এক শনিবার খুব ভোরের কথা মি বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দি ঘোড়ার পিঠে চেপে র্যাটলবরো থেকে প্রায় পনেরো মাইল দূরবর্তী পাহাড়ের উদ্দেশ্যে রওয়া হয়েছিলেন। শহরের কাম-কাজ মিটিয়ে সেদিন মাইল রাতেই বাড়ি ফিরবেন বলে গেছেন।
কিন্তু হায়! বাড়ি থেকে রওনা হবার মাত্র দুঘণ্টা পরেই মনিবকে ছাড়াই কেবলমাত্র ঘোড়াটা ফিরে এলো। মি. বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দি সঙ্গে করে, ঘোড়ার পিঠে জিনের সঙ্গে যে বস্তাগুলো বেঁধে বাড়ি থেকে রওনা হয়েছিলেন, সেগুলো ছাড়াই ঘোড়াটা হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ির দরজায় হাজির হল।
ঘোড়াটা বাড়ি ফিরেছে বটে, কিন্তু দারুণভাবে আহত। ফোঁস ফোঁস করে হাঁপাচ্ছে, আর মুখ দিয়ে অনবরত ফেণা ঝড়ছে। আর সর্বাঙ্গে কাদায় মাখামাখি। এসব ব্যাপারকে কেন্দ্র করে বেপাত্তা হয়ে যাওয়া মি. বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দির বন্ধুবান্ধব এবং আত্মীয়স্বজনের মনে যারপরনাই সন্দেহের বীজ দানা বেঁধে ছিল।
পরদিন, অর্থাৎ রবিবার সকালেও তার পাত্তা না পাওয়ায় শহরের প্রতিটা মানুষ তার খোঁজ পাওয়ার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। আর এটাই তো স্বাভাবিক। ভদ্রলোক বাড়ি থেকে রওনা দিতে না দিতেই কর্পূরের মতো উবে গেলেন এটাও তো ভাবা যায় না।
শি: চালর্স গুডফেলো মি. বর্ণাবাস শাটলওয়ার্দির অভিন্ন হৃদয় বন্ধু। নিরুদ্দেশ বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দিও খোঁজ করার কাজে আগ্রহ মি. চার্লস গুডফেলোর আগ্রহই দেখা গেল সবচেয়ে বেশি। বন্ধুর জন্য তার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা হওয়া হওয়াটা তো স্বাভাবিক।
মি. চার্লস গুডফেলো পরিচিত মহলের কাছে বুড়ো চার্লি গুডফেলো বা চার্লি গুডফেলো বলে পরিচিত। অনেকে এদের কোনো একটা বলে সম্বোধন করে।
কিন্তু আসলে ব্যাপারটা খুবই অবাক হবার মতোই বটে। এমনও হতে পারে ‘চার্লি’ নামটার গুণেই এমনটা সম্ভব হচ্ছে। সত্যি কথা বলতে কি, আজ অবধি ‘চার্লি’ নামধারী কোনো ব্যক্তিই আমার চোখে পড়েনি যিনি সদাচারী, সাহসি, মন-খোলা, উদারচেতা আর মিষ্টি-মধুর কণ্ঠস্বরের অধিকারী নন। হয়তো বা চার্লি’ নামটার গুইে এমনটা হয়ে থাকে।
বর্তমানে চার্লি গুডফেলো ব্যাটলবরো শহরে ছয় মাসের বেশি স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। আর এখানে এসে বসতি গড়ে তোলার আগে তিনি কোথায় থাকতেন আর কি করতেন এসব কথা কারোই জানা নেই। সত্যি কথা বলতে কি, এ নিয়ে কারো কোনো মাথা ব্যথাও নেই। মাত্র তো দুটা মাস, অথচ এ অত্যল্পকালের মধ্যেই শহরের সব প্রতিষ্ঠিত ও সম্মানীয় মানুষদের সঙ্গে পরিচিত হতে ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে তুলতে তেমন কোনো বেগ পেতে হয়নি।
