কয়েকটা পাতা উলটে, অল্প সময়ের মধ্যে বইটার প্রতি আমার আগ্রহ যারপরনাই বেড়ে গেল। চোখের সামনে থেকে সরাতে তো পারলামই না, বরং বইটার মধ্যে নিজেকে পুরোপুরি ডুবিয়ে দিলাম।
দুনিয়ার অন্য সবকিছুর অস্তিত্ব ভুলে গিয়ে বইটার শেষ পাতা পর্যন্ত একবারে পড়ে শেষ করে ফেললাম। আগেই বলেছি, বইটা বেশি মোটা নয়, চটি। একবার পড়ার পর মন তৃপ্ত হলো না। আরও একবার পড়ে ফেললাম।
বইটা পড়া শেষ করে যখন হুঁস ফিরে পেলাম তখন দেখলাম শহরের বুকে চারদিকে রাতের অন্ধকার নেমে আসতে চলেছে।
বইটা হাত থেকে নামিয়ে রেখে আত্মস্থ হবার পর ভাবলাম, রাত হয়ে গেছে। আর এখানে বসে থাকা সমিচিন হবে না, এবার বাড়ি ফেরা দরকার। চেয়ারটার আশ্রয় ছেড়ে উঠে পড়লাম। সোজা বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলাম।
আমি বাড়ির দিকে হেঁটে চলেছি বটে, কিন্তু মন আমার পড়ে রয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্বন্ধীয় ওই চটি বইটার পাতাগুলোর মধ্যে। আর তার বক্তব্য মাথার মধ্যে অনবরত চক্কর খেয়ে চলল।
বাড়ির দরজায় যখন পৌঁছলাম তখন অনেক রাত হয়ে গেছে। চিন্তাক্লিষ্ট মন নিয়ে বিছানায় আশ্রয় নিলাম।
আলোনিভিয়ে শুয়ে পড়লাম বটে, কিন্তু কিছুতেই আমার ঘুম এলো না। ঘুম তো আর আমার আজ্ঞাবাহী নয় যে, বিছানায় শোয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমে চোখ জুড়ে আসবে, গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ব। ঘুম তো আসার কথাও নয়, আমার মাথায় যে ভিড় করে রয়েছে গুচ্ছেরখানেক এলোমেলো আজগুবি চিন্তা। চিন্তার সে জট ছাড়াতে ছাড়াতেই রাত কেটে ভোরের আলো ফুটে উঠল।
না, ভোর হবার পর আর বিছানা আঁকড়ে পড়ে থাকার সম্ভব হলো না। এক লাফে অস্থির চঞ্চল মন নিয়ে বিছানা থেকে নেমে এলাম।
বিছানা ছাড়ার পর আমার মানসিক অস্থিরতা চড়চড় করে বেড়ে চলল। নিজেকে সামলে-সুমলে রাখতে না পেরে খুব সকালেই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম।
সাধ্যমত লম্বা লম্বা পা ফেলে যে বইয়ের দোকানটায় হাজির হলাম। পকেট হাতড়ে পয়সা-কড়ি যা পেলাম তা দিয়ে একটা ব্যবহারিক জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং একটা যন্ত্র-বিজ্ঞান প্রসঙ্গে লেখা বই খরিদ করে নিলাম।
দোকানির প্রাপ্য দাম মিটিয়ে দিয়ে আমি সঙ্গে সঙ্গে পিছন ফিরে, বই দুটো বগলে নিয়ে সোজা বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলাম।
বাড়ি ফেরবার পর আমাকে যেন অদ্ভুত একটা নেশায় পেয়ে বসল। একটু ফুরসৎ পেলেই বই দুটোর যে কোনো একটা নিয়ে বসে পড়ি। আর তার একের পর এক পাতায় চোখ বুলাতে বুলাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতে লাগলাম। সে যে কী নেশা তা ভুক্তভোগি ছাড়া কাউকে বুঝিয়ে বলা বা যথাযথ ধারণা দেওয়া সম্ভব নয়।
