ক্ষমা তো করা হবে, কিন্তু কিভাবে হান্স ফালকে ক্ষমা করা যাবে, সেটাই এ মুহূর্তের একমাত্র ভাবনা।
হান্স ফালকে ক্ষমা করার উপায়টা নিয়ে ভাবনা চিন্তা করতে করতে বিজ্ঞানীদ্বয় বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলেন।
নগরপালকের বাড়ির দরজায় পৌঁছে অধ্যাপক রুবাদুব বললেন–‘চাঁদ থেকে আসা দূতটি তো চম্পট দিয়েছে। সে আবার চাদেই পাড়ি জমিয়েছে।’
মীনহীর সুপারবাস ভন আন্ডারডুক জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে নীরবে অধ্যাপকের মুখের দিকে তাকালেন।
অধ্যাপক রুবাদুব বলে চললেন–‘দূতটির চলে যাওয়ার কারণ হচ্ছে, রটারডাম নগরের অধিবাসীদের চাক্ষুষ করেই তার আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে যাবার জোগাড় হয়েছিল।
‘রটারডামের নাগরিকদের দেখে–
তাকে কথাটি শেষ করতে না দিয়েই অধ্যাপক বলে উঠলেন–‘আরে ভাই, এ তো খুবই সহজ কথা, একেবারে পানির মতো সহজ ব্যাপার। অনভ্যস্ত চোখে এখানকার মানুষের অসভ্য চেহারা দেখে সে যারপরনাই ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল। আর সে ভীতির জন্যই সে এখান থেকে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে, সন্দেহের কিছুমাত্রও অবকাশ নেই। এখন ক্ষমার ব্যবস্থা থাকলেও কাজের কাজ তো কিছুই হবার নয়।
‘কারণ? ক্ষমার ব্যবস্থা হলেও লাভ হবার নয় কেন? আমার এ-কথাও কিন্তু খুবই সহজ সরল। চাঁদের কোনো লোক ছাড়া পৃথিবীবাসী কারো পক্ষে এতটা পথ অতিক্রম করে চাঁদে হাজির হওয়া সম্ভব নয়, কিছুতেই নয়।
নগরপালক অধ্যাপকের কথাটা শুনে প্রথমে কিছু সময় গম্ভীর মুখে ভাবলেন। তারপর তিনিও তার যুক্তিটা মেনে নিলেন। অতএব ক্ষমার প্রসঙ্গটা এখানেই চাপা পড়ে গেল। তবে এও সত্য যে, গুজব তার পথ ধরেই এগিয়ে চলল। গুজবের শেষ হলো না। চিঠিটা ছাপা হল। ব্যাপারটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। ব্যস, চারদিকে হৈ হৈ রৈ রৈ পড়ে গেল। গুজবের পর গুজব–হরেক রকম মতামত ঘুরে বেড়াতে লাগল।
অতি বিচক্ষণ কিছু লোক চাঁদের ব্যাপারটাকে পুরোপুরি একটা ভাঁওতা বলেই এক ফুঙ্কারে উড়িয়ে দিল। কিন্তু ফল হলো সম্পূর্ণ বিপরীত। শেষপর্যন্ত তারা নিজেরাই নগরবাসীর হাসির খোরাক হল, উপহাসের পাত্রে পরিণত হল।
এতকিছু সত্ত্বেও আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, এরকম মানুষরা সে ব্যাপারে কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। বুদ্ধি দিয়ে যারা ব্যাখ্যা করতে পারে না তাকেই ভাওতা আখ্যা দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগে যায়। কিন্তু ব্যাপারটা কিছুতেই আমার মাথায় আসছে না। সত্যি বলছি, আমি কিছু বুঝতে পারছি না, কোনো ধারণার বশবর্তী হয়ে তারা এমন মন্তব্য করছে। কেবল মন্তব্য করাই নয়, রীতিমত দৃঢ়তার সঙ্গেই তারা মতামত ব্যক্ত করছে।
