মুখে খুশির ঝিলিক ফুটিয়ে তুলে বুড়ো চার্লি গুডফেলো সকৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকালেন।
মি. বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দি বলে চললেন–আপনি আমার কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলিয়ে নেবেন, আজই শাতু মার্গো-র একটা ডবল পেটির অর্ডার আমি শহরে পাঠিয়ে দেব।’
বুড়ো বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দির এ বক্তব্যটার উল্লেখ করার উদ্দেশ্যে, মি. বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দির উদারতা ও বন্ধু-প্রীতির পরিচয় প্রদান করা তার দুই বুড়ো বন্ধুর ঘনিষ্ঠতা ও নির্ভেজাল আন্তরিকতার কিছুটা প্রমাণ দেওয়া।
পরের রবিবার সকালে যখন শোনা গেল মি. বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দি কোনো চরমতম বিপদে পড়েছেন তখন শোকে সবচেয়ে বেশি মুষড়ে পড়লেন তার অভিন্ন হৃদয় বন্ধু বুড়ো চার্লি গুডফেলো।
বন্ধুবর বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দির নিরুদ্দেশের খবরটা শোনামাত্র তার মুখটা মুহূর্তে চকের মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তার মুখে এমন শোকের ছায়া নেমে এলো যে, নিরুদ্দিষ্ট বুড়োটি যেন তার বাবা-দাদা বা এমনই কোনো নিকট আত্মীয়।
সত্যি কথা বলতে কি, বুড়োর সর্বাঙ্গ এমন থর থর করে কাঁপতে লাগল যেন তিনি হঠাৎ কালা-জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন।
বন্ধুর নিরুদ্দেশে বুড়ো চার্লি গুডফেলো শোকে এতই মুষড়ে পড়লেন যে, বন্ধুবরের জন্য কিছু করা বা গভীর মনোযোগ সহকারে কিছু ভাবাই তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। একমাত্র এ কারণেই বন্ধুবর নিরুদ্দেশ হওয়ার পর বেশ কিছুদিন অন্য কাউকে কোনোভাবেই কিছু করতে দিলেন না।
প্রতিবেশী নিরুদ্দিষ্ট মি. বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দির খোঁজ করার জন্য নানা রকম প্রস্তাবই বুড়ো চার্লি গুডফেলোর কাছে রাখল। তিনি তাদের উৎসাহ দেওয়ার বদলে দমিয়ে দিতে গিয়ে বললেন ‘শোন এমন ব্যস্ত হয়ে কোনোকিছু করতে যাওয়া বোকামিই হবে। এ পরিস্থিতিতে খোঁজ খবরের চেষ্টা না করে বরং দিন কয়েক মানে দুএক দিন, দুএক সপ্তাহ বা দু এক মাস ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করাই ভালো। দেখাই যাক না শেষপর্যন্ত কি দাঁড়ায় বন্ধুবর মি. বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দি নিজে থেকে ফিরে আসেন কি না। আর তিনি নিজেই তার নিরুদ্দেশের ব্যাপার স্যাপার আমাদের কাছে খোলসা করে কিছু বলেন কি না। আমার ভালোই জানা আছে, শোক, তাপ খুবই অসহনীয় হয়ে গেলে অনেকেই এমন অজুহাত খাড়া করে সময় কাটাতে আগ্রহী হয়ে পড়েন। বুড়ো চার্লি গুডফেলোর ক্ষেত্রেও সময় কাটানোর ব্যাপারটাই প্রাধান্য পেয়েছে।
র্যাটলবরোর অধিবাসীরা বুড়ো চার্লি গুডফেলোর ওপর বড়ই আস্থাবান। তাই প্রায় প্রত্যেকেই তার প্রস্তাবটাকে নির্দিধায় মেনে নিল।
