সত্যি কথা বলতে কি, আমি পড়লাম, উভয় সঙ্কটে। পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকার সুতীব্র বাসনা, আর অন্যদিকে দুঃসহ যন্ত্রণায় প্রাণ প্রায় ওষ্ঠাগত। আর এও স্বীকার না করে উপায় নেই ওই পুস্তক বিক্রেতার কাছ থেকে খরিদ করা বিশেষ বই দুটোই আমাকে পরিকল্পনাটা গ্রহণ করতে, জীবনের গতিকে অন্য পথে চালিত করতে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছিল।
যাক গে, ধানাইপানাই ছেড়ে খোলসা করে বলি–বলাতে যা ঘটে ঘটুক আমার সামর্থ্য যদি শেষপর্যন্ত অব্যাহত থাকে তবে, যদি হিম্মৎ থাকে তবে আমি সুদূরবর্তী চাদে পাড়ি জমাব। চাঁদের বুকে আমি পদচিহ্ন এঁকে দেব।
আমার অকৃত্রিম বাসনার কথা তো আপনাদের কাছে খোলাখুলিই ব্যক্ত করলাম। এবার এক এক করে তুলে ধরছি আপাত দৃষ্টিতে আমার দুঃসাহসিক পরিকল্পনা–অভিযানটাকে বাস্তবায়িত করার জন্য আমি বলব, মানুষের ইতিহাসে এক তুলনাহীন চন্দ্র-অভিযানের কাহিনী। আর সে সঙ্গে আমার কাজের একের পর এক ধাপের অগ্রগতি ও ফলাফলের কাহিনী।
সমতলভূমি থেকে পৌনে চারমাইল উচ্চতার কথা তো আগেই বলে রেখেছি, ঠিক কিনা? সে পরিমাণ উচ্চতায় ওঠার পর আমার, অর্থাৎ আকাশযানটার গতি উর্ধমুখি কিনা তা বোঝার জন্য একটা পালক ছেড়ে দিলাম।
পালকটা গতি দেখে নিঃসন্দেহ হলাম, তখনও আমার আকাশযান দ্রুত উপরের দিকে ধেয়ে চলেছে।
আমার আকাশযানটা যখন দ্রুতগতিতে ওপরের দিকে ছুটেই চলেছে তখন আর মিছে বালির থলেগুলোকে ফেলে দেওয়ার দরকার নেই। বাধ্য হয়েই আমি ওকাজ থেকে বিরত হলাম।
তখন পর্যন্ত শ্বাসক্রিয়া ভালোভাবেই চালাতে পারছিলাম। কোনোরকম কষ্ট, কোনোই অস্বস্তিবোধ করছিলাম না। এমনকি মাথায়ও যন্ত্রণা অনুভব করছিলাম না।
এবার ঘাড় ঘুরাতেই বিড়ালটার দিকে চোখ পড়ল। সে পা চারটি ছড়িয়ে আয়েশ করে শুয়ে। আমার খুলে রাখা কোটটার ওপর শুয়ে ঘুমিয়ে আছে। তবে লোলুপ দৃষ্টিতে পায়ে দড়িবাধা পায়রাগুলোর দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে। দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখায় তারা উড়ে যেতে পারছে না। গাড়ির এক সমতল জায়গায় কিছু শস্যদানা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা সেগুলোর সদ্ব্যবহার করতে ব্যস্ত।
পরমুহূর্তেই আবার ঝুলন্ত ব্যারোমিটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলাম। দেখলাম, ওটার পারদস্তম্ভ ইতিমধ্যেই গুটিগুটি অনেকটা ওপরে উঠে গেছে। হিসাব করে বুঝতে পারলাম, আমি ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় পাঁচ মাইল ওপরে অবস্থান করছি। আরও কত উপরের উঠতে হবে ঈশ্বরই জানেন।
পকেট-ঘড়িটায় সাতটা বাজতে বিশ মিনিট বাকী। বেলুনটা দ্রুত একের পর এক মেঘ ডিঙিয়ে অনেকগুলো মেঘের ওপরে উঠে গেল।
