আমার সহকর্মীদের বিরক্তি উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে লক্ষ্য করে আমি ভেতরে ভেতরে খুশিই হলাম। এভাবে চলতে থাকলে এক সময় তাদের বিরক্তি ও অসন্তুষ্টি চরম পর্যায়ে উঠে গেলে, তারা হয়তো আমাকে ছেড়ে যেতেই বাধ্য হবে। তাদের ব্যাপার স্যাপার দেখে আমি একটু ঘাবড়েই গেলাম। তারা চলে গেলে আমি কম-বেশি সমস্যায়ই পড়ব।
আমি কিন্তু ভেবেই রেখেছি, আমার এ-পরিকল্পনাটাকে কোনোরকমে সাফল্যমণ্ডিত করতে পারলে, উৎরে গেলে তাদের যা-কিছু প্রাপ্য প্রতিটা কানাকড়ি পর্যন্ত শোধ করে দেব। আমার আন্তরিক ইচ্ছাটার কথা তাদের কাছে ব্যক্ত করলাম। তারা আমার কথায় তখনকার মতো আশ্বস্ত হল।
আমার কথার ওপর ভরসা করে নতুন উদ্যমে আমার কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে কাজে মেতে গেল। আমি এবার পুরোদ েকাজটা এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগলাম। সে যে কী তৎপরতা তা কাউকে বুঝিয়ে বলা সম্ভব নয়।
আমি তিন সহযোগিকে নিয়ে বেলুনটাকে ফোলানোর চেষ্টা চালাতে লাগলাম। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে প্রাণান্ত প্রয়াস চালিয়ে সেটাকে প্রয়োজন-অনুযায়ী ফোলানো সম্ভব হল।
এবার ফোলানো বেলুনটার সঙ্গে দড়িটাকে শক্ত করে বেঁধে দিলাম, তারপর এক এক করে আমার যাবতীয় যন্ত্রপাতি–ব্যারোমিটার, দূরবীক্ষণ যন্ত্র, চৌম্বক শলাকা, কম্পাস, ইলেকট্রোমিটার, বাঁশি, পকেট-ঘড়ি, ঘণ্টা, প্রভৃতি তার মধ্যে রেখে দিলাম। কেবলমাত্র যন্ত্রপাতির কথাই বা বলি কেন? প্রচুর খাদ্যবস্তু আর পানীয় জলও গাড়িটাতে রাখলাম। খুঁটিনাটি অত্যাবশ্যক জিনিসপত্র যা-কিছু গাড়িতে নেওয়া দরকার সবকিছু গাড়িতে তোলার পর একটা মোটাসোটা বিড়াল আর একজোড়া পায়রাও গাড়িতে তুলে নিলাম।
প্রয়োজন অনুযায়ী গাড়িটাকে তৈরি করতে রাত শেষ হয়ে গেল। এক সময় পূর্ব আকাশে ভোরের আলো দেখা দিল। শহরের বুকে ভোরের আলো ফোঁটার সময় হয়ে এলো।
ভাবলাম, আর দেরি নয় এবার যাত্রা শুরু করা দরকার। হাতের জ্বলন্ত চুরুটটা যেন হঠাৎ আঙুলের ফাঁক থেকে খসে পড়েছে এমন ভাব দেখিয়ে সেটাকে হাত থেকে ফেলে দিলাম।
পরমুহূর্তেই পথ থেকে চুরুটটা আমার হাতে তুলে নেবার জন্য উপুড় হবার সুযোগ পেলাম। আর এরকম চিন্তা করেই যে সেটাকে হাত থেকে ফেলে দিয়েছি তা। তো আর আর স্বীকার করার অপেক্ষা রাখে না। যাক, যে কথা বলছিলাম, চুরুটটাকে তুলে নেবার অছিলায় ছোট্ট একটা পিপের তলা থেকে সামান্য পরিমাণ বের করে রাখা। দেশলাইয়ের কাঠিটাতে আগুন জ্বেলে দিলাম।
