শ্বাস কষ্টের উপশম কিছুটা হলেও সম্পূর্ণরূপে স্বস্তি পেলাম না। উপায়ও তো কিছু নেই। অনন্যোপায় হয়ে আগের মতো দৃঢ়তার সঙ্গেই পরিস্থিতিটার মোকাবেলা করতে লাগলাম।
প্রায় একই রকমভাবে আমি সময় গুজরান করতে লাগলাম। আমার আকাশ যানটা আমাকে নিয়ে ক্রমেই ওপরে উঠতে লাগল। আমি উঠছি তো উঠছিই, মুহূর্তের জন্যও আমার ওপরে ওঠার বিরাম নেই।
তেসরা এপ্রিল। পেরিয়ে চৌঠা এপ্রিলের সকাল হল। সেদিনটাও কেটে গেল। পাঁচই এপ্রিলের সকাল এলো। আমার উৰ্দ্ধগতির বিরাম নেই। তারপর এক-এক করে ষোলই এপ্রিলও পেরিয়ে গেল।
সতেরই এপ্রিল সেদিন ভোর হতে না হতেই আমাকে আকাশ-ভ্রমরের এক মহালগ্নের মুখোমুখি হতে হল। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ঘুম ভেঙে গেল। পৃথিবীর, নিচের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে না করতেই হঠাৎ নজরে পড়ল ভূ-স্তরের প্রকৃতির আমূল পরিবর্তন ঘটে গেছে। রীতিমত অভাবনীয় ব্যাপার। চমকে উঠলাম। আমার মাথায় যেন আচমকা আকাশ ভেঙে পড়ার জোগাড় হল।
আমার শরীরের সব কয়টা স্নায়ু যেন একই সঙ্গে ঝনঝ নিয়ে উঠল। যে তীব্র ভয় আর বিস্ময় আমার বুকের ভেতরে অকস্মাৎ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল তাতে আমি অভিভূত
হয়ে পারলাম না। আর আমার সে মুহূর্তের অকল্পনীয় মানসিক পরিস্থিতির কথা কাউকে বুঝিয়ে বলা তো দূরের কথা, এমনকি ভাষায় প্রকাশ করাই দুঃসাধ্য।
পরিস্থিতিটা আঁচ করা মাত্রই আমার হাঁটু দুটো থরথরিয়ে কাঁপতে লাগল। দাঁতে দাঁত লেগে যাওয়ার জোগাড় হল। মাথার চুলগুলো সজারুর কাঁটার মতো খাড়া হয়ে। উঠল। আর মনে হল, গায়ের রক্ত যেন ক্রমেই হিম হয়ে আসছে।
হায়! এ কী সর্বনাশা কাণ্ড ঘটে গেছে। তবে, তবে কি বেলুনটা ফেটেই গেছে! ভয়ঙ্কর এ ধারণাটা আমার মাথায় চেপে বসল। আর এর কারণও আছে যথেষ্টই। বেলুনটা ফেটে না গেলে এমন অভাবনীয় কাণ্ড তো কিছুতেই ঘটায় না। হ্যাঁ, মানসিক স্থিরতা আমার মধ্য থেকে লোপ পেয়েছিল। বুদ্ধিভ্রম ঘটেছিল। আর অতিরিক্ত বিস্ময়ই ছিল এর কারণ।
তবে এটা কিন্তু মিথ্যা নয় যে, আমি অনবরত নিচেই নেমে চলেছি। অনবরত অবতরণের মাধ্যমেই আরও পুরো একটা দিন কেটে গেল।
হ্যাঁ, আমি যে ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছি এতে তিলমাত্রও ভুল নেই।
উনিশে এপ্রিল। উনিশে এপ্রিলের ভোর। রাতের অন্ধকার কেটে গিয়ে ভোরের আলো ফুটে উঠল। সে দিনটা আমার জীবনের এক চরম আনন্দের দিন। আমি যে আনন্দ ও বিস্ময়ের জোয়ারে ভেসে চললাম তা কাউকে বলে বুঝাবার মতো ভাষা আমার নেই।
আমার আকস্মিক বিস্ময়টুকুর কথা ব্যক্ত করছি। পকেট গড়িতে তখন নয়টা বাজে। সকাল নয়টা হঠাৎ মনে হলো চাঁদটা যেন আমার একেবারে কাছে চলে এসেছে। সে যে কী বিস্ময়, কী আনন্দানুভূতি তা আর বলার নয়।
আমার আকাশযান বেলুনটা কিন্তু অনবরত দ্রুতগতিতে নিচে নেমেই চলেছে। খুব বেশি হলেও আর মাত্র আধ মাইলের ব্যবধান।
