আরও টাকাকড়ি চাই। আরও কিছু অর্থ সংগ্রহ করতে না পারলে আমার পরিকল্পনা বাস্তবরূপ দেওয়া যে কিছুতেই সম্ভব নয়, এ-ব্যাপারে আমি সম্পূর্ণ নিঃসন্দেহ। যে করেই হোক প্রয়োজনীয় অর্থ আমাকে সংগ্রহ করতেই হবে। কিন্তু উপায়? উপায় যা হোক কিছু একটা তো করতেই হবে। এতখানি এগিয়ে শেষপর্যন্ত হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েনিশ্চেষ্ট হয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে এমন সুন্দর একটা পরিকল্পনা বানচাল হয়ে গেলে আফসোসের আর সীমা পরিসীমা থাকবে না।
আমি আবার মতলব ভাঁজতে লাগলাম, কিভাবে আরও কিছু পয়সা কড়ি জোগাড় করা যায়। এবার বিভিন্নরকম অজুহাত দেখিয়ে শীঘ্রই পরিশোধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বহু পরিচিতজনের কাছ থেকে টাকাকড়ি হাতিয়ে জড়ো করতে লাগলাম।
এত টাকা কিভাবে, কবে শোধ করতে পারব এসব চিন্তা ভাবনা না করেই আমি সমানে ধার করে মোটা অঙ্কের টাকা জোগাড় করে ফেললাম।
এবার একটা-দুটো করে প্রতিটা বারো গজ মাপের মসলিনের টুকরো কিনে জড়ো করতে লাগলাম। সেগুলো ক্যাম্বিক মসলিনের টুকরো। আর বেশ কিছু পরিমাণ ভালোভাবে পাক দেওয়া দড়ি, ইয়া পেল্লাই একটা বেতের মজবুত ঝুড়ি, প্রচুর পরিমাণ রবারের বার্ণিশ, আর এমন সব জিনিসপত্র এক-এক করে জোগাড় করতে মেতে গেলাম, ইয়া পেল্লাই একটা বেলুন তৈরি করতে যা-কিছু দরকার হতে পারে।
সব জিনিসপত্র এক জায়গায় জড়ো করলাম। এবার হাত চালিয়ে জিনিসগুলো গোছগাছ করে নেওয়া দরকার। আমার স্ত্রীর ওপর এ গুরুদায়িত্বটা অর্পণ করলাম। তার ওপর আমার আস্থা পুরো দস্তুর। তবে, গোছগাছের কাজকর্ম কিভাবে সারতে হবে তা তাকে মোটামুটি বুঝিয়ে দিলাম।
স্ত্রীর সাহায্যে সবকিছু গোছগাছ করার পর আমি এবার সেগুলোকে রাতের অন্ধকারে সবার চোখের আড়ালে, খুবই সতর্কতার সঙ্গে রটারডাম নগরের পূর্বদিকের এক নির্জন নিরালা স্থানে নিয়ে জমা করলাম।
এবার আমি পরিকল্পনামাফিক খুবই গোপনে একটা বিশেষ প্রকৃতির গ্যাস তৈরির কাজে লেগে গেলাম। সেটা এমনই এক বিশেষ প্রকৃতির গ্যাস, যা আমি ছাড়া আর কেউ-ই আজ পর্যন্ত তৈরি করেনি, করতে পারেনি। আর কিছু না হোক অন্তত এরকম কোনো কাজে অবশ্যই ব্যবহার করেনি।
সত্যি কথা বলতে কি, আমার সে গ্যাস তৈরির গোপন রহস্যটা আমি অনায়াসেই খোলসা করতে পারতাম। কিন্তু সে যে ন্যায়ত ধৰ্মত উচিত হবে না। কারণ সত্যি কথা বলতে কি, সে গোপন তথ্যটার মালিক আমি নিজে নই, ফরাসি দেশের এক নাগরিক। সে দেশেরনিজ শহরের অধিবাসী। আর তিনি শর্ত আরোপ করেই তথ্যগুলো আমাকে বলেছেন।