তারা কোন মতামত ব্যক্ত করছে একবার দেখাই যাক না–প্রথমত-রটারডাম নগরের কিছু রসিকজনের কিছু বিশেষ বিরূপতা বর্তমান কিছু সংখ্যক জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং পৌরপ্রধান সম্বন্ধে। পুরোপুরি বিরূপতা যাকে বলে।
দ্বিতীয়ত–বিশেষ কোনো একটা অসৎ আচরণের অপরাধে দু-দুটো কানই একেবারে গোড়া থেকে কেটে দেওয়া হয়েছে এমন এক বদ্ধ মাতাল বেঁটেখাটো একজন দিন কয়েক ধরে ব্রুজেস নগরের কাছাকাছি স্থান থেকে বেপাত্তা হয়ে গেছে। বহুবার খোঁজখবর করেও তার হদিস পাওয়া যায়নি।
তৃতীয়ত–সম্পূর্ণ বেলুনটার গায়ে যেসব খবরের কাগজ আঁটা দিয়ে সেঁটে দেওয়া হয়েছিল সেগুলো সবই হল্যাণ্ডে ছাপা হয়েছিল। অতএব সেগুলো যে চাদে ছাপা হয়নি এতে তিলমাত্রও সন্দেহের অবকাশ নেই, থাকতে পারে না। আর কাগজগুলোর গায়ে ময়লা জড়ানো, খুবই ময়লা জড়ানো। তার ওপর মুদ্রাকর প্রাক বাইবেল স্পর্শ করেও শপথ করে বলতে পারে যে, সেগুলো অবশ্যই রটারডাম নগরের ছাপাখানায়ই ছাপা।
আর চতুর্থত–মদ্যপ হান্স ফাল নিজে আর তার পাওনাদার বলে যে তিনজন। অলস প্রকৃতির লোকের কথা উল্লেখ করেছে, মাত্র দু-তিনদিন আগেও তাদের একটা ছোট দেশি মদের দোকানে মদ গিলতে দেখা গেছে। আর তারা সমুদ্রের ওপার থেকে। নোটের গোছা নিয়ে সবেই ফিরে এসেছে। অদ্ভুত কাণ্ড বটে। উপসংহার সবাই ভাবছে, মানে ভাবাই উচিত যে, রটারডাম নগরে অবস্থিত ‘কলেজ অব অ্যাস্ট্রনমাস’ আর পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের সব কলেজ–আর জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সম্বন্ধে মন্তব্য করছি না। তবে নিঃসন্দেহে, রীতিমত জোর দিয়েই বলা চলে, ছেড়েছুঁড়ে খুব কম করে বললেও বলা যেতে পারে, যা হওয়া দরকার, যা হওয়া স্বাভাবিক তার চেয়ে বেশি বড়, বেশি ভালো বা বেশি জ্ঞানীও কিন্তু নয়। তবে সব কলেজ ও সব জ্যোতির্বিজ্ঞানী অবশ্যই এর মধ্যে পড়ে না।
দ্য আয়ারল্যান্ড অব দ্য কে
সংগীত! সংগীত রচয়িতা যেমন প্রতিভার অধিকারী হন, আবার যিনি উপভোগ করেন, তাঁকেও ঠিক তেমনই প্রতিভাধর হতে হয়। অর্থাৎ যার-তার পক্ষে যেমন সঙ্গীত রচনা করা সম্ভব নয়, ঠিক তেমনই সবাই সংগীত বোঝেনও না।
একটা গানের পত্রিকার সমালোচক একবার যা লিখেছিলেন, তাতে মনে হয়েছিল, তিনি কৃতিত্বটা কেবলমাত্র সংগীত রচয়িতাকেই সম্পূর্ণ দিয়েছিলেন। গানের শ্রোতার এতে কোনো কৃতিত্ব আছে বলে তিনি মনে করেন না।
এছাড়া আরও একটা কথা আছে, যা অবশ্য যাবতীয় প্রতিভার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
একটা কথা স্বীকার না করে উপায় নেই। স্রষ্টার সৃষ্টিকে সম্পূর্ণরূপে উপভোগ করতে হলে দরকার নির্জন পরিবেশ।
