অনুসন্ধানকারী দলটা আবার নতুন উদ্যমে খোঁজাখুঁজি শুরু করল। দু-দুবার চিরুণি তল্লাসি চালিয়েও কোনোকিছুরই চিহ্ন খুঁজে না পেয়ে তারা হতাশ হয়ে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হল। ঠিক তখনই স্বয়ং ঈশ্বরই যেন বুড়ো চার্লি গুডফেলোর কানে কানে বললেন জলাশয়টার সবটুকু পানি সেঁচে ফেল।
বুড়ো চার্লি গুডফেলোর দলের অন্যান্যদের কাছে প্রস্তাবটা পাড়ামাত্র সবাই সঙ্গে সঙ্গে লুফেনিল। ব্যস, আর দেরি নয়। কোদাল ও বেলচা প্রভৃতি নিয়ে জোর কদমে নালা কাটার কাজ শুরু করে দিল। নালাপথে পানি বেরিয়ে যেতেই কাদাজলে একটা ওয়েস্টকোট নজরে পড়ল। সবাই নিঃসন্দেহ হলো সেটা পেনিফেদারের সম্পত্তি, ওয়েস্ট কোটটা তুলে নিয়ে পরীক্ষা করে দেখা গেল, সেটার বেশ কিছুটা জায়গা ছিঁড়ে ফেঁসে গেছে আর বেশ কয়েক জায়গায় চাপ চাপ রক্ত ছড়িয়ে রয়েছে।
ব্যাপারটাকে দলের অনেকেই স্বীকার করেনিল, মি. বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দি সেদিন ভোরে শেষবারের মতো বাড়ি ছেড়ে বেরিয়েছিলেন তখন এ ভেলেভেটের কোটটা তার গায়েই দেখেছিল। আর মৃতের ভাইপো মি. পেনিফেদারের গায়ে বিশেষ ভোরের পর এ ওয়েস্ট কোটটাকে কেউ দেখতে পায়নি। অথবা তার কাকা নিরুদ্দেশ হবার পর এ ওয়েস্ট কোটটা ভাইপোর গায়ে দেখেছিল এ-কথাও কেউ দৃঢ়স্বরে বলতে পারল না।
মুহূর্তের মধ্যেই মি. পেনিফেদারের মুখটা যখন চকের মতো ফ্যাকাশে হয়ে উঠতে দেখা গেল ঠিক তখনই ব্যাপারটা আরও জটিল হয়ে উঠল।
ব্যাপারটা সম্বন্ধে তার মতামত জানতে চাওয়া হলে তার মুখ দিয়ে টু শব্দটিও বের হলো না। আর এ কারণেই, দুশ্চরিত্র লম্পট হওয়া সত্ত্বেও যে কয়জন বন্ধু তার পিছন পিছন ঘুর ঘুর করত তারাও এক এক করে তার সংস্রব ত্যাগ করে গেল।
এবার তার বন্ধু ও শত্রুরা একাট্টা হয়ে তাকে কারাগারেনিক্ষেপ করার জন্য জোরদার দাবি জানাতে লাগল। তুমুল হৈ চৈ বাধিয়ে দিল।
আবার অন্যদিকে বুড়ো চার্লি গুডফেলো অধিকতর ভালো-মানুষে পরিণত হয়ে গেলেন। অনেকেই তাকে মহান গুডফেলো বলে সম্বোধন করতেও ছাড়ল না। তিনি নিজে কিন্তু যুবক পেনিফেদারকে সমর্থন করলেন। তিনি জনগণের সন্দেহটাকে আমল দেওয়া তো দূরের ব্যাপার বরং সন্দেহের তীব্রতাকে হ্রাস করার জন্য সর্বতভাবে চেষ্টা চালাতে লাগলেন।
মি. চার্লি গুডফেলোর প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে মি. পেনিফেদারের পক্ষ অবলম্বন করে দীর্ঘ ভাষণ দিলেন। এতে তার প্রতিভা এবং মন দুয়েরই কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখলেও শহরবাসীদের মনে তেমন দাগ কাটতে পারলেন না। তারা এতটুকুও নরম তো হলই না উপরন্তু তাদের বুকে সন্দেহের আগুন যেন বাতাস পেয়ে দ্বিগুণতর করে জ্বালিয়ে দিল।
