ব্যাপারটা আমাকে যারপরনাই বিস্মিত করল। আমি কিন্তু তাতে অবাক হলাম না, এমনকি ভয়ে কুঁকড়ে যাওয়া তো দূরের কথাসামান্যতম ভীতিও আমার মধ্যে সঞ্চারিত হলো না।
মিনিট কয়েকের মধ্যে গভীর চিন্তা আমাকে গ্রাস করে ফেলল। আমি চিন্তার জগতের অতলে তলিয়ে গিয়ে নিজেকে পুরোপুরি হারিয়ে ফেললাম। আমি যেন এ জগতের কেউ নই, অন্য কোনো লোকে বাস করছি।
দীর্ঘ চেষ্টার পর পরিস্থিতিটা সম্বন্ধে মোটামুটি ধারণা করে নিতে পারলাম। তারপরই হাত দুটোকে ঘুরিয়ে পিছন দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে পাজামার ফিতের সঙ্গে আটকানো লোহার বকলেসটাকে ধীরে ধীরে খুলে ফেললাম। আমার এবারের কাজ হলো গলাবন্ধটাকে খোলার চেষ্টা চরিত্র করে সেটাকেও কোনোরকমে খুলে ফেললাম। এবার বকলেসের সঙ্গে সেটাকে আটকে দিয়ে কোমরে আচ্ছা করে জড়িয়ে দিলাম।
এবার মাংসপেশীর ওপর চাপ প্রয়োগ করে শরীরটাকে উপরের দিকে সামান্য তুলে বকলেসটাকে গাড়িটার ওপরের দিকে ছুঁড়ে দিলাম। এবার সেটাকে বেতের ঝুড়ির সঙ্গে আচ্ছা করে বেঁধে দিলাম। বেতের ঝুড়িটার আর বিচ্ছিন্ন হবার কোনো সম্ভাবনা রইল না।
সে মুহূর্তে আমার শরীরটা গাড়ির সঙ্গে পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি কোণে লটকে রইল।
আমি নিজেকে ভেতরে ঢুকিয়ে নেবার জন্য প্রয়াস না চালিয়ে প্রায় পনের মিনিট সেভাবেই গাড়িটার সঙ্গে লটকে রইলাম। ভাবলাম, আমি তো দিব্যিই আছি, তোফা ব্যবস্থা। কিন্তু ব্যাপারটা যে বোকামি ছাড়া কিছু নয় তা অচিরেই বুঝতে পারলাম। এবার আতঙ্ক, ভয়-ভীতি হতাশা আর নিরবচ্ছিন্ন বিষণ্ণতা আমাকে পেয়ে বসল। কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। তখন কী যে এক অস্বস্তি আমাকে গ্রাস করে ফেলল, তা কাউকে বুঝিয়ে বলা তো সম্ভবই ছিল না, আসলে আমি নিজেই তা ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারছিলাম না। আর এরই ফলে মানসিক স্থিরতা ও মনোবল আমার মধ্য থেকে উবে গেল। সে জায়গা দখল করল জমাট বাঁধা ভীতি আর আতঙ্ক।
ভাগ্য ভালো যে, আমার সে অভাবনীয় ভীতি আর মানসিক দুর্বলতা দীর্ঘস্থায়ী হলো না। মনকে অচিরেই শক্ত করে বেঁধে ফেলা সম্ভব হল। আর এও বলে রাখা দরকার হঠাৎ জেগে ওঠা তীব্র একটা হতাশাই যেন আমাকে সে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি থেকে সে বারের মতো রক্ষা করেছিল।
এবার আমি উন্মাদের মতো গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে উঠে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়ে সমস্ত শরীরটাকে অল্প অল্প ঝাঁকুনি দিয়ে নিজেকে একটু একটু করে ওপরের দিকে তুলতে লাগলাম। এভাবে নিজেকে তুলতে তুলতে অচিরেই ঝুড়ির মুখটাকে আঁকড়ে ধরে ফেললাম। এবার শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে ওপরে তুলতে তুলতে এক সময় আমার প্রয়াস ফলপ্রসু করা সম্ভব হল। আর গাড়িটায় চেপেই দুম্ করে আছড়ে পড়লাম। সর্বাঙ্গ অনবরত থরথর করে কাঁপতে লাগল। মানুষের শরীর যে এভাবে কাঁপতে পারে আমার অন্তত জানা ছিল না।
