যাক, সংসার খরচের মতো সামান্য কিছু অর্থ হাতে তুলে দিয়ে, যত শীঘ্র সম্ভব বাড়ি ফেরার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমি তার কাছ থেকে বিদায় নিলাম।
আমার স্ত্রী সদর দরজা পর্যন্ত এগিয়ে এসে বিষণ্ণ মনে, কৃত্রিম হাসির রেখা মুখে ফুটিয়ে তুলে আমাকে বিদায় জানাল।
আমি পথে নামলাম।
একটা কথা স্বীকার না করে পারছি না, আমি নিজের মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি, আমার স্ত্রী সব সময়ই আমাকে একজন সত্যিকারের কুঁড়ের বাদশা বলেই মনে করত। যদিও সে মুখ ফুটে বল না, তবু আমার বিশ্বাস, তার বদ্ধমূল ধারণা, আমার মতো গেঁতো লোক দ্বিতীয়টি নেই। আমি তার কাছে নিতান্তই একটা আপদ না হলেও বোঝাস্বরূপ তো বটেই, এক ধরনের মানুষ আছে যারা কাজের বেলায় অষ্টরম্ভা, মুখেন। মারিতং জগৎ–আমিও তাদেরই একজন। বসে বসে অলীক কল্পনা করা ছাড়া আমি নাকি আর কোনো কাজেরই নই।
জানি না, আমার ধারণাটা কতখানি সত্য–আমার বিশ্বাস, আমার বিদায় মুহূর্তে আমার স্ত্রীর মুখে বিষণ্ণতার কালো ছায়া নেমে এলেও মনে মনে একটু আধটু হলেও সে খুশিই হয়েছে। কারণ, এরকম একটা নিষ্কর্মার চেঁকির হাত থেকে দিন কয়েকের জন্য হলেও নিষ্কৃতি পাওয়া গেল।
স্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি যখন রাস্তায় নামলাম, তখন শহরের বুকে রাত। অন্ধকার বিরাজ করছে।
দেখলাম, আমার পাওনাদার তিনজন, এতদিন যারা আমার চক্ষুশূল ছিল, নিরবচ্ছিন্নভাবে আমাকে এতদিন জ্বালিয়ে মেরেছে, তারা আমার জন্য সদর দরজায় অপেক্ষা করছে।
আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পাওনাদার তিনজনের সঙ্গে মিলিত হলাম। হাসিমুখে সবার সঙ্গে করমর্দন সারলাম। সহকারী হিসেবে তাদের সঙ্গে নিলাম। আসলে এখন যা-কিছু করার বাকি, যা-কিছু করতে হবে তা একার দ্বারা কিছুতেই সম্ভব নয়। দু তিনজন সহকারী চাই-ই চাই। তাদের সঙ্গে আগেই এরকম কথাবার্তা সেরে রেখেছিলাম। তাই মূর্তিমান তিনজন সন্ধ্যা থেকেই সদর দরজায় মোতায়েন রয়েছে।
পাওনাদার তিনজনকে সহকারী হিসেবে নিয়ে মালপত্রের কাছে গেলাম। আমি আর সহকারী তিনজন, মোট চারজনে মোটর, অতিকায় বেলুন আর অন্যান্য অত্যাবশ্যক সামগ্রি নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। বড় রাস্তা না ধরে অলিগলি দিয়েই আমরা হাঁটতে লাগলাম। ঘুরপথে, একটু বেশি রাস্তা অতিক্রম করতে হলেও এটাই নিরাপদ মনে করলাম।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা আমাদের বাঞ্ছিত স্থানে পৌঁছে গেলাম। আমাদের কাজের উপযোগি সবকিছু ঠিকঠাক থাকায় কাজ শুরু করতে কোনোরকম বেগ পেতে হলো না। আমরা জোরকদমে কাজে মেতে গেলাম। হাত চালিয়ে কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে আমরা যত শীঘ্র সম্ভব কাজটা সেরে ফেলার জন্য তৎপর হলাম।