বুড়ো চার্লি তার বক্তব্যে তিনি একাধিকবার বললেন, ‘যুবক মি. পেনিফেদারে মি. গুডফেলোর উত্তরাধিকারী ব্যস, এতেই তিনি মারাত্মক ভুলটা করে বসলেন। শহরের পরিচিত জনেরা এরকম কোনো কথা স্বপ্নেও কোনোদিন ভাবেনি। বরং তারা শুধু এটুকুই জানত, এ কুলাঙ্গার ভাইপো ছাড়া নিরুদ্দিষ্ট ব্যক্তির অন্য কোনোই জীবিত আত্মীয় পরিজন নেই আর গত দু বছর আগে তিনি এক নিজের বিষয় আশয় থেকে বঞ্চিত করবেন বলে শাসিয়ে ছিলেন। তবে ইতিমধ্যে তাদের বিবাদ বিসম্বাদ মিটে গেছেই বলে তারা নিঃসন্দেহ হয়েছিল।
বুড়ো চার্লির বক্তব্য তাদের বিশ্বাসে আঘাত হানল। তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগল, তবে কিনিরুদ্দিষ্ট বুড়ো কেবলমাত্র লোক দেখানোর জন্যই ওসব কথা বলতেন? ব্যস, এটুকুই? এমন একটা প্রশ্ন সবার মনে টক্কর মারতে লাগল, এ আকস্মিক ঘটনার মাধ্যমে লাভবান কে হবে? কুই বোনো? এ প্রশ্নটাই বুঝি যুবক মি. পেনিফেদারের কপালে অপরাধের ছাপ এঁকে দিল যাকে ওয়েস্টকোটটার চেয়েও এ মুহূর্তে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
যুবকটার কাকা মি. বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দি তার নামেই উইল করে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার ভয় দেখিয়েছলেন। বোধহয় ভয়টাকে বাস্তবায়িত করতে উইলটাকে আর পরিবর্তন করা হয়ে ওঠেনি। পরিবর্তন করা হলে যুবকটার দিক থেকে সম্ভাষিত হত্যাকান্ডের একমাত্র উদ্দেশ্য হত বদলা নেবার আকাঙ্ক্ষা। তবে এক্ষেত্রেও কিন্তু কাকার মন জয় করে নিজের স্বার্থরক্ষার প্রত্যাশা অবশ্যই থাকত।
এখন ব্যাপার হচ্ছে উইলটা অপরিবর্তিত থাকা সত্ত্বেও পরিবর্তনের আশঙ্কা ভাইপোর মনে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছিল। আর এটাই খুনের আগ্রহটাকে জোরদার করে তুলল।
এবার ব্যাটবরো শহরের বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান নাগরিকরা ভাইপোকেই খুনের ব্যাপারে দায়ী করল। ফলে যুবক মি. পেনিফেদারকে হাতকড়া পড়িয়ে কারাগারে চালান করে দেওয়া হল। এবার আরও কিছুক্ষণ ধরে সে অঞ্চলটাতে চিরুণি তল্লাসি চালিয়ে হতাশ হয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়াল।
সন্দেহটা আরও অনেকাংশে বেড়ে গেল।
বুড়ো চার্লি গুডফেলো আগে আগে হাঁটছেন। হঠাৎ উপুড় হয়ে ঘাসের উপর থেকে তিনি যেন কি বস্তু কুড়িয়ে নিলেন। আরও লক্ষ্য করা গেল, সেটাকে উৎসাহের সঙ্গে মুহূর্তের জন্য দেখে নিয়েই ঝটপট কোর্টের বুক-পকেটে চালান করে দিয়ে লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করলেন।
ব্যাপারটা সবার নজরে পড়ে যাওয়ায় সেটা তাকে লুকিয়ে ফেলতে বাধা দিল। ব্যাপারটা এবার সবার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল, ঘাসের ওপর থেকে অতর্কিতে তুলে নেওয়া বস্তুটা একটা ছুরি–স্পেনীয় ছুরি। আর কম হলেও ডজনখানেক লোক চিনে ফেলল, ছুরিটার মালিক যুবক পেনিফেদার। আর অস্বীকার করার উপায়ও তো নেই, সেটার হাতলে তার নামের আদ্যক্ষরগুলো যে জ্বল জ্বল করছে। আর ছুরির ফলাটা পুরোপুরি খোলা, সেটার গায়ে শুকনো রক্তও সবার চোখে পড়ল।
