বিশেষ করে উচ্চমর্গের সংগীতের উপযুক্ত পরিবেশ অবশ্যই নির্জন হতেই হবে। যখন কউ সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ, মানে একেবারে একা থাকে তখন সংগীতের মাধুর্য মস্তিষ্কের কোষে কোষে প্রবেশ করে। সংগীতের মাধ্যমে যারা ঈশ্বরকে ডাকেন–আরাধনা করেন, তারা অবশ্যই এ-ব্যাপারটাকে অন্তর থেকে মেনে নেবেন।
আর যা-ই হোক, এর একটা ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। তবে মাত্র একটাই। যদি নির্জনতায় প্রকৃতির সঙ্গলাভ করা সম্ভব হয় তবে, মনকে কানায় কানায় পরিপূর্ণ করে দেয় গানের সুখ। ঈশ্বরের আরাধনায় আত্মমগ্ন হতে হলে, ঈশ্বরের মহান সান্নিধ্য লাভ কি ভালো নয়?
চারিদিকের বিচিত্র সমারোহের মাঝখানে কেবলমাত্র মানুষই নয়, অন্য কোন প্রাণের উপস্থিতিই আমার কাছে একটা মামুলি দাগ-চিহ্ন বলে মনে হয়।
তবে এটা খুবই সত্য যে, আমার মন-পছন্দ করে আঁধারে ঢাকা উপত্যকা, ধূসর পাথুরে অঞ্চল, পছন্দ করি জলরাশির নিঃশব্দ হাসি, বনভূমির দীর্ঘশ্বাসকে আমি অন্তর থেকে পছন্দ করি।
নিতান্ত অস্বস্তির দিবান্দ্রিার মধ্যেও যা পছন্দ করি, সুউচ্চ, আকাশচুম্বী, সন্ধানি, আত্মম্ভরী পাহাড়গুলোকে, যারা সর্বক্ষণ অনেক ওপর থেকে সন্ধানি-দৃষ্টি মেলে সবকিছুর ওপর নজর রাখছে। আমি এসব কিছুকেই অন্তর থেকে ভালোবাসি।
সত্যি এরা যেন এক অগণিত ও অবিশ্বাস্য এমন প্রাণময় সত্তা, যা অতিকায় একটা গোলকের সঙ্গে মিলে-মিশে একাকার হয়ে রয়েছে। যার পথে অবস্থান করছে সদা-সর্তক প্রহরী, যারা মূক পরিচারিকা আকাশের গায়ে ঝুলন্ত ওই সূর্য, চাঁদ আর গ্রহ-নক্ষত্র শাসক, জীবন যার অনন্ত, ঈশ্বর যার চিন্তা-ভাবনা, ধ্যান-ধারণা।
আর? আর যার আনন্দ স্মৃতি কেবলমাত্র জ্ঞানে, তার অদৃষ্ট অনন্ত-অসীমের মধ্যেই পথ হারিয়ে বসেছে।
আরও আছে, যার প্রাণবসন্ত স্পন্দনের সঙ্গে তুলনা চলতে পারে মস্তিষ্কের প্রাণময় স্পন্দনের। কিন্তু আমরা এ অণুরণিত সত্ত্বাটাকেই প্রাণহীন বস্তু হিসেবে জ্ঞান করে থাকি-অনুরণিত প্রাণময় বস্তু ঠিক যেভাবে আমাদের দেখে থাকে।
টেলিস্কোপ আমাদের পরম সহায়ক হিসেবে কাজ করে চলেছে। এ-অদ্ভুত যন্ত্রটা আমাদের অশেষ হিতসাধন করছে। এ যন্ত্র আর গণিতবিদদের কল্যাণে আমরা জানতে পেরেছি, মহাকাশটাই একটা অফুরন্ত বিস্ময়। যেখানে একের পর এক বস্তুময় জগতের অবস্থান রয়েছে। যিনি নিজেকে খুবই জ্ঞানী মনে করেন। সর্বদা বিশেষ জ্ঞানীর ভান করেন, এ তথ্য কিন্তু তার জ্ঞানবুদ্ধির গোচরে নয়।
ঈশ্বরের সুষ্ঠু পরিকল্পনা যখন আছে, অসীম শূন্যতার মাঝে মাঝে অগণিত বস্তুর সমাহার, তখন তিনি যে কেবলমাত্র আমাদের চেনা-জানা এ-পৃথিবীর বুকে প্রাণের সঞ্চার ঘটিয়ে কর্তব্য সম্পাদন সম্পূর্ণ হয়ে গেছে বলে ক্ষান্ত হবেন, আর অন্যান্য বস্তুদের তার সুমহান পরিকল্পনার বাইরে রাখবেন, তাদের নিয়ে কোন ভাবনা-চিন্তাই করবেন না–তাও কী কখনও সম্ভব?
