আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। নিঃসন্দেহ হলাম, সহসা আর কোনো বিপদের আশঙ্কা নেই।
খুবই দ্রুতগতিতে ওপরে উঠে চলেছি। পকেট থেকে ঘড়িটা বের করে দেখলাম, সাতটা বাজে। ব্যারোমিটারের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করলাম। বুঝতে পারলাম, পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে সাড়ে নয় মাইল অবস্থান করছি। এবার শ্বাসকষ্ট একটু বেশি রকমই অনুভব করতে লাগলাম। সে সঙ্গে মাথায়ও যন্ত্রণা অনুভব করতে লাগলাম। যন্ত্রণাটা ক্রমে। তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগল।
গালের কাছে হঠাৎ ঠাণ্ডা অনুভব করতে লাগলাম। হায়, এ কী অদ্ভুত কাণ্ড রে বাবা! চোখের মণি দুটো কোটর থেকে অনেকটা ঠেলে বেরিয়ে আসছে। আরও অবাক হলাম যখন দেখলাম গাড়ির সবকিছু রীতিমত বিকৃত–অস্বাভাবিক বোধ হচ্ছে, এমনকি বেলুনটা পর্যন্ত।
এমন অভাবনীয় একটা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে ঘৃণাক্ষরেও ভাবিনি। তাই ভয়ে মুষড়ে পড়াটা মোটেই অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়।
এ পরিস্থিতিতে কর্তব্য স্থির করা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়ল। হঠাৎ বেয়াকুবের মতো একটা কাজ করে ফেললাম। পাঁচ পাউন্ড ওজনের তিন-তিনটি বালি বোঝাই থলেকে ঝটপট বাইরে ছুঁড়ে দিলাম।
হায়! এ-কী অবিবেচকের মতো কাজ করলাম। বালি বোঝাই থলে কয়টা ফেলে দেওয়ার ফল হলো হিতে-বিপরীত। বেলুনের উর্দ্ধগতির বেগ অনেকাংশে বেড়ে গেল। সেটা তর তর করে ওপরে উঠতে উঠতে আমাকে বাতাসের এমনই এক সূক্ষ্ম স্তরে নিয়ে হাজির করল, যা আমাকে ভয়ঙ্কর একটা পরিস্থিতিতে ফেলে দিল। কেবল আমার পক্ষেই বা বলি কেন? আমার অভিযানেরও ভীষণ অন্তরায় হয়ে উঠল।
আচমকা আমি আরও মারাত্মক পরিস্থিতির চাপে পড়ে যন্ত্রণায় রীতিমত কাতরাতে লাগলাম। মাংসপেশীতে অস্বাভাবিক খিচুনি অনুভব করলাম। সর্বাঙ্গ থেকে থেকে কুঁকড়ে যেতে লাগল। আর তা দীর্ঘস্থায়ী না হলেও মিনিট পাঁচেক তো আমাকে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে কাটাতেই হয়েছে।
খিচুনিটা থেমে যাবার পরও আমার শারীরিক অস্বস্তি কাটল না, বেশ কিছুক্ষণ অনবরত হাঁপালাম। তার থেকে এমন কষ্ট হতে লাগল যে, দমবন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হল।
এবার আমার পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে পড়ল। এখন আর কেবলমাত্র কানের ছিদ্র দুটো দিয়েই নয়, চোখের কোণ আর নাক দিয়েও চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত ঝরতে আরম্ভ করল।
নিজের দুর্বিষহ শারীরিক অস্বস্তি সত্ত্বেও ঘাড় ঘুরিয়ে পায়রাগুলোর দিকে তাকালাম। দেখলাম, তারাও নিরবচ্ছিন্ন অস্বস্তির মধ্যে পালাবার ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।
আর বিড়ালটা? তার অবস্থাও খারাপ। সে খুবই করুণ স্বরে মাও-মাও করেই চলেছে। তার জিভটা পর্যন্ত বেরিয়ে এসেছে। বিষক্রিয়ার ফলে যেন এদিক-ওদিক টলছে। এ পরিস্থিতির মধ্যে আরও কিছুটা সময় কাটাতে হলে আমার মৃত্যু অনিবার্য।