আর বর্তমানে? বর্তমানে তার মুখের একটামাত্র কথাই হাজার কথার সমান গণ্য হয়। শুধু কি এ-ই? মেয়ে মহলে তিনি একজন রীতিমত চোখের মণি। মেয়েরা তো তার নামে একেবারে অজ্ঞান। তারা একবার তার প্রশংসা শুরু করলে থামতেই চায় না।
গোড়াতেই তো বলেছি মি. বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দি শহরের ধনকুবেরদের শিরোমণি আর মান সম্মানও সবচেয়ে বেশি। আর তার সঙ্গে বুড়ো চার্লি গুডফেলোর এমন গলায় গলায় ভাব যে, হঠাৎ করে দেখলে মনে হয় তারা বুঝি সহোদর–এক মায়ের পেটের ভাই।
মি. বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দি আর বুড়ো চার্লি গুডফেলো পাশাপাশি, একেবারে লাগোয়া বাড়িতে বসবাস করেন। তবে এও সত্য যে মি. বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দি বুড়ো চার্লি গুডফেলোর বাড়িতে খুব কমই যাতায়াত করেন, আর তার বাড়িতে কোনোদিন কিছু মুখে দেন না। তা সত্ত্বেও দুই বন্ধুর, আন্তরিকতা ও ঘনিষ্ঠতায় কোনো ঘাটতি কোনোদিনই লক্ষিত হয়নি।
দুই বন্ধুর মধ্যে হৃদ্যতায় ঘাটতি না হওয়ার অন্য কারণগুলো ছাড়া আসল যেটা তা হচ্ছে, বুড়ো চার্লি গুডফেলো দিনে তিন-চারবার প্রতিবেশী মি. বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দির বাড়ি গিয়ে তার খবরাখবর নেন, আর সকালে চা-জল খাবারের ব্যাপারটা সাড়েন। রাতে খাবার নিয়মিত সেখানেই সাড়েন। আহারাদি সারার পর দুই বুড়ো রঙ্গরসিকতা করতে করতে কয় পেয়ালা মদ যে গেলেন তার হিসাব থাকে না।
‘শাতু মার্গো নামক মদ বুড়ো চার্লি গুডফেলো-র খুবই প্রিয়। আর সহজ-সরল সাদামনের মানুষ মি. বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দির সব সময় নজর থাকে প্রাণের বন্ধুটি যাতে সাধ মিটিয়ে তার ভালোলাগা মদ গিলে তৃপ্তি লাভ করেন।
এক সন্ধ্যায় দুই বুড়ো টেবিলে মুখোমুখি বসে একের পর এক গ্লাস গলায় ঢেলেই চলেছেন। হিসেবের বাইরে মদ পেটে পড়ায় গৃহকর্তা বুড়ো বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দি-র জ্ঞান বুদ্ধি মদের পরিমাণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভোতা হয়ে গেল। তিনি যেন নিজেকে পুরোপুরি হারিয়ে বসলেন। ব্যস, আবেগভরে বন্ধুবর বুড়ো চার্লি গুডফেলোর কাঁধে আচমকা এক থাপ্পড় বসিয়ে দিয়ে বলে উঠলেন–‘শোন বুড়ো চার্লি আসল কথাটা তোমাকে বলেই ফেলছি–জন্মের পর থেকে আপনার মতো এমন ফুর্তিবাজ মানুষ আর দ্বিতীয়টা পাইনি।’
মদের নেশায় অভিভূত বুড়ো চার্লি গুডফেলো আবেগ ভরে বলে উঠলেন–আমিও একই কথা বলতে চাইছি। আপনার মতো এমন বন্ধু হিতৈষী–’
তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই মি. বার্ণাবাস শাটলওয়ার্দি বলে ছিলেন– ‘আমাদের বন্ধুত্বের খাতিরে–এ মদটা যখন আপনার এতই প্রিয় তখন শাতু মাগো মদের একটা বড় পেটি আপনাকে উপহার দেব, ঠিক করেছি–মানে উপহার অবশ্যই দেব।’