বাতাস প্রয়োগ করে বেলুনটাকে ফোলাবার সময় ছোট ছোট পিপেগুলো যেখানে রাখব মনে মনে ভেবে রেখেছিলাম, সেখানে সবার নজরের আড়ালে আমি আগেভাগেই গোপনীয়তা বজায় রেখে মাটিতে একটা গর্ত খুঁড়ে রেখেছিলাম। এরকম সব গর্তকে পঁচিশ ফুট বৃত্তাকার ব্যাসে সাজালাম। আর পিপেটাকে বৃত্তটার ঠিক কেন্দ্রস্থলে স্থাপন করার কথা। পিপেটাকে যেখানে বসানো হবে ঠিক সেখানে আর একটা অধিকতর গভীর ও ব্যাসযুক্ত একটা গর্ত খুঁড়ে ফেললাম। এবার পাঁচটা খালি পিপের মধ্যে বারুদ বোঝাই করলাম। এগুলোকে এবার গর্তগুলোর পাঁচটার মধ্যে প্রতিটাতে একটা করে ঢুকিয়ে দিলাম। এখানে বলে রাখা দরকার, প্রত্যেকটা পিপেতে পঞ্চাশ পাউন্ড করে বারুদ ঠেসে ঠেসে ঢুকিয়ে দিলাম। ছোট ছোট পিপে ও বড়সড় পিপেগুলোকে যথাপদ্ধতিতে আচ্ছাদিত বারুদ দিয়ে যুক্ত করে দিলাম। এভাবে কাজের একটা অংশ সম্পূর্ণ করার পর গর্তটাকে মাটি দিয়ে বোঝাই করে বড় পিপেটাকে তার ওপর স্থাপন করলাম। আর একটা দেশলাইয়ের কাঠির বারুদের বিপরীত মাত্র ইঞ্চিখানেক মাটির ওপর জেগে থাকে আর সেটা যেন কারো চোখে না পড়ে।
ব্যস, কিছুটা অন্তত নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। এবার আমি অবশিষ্ট গর্তগুলোকে ঝটপট মাটি দিয়ে বন্ধ করে দিয়ে পিপেগুলোকে জায়গামতো বসিয়ে দিলাম। যাক। নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ সম্পূর্ণ করা হল।
সেদিনটা ছিল ১ এপ্রিল।
আগেই কথা প্রসঙ্গে বলেছি, সেটা ছিল এক ঘুটঘুঁটে অন্ধকার রাত। তার ওপর আকাশে জমাটবাধা কালো মেঘের একাধিপত্য। ফলে তারা দেখতে পাওয়ার প্রশ্নই পড়ে না। আর মাঝে মধ্যে ছিটেফোঁটা বৃষ্টি পড়ছে, যাকে বলে ইলশেগুড়ি। এমন প্রতিকুল প্রাকৃতিক পরিস্থিতির জন্য আমার প্রয়োজনীয় কাজকর্ম সারাই মহাসমস্যার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রতিটা পদক্ষেপেই বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। অক্লান্ত পরিশ্রম, অভাবনীয় অধ্যবসায় ও নিরবচ্ছিন্ন ধৈৰ্য্য সম্বল করে আমাকে কাজটার প্রতিটা ধাপ সম্পূর্ণ করতে হচ্ছিল।
আমি কায়দা করে সহকর্মী তিনজনকে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রমের কাজে লাগিয়ে দিলাম। তারাও অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনা না কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে আমার নির্দেশিত কাজে মেতে গেল। তবে তাদের কৌতূহলমিশ্রিত প্রশ্নবাণ আমাকে যারপরনাই উত্যক্ত করতে লাগল।
কাজের ফাঁকে আমার সহকর্মী তিনজনের মধ্যে থেকে একজন তো কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে আমাকে সরাসরি প্রশ্নই করে বসল–এমন হরেক আকৃতি ও প্রকৃতির যন্ত্রপাতি কোন কাজে লাগবে, দয়া করে বলবেন কি? বৃষ্টিতে এভাবে ঘণ্টর পর ঘণ্টা ভিজে, কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে এসব কাজ করে শেষপর্যন্ত ফয়দাই বা কি হবে? এমন আরও কতসব তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্নবাণে আমাকে সজাগ করে দেওয়ার জোগাড় করল।