আমি ব্যস্ত হাতে গা থেকে কোটটা খুলে ফেললাম। মাথা থেকে টুপিটা নামিয়ে আনলাম। আর ঝটপট বুটজোড়াও খুলে ফেললাম।
এবার বেলুনটার দিকে নজর দিলাম। পকেট থেকে পেন্সিল-কাটা ছুরিটা দিয়ে সাধ্যমত দ্রুততার সঙ্গে বেলুনের দড়িটা কেটে গাড়িটাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললাম। সেটাকে দুহাতে শক্তভাবে মুঠো করে ধরে বিস্ময় বিস্ফারিত দৃষ্টিতে সারা দেশটাকে দেখতে লাগলাম।
ব্যস, আর ভাবনা-চিন্তা করার অবকাশ পেলাম না। অতর্কিতে বিচিত্র দর্শন একটা শহরের বুকে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম।
কয়েক মুহূর্ত নিশ্চল-নিথর পাথরের মূর্তির মতো পড়ে রইলাম। প্রায় সংজ্ঞাহীন আমার অবস্থা।
এক সময় ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালাম। দেখলাম, বেটেখাটো কুৎসিত বহু মানুষ আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে। তাদের সবার চোখেই বিস্ময়ের প্রলেপ মাখানো। কপালের চামড়ায় ভাঁজ এঁকে, ভ্রু কুঁচকে সবাই আমার দিকেনিস্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। সবাইনির্বাকনিস্পন্দ। কারো মুখে টু-শব্দটিও নেই। মাত্রাতিরিক্ত বিস্ময়ই হয়তো বা তাদের বাশক্তি কেড়ে নিয়েছে।
আমাকে তুলে বসাতে, আমাকে সাহায্য করার জন্য কেউ-ই-এগিয়ে এলো না, আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল না।
জড়বুদ্ধি মানুষের মতো আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা একে অন্যের দিকে তাকিয়ে লোকগুলো ঠোঁট টিপে টিপে হাসতে লাগল। কেবল আমাকে নিয়েই তাদের কৌতূহল নয়। আমি আর আমার বেলুনটা উভয়ই তাদের সমান কৌতূহলের কারণ। তাই তো তারা একবার আমার দিকে, পরমুহূর্তেই আমার বেলুনটার দিকে চোখ ফিরিয়ে কৌতূহল মিশ্রিত সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকাতে লাগল।
আমার চারদিকে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চেহারা ছবি, পোশাক পরিচ্ছদ আর হাবভাব দেখে আমি ঘৃণায় চোখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলাম।
আমি উপরের দিকে, সদ্য ফেলে-আসা পৃথিবীর দিকে মুখ তুলে তাকালাম। আমার জন্মস্থল সাধের পৃথিবীকে হয়তো বা চিরদিনের মতোই ছেড়ে এসেছি। আর কোনোদিনই হয়তো পৃথিবীর মাটিতে ফিরে যেতে পারব না। পৃথিবীর বাতাসে শ্বাসক্রিয়া চালাতে পারব না, আর দুচোখ ভরে দেখতে পারব না পৃথিবীর আলোকরশ্মি।
অপলক চোখে মাথার ওপরের যেন দু-ডিগ্রি ব্যাসযুক্ত একটা তামাটে রঙের সুবিশাল বর্ম স্থিরভাবে আটকে রয়েছে। আর তারই একদিকের দিগন্ত রেখাটা অত্যুজ্জ্বল সোনালি আলোয় ঝিকমিক করছে। অদ্ভুত সে আলোচ্ছটায় চোখ দুটো যেন ঝলসে যাওয়ার উপক্রম। জল আর স্থলভূমির লেশমাত্রও চোখে পড়ল না। গাঢ় মেঘের আস্তরণ সবকিছুকে চোখের আড়াল করে রেখেছে। কেবলই মেঘ আর মেঘ। মেঘের আড়ালে পৃথিবীটা যেন অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে।