গাড়িটার ওপর চিৎ হয়ে পড়ে আমি অনবরত কাঁপতেই লাগলাম। সে মুহূর্তে আমার মনে হলো এ-কাঁপুনি বুঝি আর কোনোদিনই থামবে না। দীর্ঘ সময় কাঁপুনি অনেকটা কমে যাওয়ায় কিছুটা সুস্থবোধ করলাম।
আমি যেন এবার সম্বিৎ ফিরে পেলাম। এবার ঘাড় ঘুরিয়ে বেলুনটাকে দেখতে লাগলাম। সেটার অবস্থা নিরীক্ষণ করে স্বস্তি পেলাম। বুঝলাম, আমার ওপর দিয়ে তুমুল ঝড় ঝাঁপটা বয়ে গেলেও বেলুনটার তেমন ক্ষতি হয়নি। ওটার সঙ্গে যেসব যন্ত্রপাতি আটকানো ছিল সেগুলো অক্ষতই রয়েছে। আর পাথরের কুঁচি আর বালির থলেগুলো আর খাবার দাবারও খোয়া যায়নি। মজুদই আছে।
আমি এবার পকেট থেকে ঘড়িটা বের করে মুহূর্তের জন্য চোখ বুলিয়ে নিয়ে সেটাকে আবার যথাস্থানে খুঁজে দিলাম। দেখলাম, দুটা বাজে।
আমার আকাশযান বেলুনটা নিয়ে তখনও দ্রুত ওপরে উঠেই চলেছে। ঘাড় ঘুরিয়ে ব্যারোমিটারের দিকে তাকালাম। বুঝলাম, আমরা এখন সমতল ভূমি থেকে পৌনে চারমাইল ওপরে অবস্থান করছি।
এবার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিচের দিকে তাকালাম। বুঝতে অসুবিধা হলো না, আমার পায়ের তলায় অন্তহীন উত্তাল-উদ্দাম সমুদ্র অবস্থান করছে। আর তার ওপর ভাসছে। দেশলাইয়ের বাক্সের মতো কালো কালো অসংখ্য বস্তু।
হাত বাড়িয়ে দূরবীক্ষণ যন্ত্রটা নিয়ে চোখের সামনে ধরলাম। এবার চোখের সামনে বিশালায়তন একটা কামানবাহী বৃটিশ যুদ্ধজাহাজ ভাসছে। সেটা দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থান করছে আর অনবরত অস্বাভাবিক দোল খাচ্ছে। হঠাৎ করে দেখে মনে হলো জাহাজটা বুঝি ঢেউয়ের তালে তালে দোল খাচ্ছে।
পায়ের তলায় সমুদ্র, মাথার ওপরে সুবিশাল নীল আকাশ আর অত্যুজ্জ্বল সমুদ্র ছাড়া আর কিছুই আমার দুরবীক্ষণ যন্ত্রটার গণ্ডির মধ্যে ধরা পড়ল না।
আমি একটু স্বস্তিবোধ করায় দ্ৰ মহাজনদের আমার পরিকল্পনাটা সম্বন্ধে দু-চার কথার মাধ্যমে নতুন করে কিছু বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি।
আশা করি আপনাদের মনে আছে, রটারডাম নগরে বসবাসকালে আমি দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে হয়ে মরিয়া হয়ে আত্মহত্যা করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা হয়েছিলাম। আর জেদটা এমনভাবে আমার মধ্যে চেপে বসে যা থেকে কোনো শক্তিই আমাকে। বিরত করতে পারবে না।
তবে প্রসঙ্গক্রমে এ-কথাও বলে রাখছি যে, দারিদ্র্যজনিত। নিরবচ্ছিন্ন হতাশা হাহাকার কিন্তু আমার মধ্যে জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা জাগাতে পারেনি।
