আমার প্রিয় ভদ্র মহোদয়গণ, আমার তখনকার পরিস্থিতির কথা শুনে আপনারা হয়তো খুশিই হবেন–এভাবে একের পর এক ঝড়-ঝাঁপটা, উদ্বেগ উৎকণ্ঠা আর একেবারেই অভূতপূর্ব বিপদ থেকে অভাবনীয়ভাবে উত্তরণের মাধ্যমে শেষমেষ রটারডাম নগর থকে যাত্রা শুরু করার পর থেকে উনিশ দিনের মধ্যে এমন অবিশ্বাস্য। আর এও খুবই সত্য যে, এমন একটা অভাবনীয় কাজ কোনো পৃথিবীবাসী বাস্তবায়িত তো দূরের কথা, কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।
আরে, আমার অভিযানের কথা তো এখনও শুরুই করলাম না। আসলে, ভদ্রমহোদয়গণ, আশা করি আপনারা অবশ্যই কল্পনা করতে পারছেন, যেহেতু আমি অন্য একটা গ্রহে একটা বছর নয়, পাঁচ-পাঁচটা বছর কাটিয়ে এসেছি যারনিজস্ব বৈশিষ্ট্যই যে কেবলমাত্র নজর কাড়ার মতো মনোলোভা তাই নয়, বরং দ্বিগুণ। আকর্ষণীয় উপগ্রহ হিসেবে তার সঙ্গে মানুষের পৃথিবীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের জন্য, আর তার চেয়ে বড় কথা। স্টেট কলেজ অব অ্যাস্ট্রনমির জন্য আরও বেশ কিছু আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সাধ্যমত জোগাড় করে এনেছি। এর জন্য যে আমাকে বহু কষ্ট যে স্বীকার করতে হয়েছে, আশা করি তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
হ্যাঁ, আমি যা-কিছু বলছি তার শতকরা একশো ভাগই সত্য, সম্পূর্ণ বাস্তবও বটে।
আমার অভিযানটাকে সম্পূর্ণ করতে গিয়ে আমি এমন অনেক কিছু ফেলে এসেছি যা আমার প্রিয় ভদ্রমহোদয়গণের কাছে বিস্তারিতভাবে পেশ করতে পারলে আমার আনন্দের সীমা থাকবে না।
আমি যে গ্রহের কথা আপনাদের কাছে বলতে চাইছি, তার আবহাওয়া, শীত আর গ্রীষ্মের অত্যাশ্চর্যভাবে চক্রাকারে আবর্তন, একদিকে কালচে সূর্যের ভয়ানক কিরণচ্ছটা আবার বিপরীত পক্ষে মেরু প্রদেশের শৈত্য, সে দেশের কুৎসিত চেহারার মানুষগুলোর আচার ব্যবহার আর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ ও কাজকর্ম, তাদের জ্ঞানের অভাব হেতু ভাষার অজ্ঞাতা, ভাষা প্রকাশের ক্ষমতার অভাবে অত্যাশ্চর্য এক পদ্ধতির মাধ্যমে মনের ভাব বিনিময়, চাঁদের কোনো মানুষের সঙ্গে পৃথিবীর মানুষটার দুর্বোধ্য যোগাযোগ আর সব শেষে চাঁদের বহিঃস্থ দুর্বোধ্য ঘুটঘুঁটে অন্ধকার আর জমাট বাঁধা রহস্য যা আজও মানুষ দূরবীণ চোখে লাগিয়ে, অনুসন্ধিৎসু নজরে দীর্ঘসময় ধরে নিরীক্ষণ করেও উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়নি, কোনোদিন হবেও না।
উপরোক্ত কথাগুলো আছেই, এ ছাড়া আরও অনেক কথাই আমি জানাতে আগ্রহী।
আর আমার যা-কিছু কথা, এক এক করে সবই তো বললাম আর আমার শেষ কথাও সুধীবর্গের সামনে পেশ করেছি। এবার সবার আগে আমার পুরস্কার দাবি করছি।
আমার স্ত্রী-পুত্র পরিজনের কাছে, আমার দেশে, মাতৃভূমি পৃথিবীতে ফিরে যাওয়ার জন্য আমি অত্যুগ্র আগ্রহী হয়ে পড়েছি।
