঘটনাটা আরও একটা বিশেষ দিকে খুব বেশি মোড় নিল। মি. বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দি নিরুদ্দেশ হওয়ার দিন সকালে মি. পেনিফেদার কোথায় ছিল জিজ্ঞাসা করা হল। সে আমত আমতা করে হলেও জবাব দিতে গিয়ে সাফ সাফ জবাব দিল, জলাশয়টার যেখানে বুড়ো চার্লি গুডফেলোর অবর্ণনীয় বুদ্ধির ফলে রক্তাপ্লুত ওয়েস্টকোটটা যেখানে কাদা-মাখামাখি অবস্থায় পাওয়া গেছে, সেখানে বন্দুক নিয়ে হরিণ শিকার করতে গিয়েছিল আর খুব ভোরেই বাড়ি ছেড়েছিল।
বুড়ো চার্লি গুডফেলোর ব্যাপারটাকে চাপা রাখতে উৎসাহি নন। পরিস্থিতি যেদিকে মোড় নিচ্ছে তাতে এ অপচেষ্টা করতে গেলে ফেঁসে যাবার সম্ভাবনাই বেশি।
বুড়ো চার্লি গুডফেলো এবার বলতে লাগলেন–‘আমার বন্ধুবর মি. বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দি নিরুদ্দেশ হবার আগের বিকেলে তার ভাইপো মি. পেনিফেদারকে বলেছিলেন, আমি নিজের কানে শুনেছি শোন, আগামীকাল তিনি শহরে যাবেন। যেখানে তিনি ‘ফার্মারস অ্যান্ড মেকানি’ ব্যাঙ্কে অনেকগুলো ফ্র জমা দেবেন। আর ভাইপোকে স্পষ্টই জা নিয়ে দেন যে, মূল উইলটার পরিবর্তন করতে তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আর যে নতুন উইল করবেন তাতে একটা শিলিংও তাকে দেবেন না।
ম্যাজিস্ট্রেট এবার আসামি মি. পেনিফেদারকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সাক্ষী চার্লি গুডফেলো তার সাক্ষ্যে যা-কিছু বলেছেন তা কী সত্য?
আসামি সবাইকে অবাক করে দিয়ে, কিছুমাত্রও দ্বিধা না করে স্পষ্টভাষায় বললেন–‘সত্য! সবই সত্য!
ম্যাজিস্ট্রেট এবার মৃত বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দির বাড়িতে আসামী-পেনিফেদারের থাকার ঘরটা তল্লাসি করার জন্য দুজন পুলিশকে পাঠালেন।
কিছুক্ষণ পরেই পুলিশ দুজন, গেরুয়া রঙের, লোহা বাঁধানো খুবই পরিচিত একটা ডায়েরী নিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ফিরে এলো। মৃত বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দি বাহু ধরে এটাকে সঙ্গে সঙ্গে রাখতেন। সেটার ভেতরে মূল্যবান যা-কিছু ছিল সবই আগেভাগেই লুকিয়ে ফেলা হয়েছে।
ম্যাজিস্ট্রেট বহু চেষ্টা করেও বন্দির কাছ থেকে সেগুলো সম্বন্ধে বিশ্বাসযোগ্য কোনো তথ্য বের করতে পারলেন না। আর তিনি পুরো ব্যাপারটাকে বেশ জোর দিয়েই অস্বীকার করল।
পুলিশ দুজন, মৃত বৃদ্ধ বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দির বিছানার তলা থেকে উদ্ধার করে আনা একটা জামা আর গলায় জড়াবার রুমাল যার গায়ে তার নামের আদ্য অক্ষরগুলো। লেখা রয়েছে আর দুটোতেই মৃতের শুকনো রক্ত মাখা রয়েছে।
এমন সব ঘটনা যখন ঘটে চলেছে ঠিক তখনই একদিন প্রচার হল, মৃত বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দি-র ঘোড়াটা আঘাতজনিত কারণে মারা গেছে।
ঘোড়াটার মৃত্যু সংবাদ পাওয়ামাত্র মৃত ব্যাক্তির বন্ধু বুড়ো চার্লি গুডফেলো বললেন–‘ঘোড়াটার পোস্ট-মর্টাম করানো দরকার।’
তার আগ্রহে ঘোড়াটার পোস্টমর্টেম করানো হল। হয়তো আসামির অপরাধ সম্বন্ধে কারো মনে যাতে কোনো দ্বিধা না থাকে, আসামীর অপরাধ প্রমাণ করানোর অত্যুগ্র আগ্রহের জন্যই তিনি যথেষ্ট সক্রিয় হয়ে ঘোড়াটার বুকের ভেতর থেকে অসম্ভব একটা কার্তুজ বের করলেন।
এবার মৃতের ভাইপো মি. পেনিফেদারের বন্দুকের সঙ্গে কার্তুজটা মিলিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা গেল সেটা ঠিক মাপে মাপে মিলে যাচ্ছে। আর এও দেখা গেল শহরের অন্য সবার বন্দুকে ব্যবহৃত কার্তুজের তুলনায় অনেক বড়।
ঘোড়ার বুক থেকে কার্তুজটা পাবার পর তদন্তকারী ম্যাজিস্ট্রেট অন্য কোনো সাক্ষীর সাক্ষ্য না নিয়েই আসামীকে বিচারের জন্য আদালতের কাঠগড়ায় তোলার জন্য পাঠিয়ে দিলেন। যারা তার জামিনের জন্য এগিয়ে এলো তাদের কোনো কথা কানেই তুললেন না।
এদিকে মৃতের বন্ধু বুড়ো চার্লি গুডফেলো কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেটের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আসামির জামিনের জন্য সাধ্যাতীত প্রয়াস চালাতে লাগলেন। যে কোনো পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে তিনি নিজে জামিন থাকতে সম্মতি জানালেন।
কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত সহানুভূতির জন্য বুড়ো চার্লি গুডফেলো-র মন থেকে মুছেই গেল যে, এক ডলার মূল্যের সম্পত্তিও পৃথিবীর কোথাও তার নেই।
বিচার শুরু হল। বিচারের ফলাফল কি হতে পারে সে সম্বন্ধে আগেই ধারণা করা গিয়েছিল। সাক্ষ্য প্রমাণগুলো এতই জোরদার যার ফলে জুরিরা সহজেই একমত হয়ে রায় দিলেন অভিযুক্ত মি. পেনিফেদার দোষী–হত্যার দায়ে অপরাধী।
একটু পরেই বেচারা যুবক মি. পেনিফেদারের প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে গেল। কাঠগড়া থেকে নামিয়ে অনমনীয় আইন কার্যকরী না হওয়া পর্যন্ত অধীর প্রতীক্ষায় দিন গণনার জন্য তাকে কাউন্টি জেলে চালান করে দেওয়া হল।
বুড়ো চার্লি গুডফেলো এমন একটা মহৎ কাজ সম্পন্ন করার জন্য শহরের মানুষদের মাথার মণিতে পরিণত হয়ে গেলেন। তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়তে বাড়তে তুঙ্গে উঠে গেল।
শহরের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ বুড়ো চার্লি গুডফেলোকে আমন্ত্রণ জানাতে লাগল। আবার তিনি কার্পণ্য ভুলে গিয়ে অনেককে নিজের বাড়িতে আমন্ত্রণ জা নিয়ে মনের অন্তহীন আনন্দ প্রকাশ করতে লাগলেন।