শহরের সবাই তার প্রস্তাবটাকে স্বাগত জানালেওনিখোঁজ মি. বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দির দুশ্চরিত্র বখাটে ভাইপো কিন্তু কিছুতেই তার প্রস্তাব মেনে হাত-পা গুটিয়ে নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকতে মোটেই রাজি নয়। তার একান্ত ইচ্ছা মৃত কাকার খোঁজ করা হোক তার গুণবান এ ভাইপোর নাম পেনিফেদার।
সে বুড়ো চার্লি গুডফেলোর এমন নীরবতার কারণ সম্বন্ধে বলল, গত তিন মাস যাবৎ তার কাকার সঙ্গে বুড়ো চার্লির মতবিরোধ চলছিল। একদিন বুড়ো চার্লি তার কাকার বাড়িতে এসে এমন হম্বিতম্বি শুরু করে দিয়েছিলেন যে, পালিফেদার দুম করে একটা ঘুষি বসিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। ব্যস, বুড়ো মুখ থুবড়ে মেঝেতে পড়ে গোঙাতে শুরু করেছিলেন।
বন্ধুর ভাইপোর হাতে মার খেয়ে ব্যাপারটাকে কিন্তু হজম করে নিলেন। যাতে সেখানেই ব্যাপারটা চাপা পড়ে যায় সে চেষ্টাই করেন, আর ঘটনাটার ইতিও সেখানেই ঘটে যায়। তবে বন্ধুর বাড়ি ছেড়ে যাবার সময়, পরে দেখে নেব বলে তর্জন গর্জন করতেও ছাড়েননি।
ব্যাটবরোর অধিবাসীরা নিরুদ্দিষ্ট মি. বার্ণাবাস শ্যাটলওয়ার্দি-র ভাইপো পেনিফেদারের পীড়াপীড়িতে সাব্যস্ত করল–কয়েকটা দলে বিভক্ত হয়ে তল্লাসি চালাবে।
শেষপর্যন্ত দেখা গেল বুড়ো চার্লি গুডফেলো অনুসন্ধানকারীদের আগে আগে চলেছেন। আসলে পরিস্থিতি প্রতিকূল দেখে তিনি রাতারাতি মতো পাল্টাতে বাধ্য হয়েছেন।
তবে এ-কথা খুবই সত্য যে, এ কাজে বুড়ো চার্লি গুডফেলো-র চেয়ে যোগ্য পথপ্রদর্শন অন্য কেউ তো হতেও পারে না। তার চোখ দুটো যে বন বিড়ালের মতো জ্বল জ্বল করে এ কথা কার না জানা আছে?
কিন্তু হায়! পুরো একটা সপ্তাহ ধরে বাইরের আনাচে কানাচে তন্ন তন্ন করে তল্লাসি চালিয়েও ফায়দা কিছু হলো না, নিরুদ্দিষ্ট মি. বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দিকে কোথাও পাওয়া গেল না। তবে তার চলে যাওয়ার পথে কিছু কিছুনিদর্শন পাওয়া গেল যা। অনুসন্ধানকারীদের মনে আশার সঞ্চার করল। কিন্তু কি সেনিদর্শন, তাই না? ঘোড়ার ক্ষুরের ছাপ, যা অনুসরণ করে তারা তিন মাইল পথ চলে গিয়েছিল।
তিন মাইল দূরবর্তী একটা অঞ্চলে পৌঁছে অনুসন্ধানকারীরা থমকে গেল। কারণ সেখান থেকে একটা সরু রাস্তা বেরিয়ে সোজা জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেছে। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে প্রায় আধমাইল এগিয়ে সরু রাস্তাটা আবার একটা সদর বাজারের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। তারা সরু পথটা ধরে ঘোড়ার পায়ের ছাপ অগ্রসর হয়ে একটা জলাভূমির ধারে উপস্থিত হল। জলাভূমিটার বিপরীত পাড়ে ঘোড়ার ক্ষুরের চিহ্নমাত্রও কারো নজরে পড়ল না।
অনুসন্ধানকারী দলটা খোঁজাখুজি করতে করতে এমন একটা জায়গায় হাজির হলো যেখানে নরম মাটির ওপরে লড়াই–দাপাদাপির চিহ্ন দেখতে পেল। আর এও বুঝতে পারল মানুষের চেয়েও বড় আর ভারী কোনো বস্তুকে নরম মাটির ওপর দিয়ে টেনে হিঁচড়ে জলাশয়টার পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পানি পর্যন্ত যাওয়ার পর আর কোনো চিহ্নের তো প্রশ্নই ওঠে না।