মেঘের রাজ্যে হানা দেওয়াই কেবল নয়, একেবারে মেঘের রাজ্যের অভ্যন্তরে ঢুকে যাওয়ার ফলে আমি খুবই অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম। আর অন্য কয়েকটা বিশেষ সমস্যার সম্মুখীন হতে হল। কিছু যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত–একের পর এক বিকল হয়ে গেল। আর মেঘের আপ্যায়নের ফলে আমাকে পুরোপুরি কাকভেজা ভিজে যেতে হল। বাস্তবিকই এ যেন এক বিচিত্র সহাবস্থান।
সত্যি বলছি, আমার তিলমাত্র ধারণাও ছিল না যে, এত বেশি উঁচুতে মেঘের এমন অস্বাভাবিক দাপট থাকতে পারে।
পাঁচ পাউন্ড ওজনের দুটো বালির তলে পাকা ফলের মতো বেলুনটা থেকে নিচে ফেলে দিলাম। হিসাব করে দেখলাম, থলে দুটো ফেলে দেওয়ার পরও মোট একশ পঁয়ষট্টি পাউন্ড ওজনের থলে বেলুনটায় রয়ে গেছে। আর তারই জন্য ভেসে এদিক-ওদিক না গিয়ে মেঘের দাপটকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বেলুনটা সোজা আরও ওপরে উঠে গেল।
আচমকা একট অদ্ভুত কাণ্ডের সম্মুখীন হয়ে আমি রীতিমত হকচকিয়ে গেলাম। অতর্কিত উজ্জ্বল বিদ্যুতের ঝলক অভাবনীয় দ্রুততার ঘরে আকাশের এ-প্রাপ্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত আগুন জ্বেলে দিল। আলোকরশ্মি যে এত উজ্জ্বল হতে পারে এ ধারণা আদৌ আমার ছিল না। ভুলে যাবেন না, অত্যাশ্চর্য, নিতান্ত অবিশ্বাস্য এ ঘটনাটা কিন্তু রাতের অন্ধকারে ঘটেনি, দিনের বেলাতেই ঘটেছিল। আর যদি রাতের জমাট বাঁধা অন্ধকারে ঘটত তবে যে কী মনোলোভা দৃশ্যের সৃষ্টি করত তার বর্ণনা কেবল লেখনিই নয় শিল্পীর তুলিও যথাযথভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারত না। সংক্ষেপে তার বর্ণনা দিলে বলতেই হয় পুরোদস্তুর অভাবনীয় দৃশ্য চাক্ষুষ করে চোখও মনকে তৃপ্ত করা যেত, সন্দেহ নেই। আবার এমনও হতে পারত, সেটা হয়তো নরকেরই কার্বনকপি।
কি হতে পারত সে কথা ছিঁড়ে দিয়ে যেটুকু চাক্ষুষ করলাম তাতেই আমার নাড়ির গতি দ্রুত থেকে দ্রুততর হল, শুরু হলো বুকের ভেতরে নিরবচ্ছিন্ন ধুকপুকানি আর মাথার সবগুলো চুল যেন সঁজারুর কাটার মতো খাড়া হয়ে গেল।
পায়ের তলায়ও চলেছে জমাটবাধা মেঘের একাধিপত্য। অন্ধকার যক্ষপুরী, দিগন্ত জোড়া অন্ধকার গহ্বরের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে আমি অগ্নির বর্ণনাতীত, বীভৎস নারকীয় রূপকল্পনায় নিজেকে লিপ্ত করলাম।
উফ্! ভাগ্য–ভাগ্যের জোরেই হয়তো খুব অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছি, পিতৃদত্ত জীবনটা এবারের মতো রক্ষা পেয়ে গেছে।
বেলুনটা যদি আর মাত্র কয়েকটা মুহূর্তে মেঘের রাজ্যে অবস্থান করত তবে আমাকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষার সাধ্য কারোরই ছিল না। একেবারেই বেঘোরে প্রাণ দিতে হত।
বেলুনটার ক্ষমতা বলেই হোক আর আমার পিতৃপুরুষের ভাগ্যের জোরেই হোক, আমি ইতিমধ্যে দ্রুত এত ওপরে উঠে গেছি যে, এরকম কোনো বিপদের আশঙ্কা মোটেই ছিল না। অতএব বেলুনটার ক্ষমতার তারিফ না করে উপায় নেই। তারই অভাবনীয় কাজের জন্যই তার নিজের অস্তিত্ব অব্যাহত রয়েছে আর আমিও প্রাণে বেঁচে গিয়েছি।