এমনই সন্তর্পণে এবং দ্রুততার সঙ্গে কাজটা সেরে ফেললাম যে, আমার তিন সহযোগি ব্যাপারটার কিছুমাত্রও টেরই পেল না। দেশলাইয়ের কাঠিটায় আগুন ধরিয়ে দেওয়ামাত্র আমি যন্ত্রচালিতের মতো দ্রুত গতিতে গাড়িটায় চেপে বসলাম। গাড়িতে চেপেই ব্যস্ত হাতে গাড়ির সঙ্গে বাঁধা একমাত্র দড়িটাকে সুতীক্ষ একটা অস্ত্র দিয়ে ঘ্যাচ করে কেটে দিলাম।
ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে আমার মনটা খুশিতে নেচে উঠল। সে যে কী নিঃসীম আনন্দ, কী মজা, তা কাউকে বুঝিয়ে বলা সম্ভব নয়।
একলক্ষ পঁচাত্তর পাউন্ড বালি বোঝাই কতগুলো থলে নিয়ে অভাবনীয় দ্রুতগতিতে গাড়িটা তরতর করে ওপরে উঠে যেতে লাগল। মুহূর্তের মধ্যেই আমি ওপরে, একেবারে মেঘের রাজ্যে পৌঁছে গেলাম। সে মুহূর্তে আমার মনে হলো আরও সমপরিমাণ বোঝা গাড়িতে চাপিয়েও অনায়েসেই ওপরে ওঠা সম্ভব হত।
ভূপৃষ্ঠের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার সময় দেখলাম, ব্যারোমিটারে পারদ ত্রিশ ইঞ্চিতে অবস্থান করছে, আর উনিশ ডিগ্রিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেন্টিগ্রেড থার্মোমিটারের পারদ।
ওপরে ওঠার সময় একটা ব্যাপার আমাকে খুবই বিস্মিত করেছিল, গজ পঞ্চাশেক ওপরে উঠতেই একেবারেই অভাবনীয় একটা কাণ্ড ঘটে গেল। আর সেটা ঘটল মুহূর্তের মধ্যেই। অস্বাভাবিক বেগে বিশ্রি একটা কড়কড় আওয়াজ করতে করতে আমার পিছন দিক থেকে বিদ্যুতের ঝলকানির মতো আগুন, জ্বলন্ত কাঠকয়লা, আগুনের মতো গরম টুকরো টুকরো পাথর আর যন্ত্রটার ভাঙাচোরা টুকরো টুকরো অঙ্গ প্রত্যঙ্গ মিলে এমন তুলকালাম কাণ্ড বাঁধিয়ে দিল যে, ব্যাপার দেখে আমার আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হয়ে পড়ার জোগাড় হল। আর মনে হলো মুহূর্তের মধ্যে আমার বুকের ভেতরে ফুসফুস বুঝি কুঁকড়ে মুচড়ে গেছে। অচিরেই বুঝি তার কাজ বন্ধ হয়েনিস্তব্ধ হয়ে যাবে।
আমার পক্ষে বেশিক্ষণ স্থির থাকা সম্ভব হলো না। হাঁটু দুটো তিরতির করে কাঁপতে লাগল। তারপর সর্বাঙ্গে কম্পন অনুভব করলাম পর মুহূর্তেই দুম্ করে আছাড় খেয়ে গাড়িটার তলায় পড়ে গেলাম। ভাবলাম, খেল খতম।
গাড়িটার তলায় পড়ে মুমূর্ষ-প্রায় অবস্থায় আমি ভাবতে লাগলাম, ব্যাপারটাকে নিয়ে আমি মাত্রাতিরিক্ত মাতামাতি করে ফেলেছি। আর তারই ফলে আমার বরাতে আরও অনেক, অনেক দুর্ভোগই রয়েছে। সেকেন্ডের মধ্যেই আমি পৌনে মরা হয়ে গেলাম। শরীরের সবটুকু রক্ত বুঝি নিঃশেষে মাথায় উঠে গেছে।
আমি হুমড়ি খেয়ে গাড়িটার তলায় পড়ে যাবার পর মুহূর্তেই ভয়ঙ্কর একটা সংঘর্ষ আচমকা রাতের জমাটবাধা অন্ধকারকে খান খান করে আকাশটাকে টুকরো টুকরো করে দিল। সে যে কী ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তা ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়।