সবচেয়ে বড় কথা, আমি কোন কাজে সে গ্যাস ব্যবহার করব তা না জেনেই তিনি। আমার কাছে গোপন তথ্যটা প্রকাশ করেছেন। আর তিনি আমাকে এও বলেছেন, কোনো একটা বিশেষ জানোয়ারের ঝিল্লি ব্যবহার করেও এরকম একটা বেলুন অনায়াসেই তৈরি করে নেওয়া সম্ভব।
হ্যাঁ, খুবই সত্য বটে, বিশেষ এ-জানোয়ারের ঝিল্লি থেকে তৈরি বেলুন থেকে গ্যাস কিছুতেই বাইরে বেরিয়ে যেতে পারে না।
তবে ওই পদ্ধতিতে বেলুন তৈরি করতে অবশ্যই বহু অর্থ ব্যয় হয়, তা ছাড়া কাম্বিক মসলিনের ওপর রবারের আস্তরণ ব্যবহার করলেও সেটা বেলুন তৈরির কাজে একই রকম উপযোগি হবে কিনা এ ব্যাপারেও আমি নিঃসন্দেহ ছিলাম না।
উক্ত ঘটনাটা এখানে উল্লেখ করার কারণও আছে যথেষ্টই। কারণটা হচ্ছে, আমার বিশ্বাস যে, এমনও হতে পারে সে ভদ্রলোক ভবিষ্যতে এরকম গ্যাস ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি দিয়ে বেলুন তৈরি করে আকাশে ওড়ার চেষ্টা করতে পারেন। আশা করি, আর খোলসা করে বলার দরকার নেই। তবুও বলছি, ভবিষ্যতে যদি এ-গ্যাস ব্যবহার করে তিনি আকাশে উড়তে আগ্রহী হন তবে আমি অবশ্যই তাকে এ-বিশেষ আবিষ্কারের খ্যাতি থেকে বঞ্চিত করতে আগ্রহী নই, করবও না।
যা-ই হোক, আমি বেলুন তৈরির কাজে মেতে গেলাম। কঠোর পরিশ্রম, নিরবছিন্ন অধ্যবসয়ায় এবংনিষ্ঠার সঙ্গে আমি কর্তব্য কর্ম সম্পাদনে লেগে রইলাম। অল্প কয়দিনের মধ্যেই আমি বাঞ্ছিত বেলুন তৈরির কাজটা সেরে ফেললাম।
বহু আকাঙ্ক্ষিত বেলুন তৈরির কাজটা সারার পর আমি যাত্রার উদ্যোগ আয়োজন করতে লাগলাম।
আমি বেলুন তৈরির ব্যাপারে স্ত্রীর সঙ্গে আরও একবার কিছু অত্যাবশ্যক কথাবার্তা সেরে নেওয়া দরকার মনে করলাম। তাকে পাশে বসিয়ে কথাবার্তার মাধ্যমে তার কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়ে নিলাম, যে, প্রথম দিন বাড়ি থেকে গোপনে বেরিয়ে হারা উদ্দেশ্যে হাঁটতে হাঁটতে সেই বইয়ের দোকানে যাওয়া, বই দুটো খরিদ করা থেকে শুরু করে বেলুনটা তৈরির কাজ সম্পন্ন করতে যা-কিছু করেছি, সে সব কথা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গোপন রাখবে, কোনো অবস্থাতে সামান্যতম তথ্যও সে কারো কাছে ফাস করবে না। সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে, কথা দিল। কিন্তু আমাকে তার কাছে প্রতিশ্রুতি দিতে হল, যত শীঘ্র সম্ভব আমি তার কাছে ফিরে আসব।
আমি এবার খরচপাতি করার পর হাতে অবশিষ্ট সামান্য যা-কিছু টাকাকড়ি, স্ত্রীর হাতে দিলাম তার সংসার খরচ হিসেবে। আমার অনুপস্থিতিতে তার খাওয়া-পড়া আর তার অন্যান্য টুকিটাকি তো তাকে কিনতে হবে। আমার ঘরণীটি সত্যি খুবই কর্মঠ মহিলা। সে পারে না এমন কাজ খুব কমই আছে। আমার সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়াই সে যাবতীয় কাজকর্ম সেরে নিতে পারে।