আমি বলব না, অবশ্যই সম্ভব নয়।
কালচক্রের মধ্যে অবস্থান করছে কালচক্র, চক্রনৃত্যের পর রয়েছে আর এক চক্রনৃত্য। এভাবেই রহস্য সঞ্চারিত হয়েছে–এর শেষ নেই, কিছুতেই শেষ নেই, ইতি টানার উপায় নেই।
এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, সবকিছু তো অনবরত আবর্তন করে চলেছে, স্বীকার করছি, কিন্তু কিভাবে তারা প্রতিনিয়ত আবর্তিত হচ্ছে? এর একটাই জবাব–পরমপুরুষকে কেন্দ্র করে সবকিছু প্রতিনিয়ত আবর্তিত হয়ে চলেছে। এ আবর্তনের শেষ নেই, বিরাম নেই এতটুকুও। চলছে তো চলছেই, ঘুরছে তো ঘুরছেই।
এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে কেবলমাত্র আমরাই অবস্থান করছি, আমরা ছাড়া আর কোনো কিছুরই অস্তিত্ব নেই। এরকম ধারণার বশবর্তী হওয়াটা কিন্তু ভুল, অবশ্যই ভুল।
কেন ভুল? কেন এমন দৃঢ়তার সঙ্গে কথাটা বলছি? অস্বীকর করার উপায় নেই যে, এ বস্তুময় বিশ্বে প্রাণের সঞ্চার ঘটানোই তার বাসনা। এমন বাসনা যিনি আঁকড়ে রয়েছেন তার পক্ষে কী কোনোরকম পক্ষপাতিত্ব রাখা সম্ভব, নাকি তাকে এটা মানায়? এর একটাই উত্তর হতে পারে–না, অবশ্যই মানায় না।
ঠিক এরকমই অতিমাত্রায় কল্পনার বশবর্তী হওয়ার জন্যই আমি পাহাড়-পর্বত, বন-জঙ্গল, নদ-নদী আর সাগর-মহাসাগরের সান্নিধ্য লাভ করলেই, আমার মধ্যে কেমন যেন একটা অস্বাভাবিক ভাব মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, ধ্যানে আত্মমগ্ন হয়ে পড়ে। কেবলমাত্র কথাই বা বলি কেন, যেকোনো মানুষের কাছেই তো তা চমৎকার বিবেচনা করা হয়। এ নেশার বশীভূত হয়ে আমি যেন কেমন বিভোর হয়ে পড়ি, পড়েছিলামও বহুবার। আমাকে মন্ত্রমুগ্ধের মতোই এ-নেশা দূর থেকে দূরান্তে টেনে নিয়ে গেছে। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই। আমি তখন মোহগ্রস্ত মন্ত্রমুগ্ধের মতোই দিগ্ধিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটে গেছি।
তারপর, নেশার বশীভূত হয়ে উদ্রান্তের মতো ছুটে যাওয়ার পর আমার মধ্যে কোন বিশেষ ভাবের সঞ্চার ঘটেছে? একের পর এক অজানা-অচেনা প্রাকৃতিক পরিবেশে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলতে পারিনি। তখন আমার নিজেকে কেমন মনে হয়েছে? এর একেবারে যথাযথ উত্তর দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে শুধুমাত্র এটুকুই বলতে পারি, সে মুহূর্তে আমি নিজেকে সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ জ্ঞান করেছি। একা, একেবারেই একা।
আমি একদিন এরকমই এক অভিযানে বেরিয়েছিলাম। তখন ক্রামগত এগিয়ে যেতে যেতে শেষপর্যন্ত হাজির হয়েছিলাম পাহাড়ে ঘেরা সবুজ বনানীতে ঢাকা এক মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে। সেখানে পাহাড়ের চূড়াগুলো যেন সদম্ভে মাথা উঁচিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব ঘোষণা করছে। আর সেখানে পাহাড়ের গা-বেয়ে বিষণ্ণ নদীগুলো এঁকে-বেঁকে হেলে-দুলে নেমে আসছে সমতল ভূমির উদ্দেশ্যে। আর এখানে-ওখানে অবস্থান করছে কয়েকটানিস্তরঙ্গ পর্বত, হ্রদ। কাঁচের মতো স্বচ্ছ তাদের পানি। সেগুলো এমন নিস্তরঙ্গ যেন হঠাৎ করে দেখলে মনে হয়, সেগুলো বুঝি অনন্ত শয্যায় শায়িত, চিরনিদ্রায় মগ্ন।