আমার কাছে আরও যে সব ভুরি ভুরি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জমা আছে, সেগুলোর বিনিময়ে আপনাদের কাছে আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ রটারডাম নগর থেকে যাত্রা করার পর আকাশপথ পরিক্রমার সময় আমার তিন পাওনাদার সহকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মৃত্যুর জন্য আমাকেই সম্পূর্ণরূপে দোষারোপ করা হয়েছে। এর জন্য আমাকে যে অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়েছে তা থেকে আমাকে রেহাই দিতে হবে, অর্থাৎ আমার অনুরোধ আমাকে মার্জনা করা হোক। আর একারণেই আমি এ চিঠিটা লিখতে উৎসাহি হয়েছি। এ ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যের বশীভূত হয়ে আমি এত লিখছি না।
আমার এ চিঠিটা যে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে সে অবশ্যই একজন চন্দ্রলোকের অধিবাসী। আমি তাকে বিশেষভাবে অনুরোধ করেছি, তিনি যেন অনুগ্রহ করে আমার এ কাজটা করে দিয়ে অবশেষ উপকার সাধন করেন, অর্থাৎ আমার এ চিঠি সঙ্গে নিয়ে পৃথিবীতে পৌঁছে দেন।
তাকে আরও অনুরোধ করেছি, চিঠিটা পৌঁছে দিয়েই তিনি যেন চন্দ্রলোকের উদ্দেশ্যে আবার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রা না করেন। ভদ্রমহোদয়গণ আমার চিঠি পড়ে কি উত্তর দেন, তার জন্য যেন অপেক্ষা করেন। কোনোভাবে যদি আমার বাঞ্ছিত মার্জনাটা পেয়ে যান তবে সেটা নিয়েই আমার কাছে ফিরে আসেন ও সেটা আমার কাছে পৌঁছে দেন।
ধন্যবাদান্তে
আপনাদের সেবক
হান্স ফাল
আমার লেখা চিঠিটা নিয়ে আসার হিতকাঙ্খী চন্দ্রলোকবাসী যথাসময়ে পৃথিবীর বুকে হাজির হল। অতুলনীয়, একেবারেই অবিশ্বাস্য চিঠিটা অধ্যাপক রুবাদুব গভীর মনোযোগের সঙ্গে পড়লেন। একবার নয়, একাধিকবার তিনি চিঠিটা পড়লেন। যতবার তিনি পড়লেন ততবারই তার বিস্ময় উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে লাগল। তার বিস্ময় এমনই চরম পর্যায়ে পৌঁছাল যে আচমকা তার হাত থেকে পাইপটা দুম্ করে মাটিতে পড়ে গেল।
এ তো গেল অধ্যাপক রুবাদুবের কথা। আর মীনহার সুপারবাস ভন আন্ডারডুক? সে মুহূর্তে তিনি চোখ থেকে চশমা খুলে রুমাল দিয়ে বার কয়েক মোছামুছি করে পকেটে রাখতে গিয়েও থমকে গেলেন। তিনি নিজেকে আর নিজের সামনে এতখানি বিস্মিত হলেন যে বিস্ময়ে আর প্রশংসায় যন্ত্রচালিতের মতো গোড়ালির ওপর ভর করে যন্ত্রচালিতের মতো তিন তিনবার চক্কর খেয়ে ফেললেন।
মীনহীর সুপারভাস ভন আন্ডারড্রক মুহূর্তের জন্য ব্যাপারটা নিয়ে ভেবে মনস্থির করে ফেললেন–ক্ষমা? হ্যাঁ, এ পরিস্থিতিতে ক্ষমা চিন্তা না করাই সঙ্গত। আর ক্ষমা না করে উপায়ও তো কিছু হবার নেই।
এদিকে অধ্যাপক রুবাদুবও নিশ্চিন্তে বসে নেই। তিনিও ক্ষমার ব্যাপারটা নিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন হলেন। তিনি শেষপর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন। তারপর নিজের মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে শপথবাক্য উচ্চারণ করলেন। প্রখ্যাত অধ্যাপক ভন আন্ডারডুকও তার সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হলেন।