কেবলমাত্র বিড়ালটার কথাই বা বলি কেন? আমার পক্ষে এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে কতক্ষণ যে পিতৃদত্ত জীবনটাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে তা একমাত্র অন্তর্যামীও জানেন। মিনিট কয়েকের মধ্যেই আমার ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যাওয়াও কিছুমাত্র অসম্ভব নয়।
হায়! আমার একী হল। ভাবনা-চিন্তা করার মতো শক্তিটুকুও আমার মধ্যে থেকে উবে গেছে। মাথার টানটানি ভাবটা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। পরিস্থিতি আমাকে ভাবতে বাধ্য করছে। যে কোনো মুহূর্তে আমার ইন্দ্রিয়গুলো এক এক করে বিকল হয়ে পড়বে। আমার চেতনা লোপ পেয়ে যাবে।
যন্ত্রণা। অসহ্য যন্ত্রণা। সে যে কী মর্মান্তিক পরিস্থিতি তা কাউকে বুঝিয়ে বলা সম্ভব নয়। অনন্যোপায় হয়েই মেঝের ওপর শুয়ে পড়লাম। কিছুটা সময় শুয়ে থাকলে যদি ইন্দ্রিয়গুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, তাই টান টান হয়ে শুয়ে পড়লাম।
মিনিট কয়েক নিশ্চল-নিথরভাবে পড়ে থাকার পর মন স্থীর করেই ফেললাম রক্তক্ষরণের পরীক্ষাটা একবারটি করে দেখব, দেখতেই হবে আমাকে।
ভাবলাম, করলামও তা-ই। উপযুক্ত দধি কোথায় যে আমার বাঞ্ছটা পূরণ করতে পারি? কিন্তু এত সহজে হাল ছাড়ার পাত্র আমি নই, ছাড়লে যে চলবেও না। তাই ঝটপট জ্যাকেটের পকেটে হাতটা চালান করে দিলাম। হাতড়ে হাতড়ে পেন্সিল-কাটা ছুরিটা পেয়ে গেলাম। সেটা দিয়ে অতর্কিতে বাঁ হাতের একটা শিরা কেটে দিলাম। গল গল করে ক্ষত স্থান দিয়ে কিছুটা রক্ত বেরিয়ে এলো। এবার কিছুটা স্বস্তি বোধ করতে লাগলাম। মাথার যন্ত্রণাটাও অনেকাংশে লাঘব হয়েছে।
শরীর থেকে ক্রমে রক্ত ক্ষরণ হতে হতে আধগামলা রক্ত বেরিয়ে যাওয়ায় এক এক প্রায় সব কটা খারাপ পরিস্থিতি ও অস্বস্তি কেটে যাওয়ায় হৃমনোবল অনেকাংশে ফিরে পেলাম। তা সত্ত্বেও মেঝে থেকে উঠে দাঁড়াবার মতো সাহস হলো না।
ইতিমধ্যে রক্তক্ষরণ কমতে-কমতে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেছে। হাতের ক্ষতস্থানটায় পট্টি জড়িয়ে দিলাম।
আরও মিনিট পনেরো শুয়েই কাটিয়ে দিলাম। দুঃসাহসের শিকার হয়ে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে প্রমাদ ঘটতে কতক্ষণ।
এক সময় ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম। এবার মনে হল, শরীরটা অনেকটা হালকা হয়ে গেছে। যন্ত্রণাগুলোর উপশম হওয়ায় বেশ স্বস্তি বোধ হচ্ছে।
কিন্তু শরীরের অন্য সব অস্বস্তি কাটিয়ে উঠতে পারলেও শ্বাস কষ্টটা কিন্তু কমেছে খুব কমই।
এবার আমার সাধের আকাশ যানটার দিকে নজর দেবার মতো অবসর পেলাম। এটা ওটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে করতে মনে হলো শীঘ্রই কন্ডেন্সরটার ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে পড়বে। তাই টেনে হিঁচড়ে সেটাকে বের করে সামনে নিয়ে এলাম। সেটাকে ব্যবহারের উপযোগি করে তুলতে আদাজল খেয়ে লেগে গেলাম।
