ঠাণ্ডা মাথায় একটু ভাবতেই আকস্মিক বিস্ফোরণের কারণটা আমার কাছে পানির মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। বুঝতে পারলাম, এর জন্য আমি একমাত্র আমি, নিজেই দায়ী। আমার কাজের সামান্য হেরফেরের জন্যই এরকম অত্যাশ্চর্য, একেবারে অভাবনীয় কাণ্ডটা ঘটে গেল। আর এরই জন্য আমি নিজে এখন ওটার ওপর অবস্থান করছি, আর ওর হাতের মুঠোর মধ্যে সম্পূর্ণরূপে আবদ্ধ হয়ে পড়েছি।
সেখানে, গাড়িটার তলায় অসহায়ভাবে পড়ে থাকার সময় আমার মধ্যে একটামাত্র চিন্তাই ভর করল–কি করে আমি জীবনটাকে রক্ষা করতে পারব।
প্রথমে বেলুনটা ভেঙে-ছিড়ে, টুকরো টুকরো হয়ে গেল। তার পরমুহূর্তে শত-সহস্র টুকরোয় বিভক্ত হয়ে তীব্র বেগে চারদিকে ছড়িয়ে দিল। তারপর লাটুর চেয়েও তীব্র গতিতে চক্কর খেতে লাগল। মাতালের মতো টালমাটাল হতে হতে আমাকে আচমকা দুম্ করে ছুঁড়ে দিল। আমি বেতের ঝুড়িটায় আটকা পড়ে অভাবনীয়ভাবে শূন্যে দোল খেতে লাগলাম। আমার মুখ ঝুড়িটার বাইরে আর মাথা নিচের দিকে রেখে আমি আকাশের কাছাকাছি উঁচুতে ঝুলতে লাগলাম। কোনোক্রমে ঝুড়িটার সঙ্গে আমার যে সামান্য সম্পর্ক রয়েছে, তা ছিন্ন হয়ে গেল পরিস্থিতি যে কী মর্মান্তিক হবে–উফ্! না, আর ভাবতে পারছি না। আমার মাথা ঝিম ঝিম করছে।
সে মুহূর্তে নিশ্চিত মৃত্যুর কবল থেকে আমি ভাগ্য গুণে কিভাবে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলাম তা ভাবলে আজও আমার শরীরের রক্ত হিম হয়ে আসার জোগাড় হয়। স্নায়ু শিথিল হয়ে পড়তে শুরু করে। ব্যাপারটা হচ্ছে, অভাবনীয় উপায়ে একটা দড়ির টুকরো বেতের ঝুড়িটার গা থেকে ঝুলছিল। ফুট তিনেক লম্বা ছিল সেটা। ঠিক পড়ে যাওয়ার মুহূর্তে, ঈশ্বরের অপার কৃপার জন্যই হয়তো বা সে দড়িটার সঙ্গে আমার বা পায়ের গোড়ালির কাছাকাছি একেবারেই অত্যাশ্চর্যভাবে আটকে যায়। আমি সেটার সঙ্গে লটকে গেলাম। আমার তখনকার শোচনীয় পরিস্থিতির কথা কারো কাছে ব্যক্ত করা তো দূরের কথা আমি নিজেই ভালোভাবে বুঝে উঠতে পারিনি।
বাতাস। একটু বাতাস যে মুহূর্তে আমার কাছে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় বোধ হতে লাগল। একটু বাতাসের অভাবে আমি মরিয়া হয়ে হাঁপাতে লাগলাম। মাথাটা নিরবচ্ছিন্নভাবে ঝিমঝিম করতে লাগল, শরীরের সবকটা স্নায়ু, সব কটা মাংসপেশী তীব্র যন্ত্রণায় টনটন করতে লাগল। সে যে কী দুঃসহ যন্ত্রণা, কী মর্মান্তিক পরিস্থিতির মধ্যে আমি প্রতিটা মুহূর্ত কাটাতে লাগলাম তা পরমপিতা ছাড়া কারোরই জানার কথা নয়। আর ভাষার মাধ্যমে কারো মধ্যে ধারণার সঞ্চার করা তো নিতান্তই পাগলের প্রলাপ মাত্র।
অসহ্য যন্ত্রণায় আমি শূন্যে ভাসমান অবস্থায় অসহায়ভাবে কাত্রাতে লাগলাম। আমার চোখ দুটো যেন কোটর থেকে ঠেলে বেরিয়ে আসতে লাগল। অসহ্য! কী যে দুর্বিষহ যন্ত্রণায় আমি অসহায়ভাবে ধুঁকতে লাগলাম তা আর বলার নয়।