দিনের পর দিন বই দুটোর পাতার মধ্যে ডুবে থাকতে থাকতে আমার মধ্যে অত্যাশ্চর্য, একেবারেই অবিশ্বাস্য একটা ভাবান্তর ঘটতে লাগল। বুঝলাম, বই দুটোর পাতায় বহুবার চোখ বুলানোর ফলেই এ-রকমটা ঘটছে।
সত্যি বলছি, বই দুটো পর পর বেশ কয়েকবার পড়ার ফলেই একটা অদ্ভুত পরিকল্পনা আমার মাথায় খেলতে লাগল। এর পিছনে কোন শক্তির প্রভাব বেশি আমার অতিরিক্ত প্রতিভা, নাকি শয়তানের? এদের কোনটা যে আমাকে বেশি রকম প্রভাবিত করেছে তা নিশ্চিত করে আমি বলতে পারব না।
আরও একটা একেবারেই নতুনতর মতলব আমার মাথায় খেলে গেল। আমার পাওনাদারদের মধ্যে যে তিনজন এঁটুলির মতো আমার পিছনে লেগে রয়েছে, আমার। দরজায় বসে আমার ওপর কড়া নজর রেখে চলেছে তাদের আমার দলে ভেড়াবার চেষ্টা চালাতে লাগলাম। ভাবলাম, তাদের আমার দলে ভেড়াব বললেই তো আর তারা সুড়সুড় করে আমার খাতায় নাম লেখাবে না। আমার প্রতি তাদের খোয়া-যাওয়া আস্থাকে ফিরিয়ে আনতে না পারলে তাদের সার্বিক সহানুভূতি লাভ করার চেষ্টা নিছকই পাগলের চিন্তা তাদের প্রাপ্য অর্থের কিছু-না-কিছু, অন্তত অর্ধেক হলেও ফিরিয়ে দিতে হবে।
আমি উক্ত পাওনাদার তিনজনের অর্থ ফিরিয়ে দেওয়ার শুভবাসনা নিয়ে নিজের বসতবাটীটা বিক্রি করে দিলাম। তা দিয়ে তাদের প্রাপ্য মোট অর্থের অর্ধেক মিটিয়ে দিলাম। আর তাদের প্রতিশ্রুতি দিলাম, আমার পরিকল্পনাটা সার্থক, বাস্তবায়িত করতে পারলে অবশিষ্ট প্রাপ্য অবশ্যই মিটিয়ে দেব।
পাওনাদার তিনজন আমার কথায় আশ্বস্ত হল। আমি এবার মওকা বুঝে আমার পরিকল্পনাটাকে সফল করার কাজে তাদের সার্বিক সাহায্য সহযোগিতা প্রার্থনা করলাম।
শিক্ষার আলোক থেকে তারা বঞ্চিত। বুদ্ধিও স্বাভাবিকভাবেই কম। তাই আমার কায়দা কৌশলে পেশ করা বক্তব্যে তারা সহজেই ঘায়েল হয়ে গেল। সত্যি কথা বলতে কি, তারা রীতিমত উচ্ছ্বসিত আবেগের সঙ্গে আমার প্রস্তাবটাকে স্বাগত জানাল। আর আমার মধ্যে খেলে গেল অভাবনীয় এক খুশির জোয়ার।
বহু বুদ্ধি খরচ করে এবং দীর্ঘ চেষ্টা চরিত্রের মাধ্যমে এ-দিককার একটা হিল্লে করে ফেলতে পারলাম।
এবার আমার স্ত্রীর সাহায্য-সহযোগিতা একান্ত অপরিহার্য হয়ে পড়ল। কারণ, আমার অন্যান্য স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি করা দরকার। সে আমাকে সার্বিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিল আর তা রক্ষাও করল। তারই সহযোগিতায় আমি অত্যন্ত গোপনীয়তা বজায় রেখে আমার যাবতীয় সম্পত্তি বিক্রি করে দিতে পারলাম।
হ্যাঁ, সে আমার কথা রেখেছে। এসব ব্যাপার স্যাপার ঘুণাক্ষরেও কারো কাছেই এতটুকু ফাঁস করেনি।