আমার স্নায়ুগুলো ক্রমেই শিথিল হয়ে পড়তে লাগল। কেমন যেন একটা বমি বমি ভাব আমাকে পেয়ে বসল। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে পড়তে লাগল। ব্যস, সংজ্ঞা হারিয়ে আমি এলিয়ে পড়লাম। আমি সংজ্ঞাহীনতার অন্ধকারের অতল গহ্বরে সম্পূর্ণরূপে তলিয়ে গেলাম। অন্ধকার! নিঃসীম অন্ধকার।
দড়ির টুকরোটার সঙ্গে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় কতক্ষণ যে ঝুলে ছিলাম তা বলতে পারব না। তবে অনেকক্ষণ যে ছিলাম তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। এরকমটা বলার এবার বেল্প এক দুটো হাত ফিরিয়েই আশিরাগুলো ফুলে করে নখগুলো কারণ এই যে, আমি যখন সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে চোখ মেলে তাকালাম তখন পূর্ব আকাশে ভোরের আলো উঁকি দিতে শুরু করেছে। আর ভাঙাচোরা বেলুনটা ধীর-মন্থর গতিতে অন্তহীন সমুদ্রের ওপর দিয়ে ভেসে চলেছে। কাছাকাছি তো নয়ই, এমনকি যতদূর দৃষ্টি যায় কোথাও ডাঙার লেশমাত্রও চোখে পড়ল না।
আমি যে ভাসতে ভাসতে কোন দিকে এবং কোথায় চলেছি তার কিছুই আমার জানা নেই। তবে এটুকু বলতেই হয়, আমার সে অসহনীয় যন্ত্রণা, স্নায়ুবিক শৈথিল্য এবং মানসিক অস্বস্তির তীব্রতা আগের চেয়ে অনেকাংশে হ্রাস পেয়ে গেছে।
এবার বেশ ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতিটা সম্বন্ধে বিচার বিবেচনা করতে লাগলাম।
একের পর এক দুটো হাতকেই ধীরে ধীরে চোখের সামনে নিয়ে এলাম। যে দুটোর দিকে মুহূর্তের জন্য দৃষ্টি ফিরিয়েই আমি রীতিমত হকচকিয়ে গেলাম, দৃষ্টি থমকে গেল। দেখলাম, আমার হাতের শিরা-উপশিরাগুলো ফুলে একেবারে মোটা মোটা দড়ির মতো হয়ে উঠেছে, আর আঙুলের ডগাগুলো, বিশেষ করে নখগুলো আলকাতরার মতো কালো হয়ে গেছে, কালসিটে পড়লে ঠিক যেমনটি হয়। ব্যাপারটা ঠিক মাথায় গেল না।
মাথাটা সাধ্যমত এদিক ওদিক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভালোভাবে হাত দুটোকে দেখলাম, কিন্তু তেমন ফোলেনি তো। অবাক হবার মতো ব্যাপারই বটে।
ব্যাপারটাকে তখনকার মতো সামাল দেবার জন্য জ্যাকেটের পকেটে একটা হাত চালান করে দিলাম। হাতড়ে হাতড়ে কতগুলো ট্যাবলেট আর দাঁত-খড়কের মোড়কটাকে খুঁজলাম। না পেলাম না। মনটা হঠাৎ আরও বিষিয়ে উঠল। সত্যি ব্যাপার অবাক হবার মতোই বটে। সেটা কোথায় যে বেপাত্তা হয়ে গেল ভেবে কুল কিনারা পেলাম না।
এবার উপলব্ধি করতে পারলাম, বাপায়ের গোড়ালিতে অসহ্য ব্যথা হচ্ছে।নিদারুণ অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম। আর সে সঙ্গে আমার বর্তমান পরিস্থিতির একটা ধোয়াটে, ঝাপসা চেতনা অন্তরের অন্তঃস্থলে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।
