অতীতে এক সময় যারা পৃথিবীর সবগুলো দেশের শীর্ষে, অর্থাৎ সবচেয়ে সেরা খদ্দের এমন আমাদের সুবিধা-অসুবিধা সম্বন্ধে ভাববার এতটুকু অবকাশ তাদের নেই, ইচ্ছারও পুরোপুরি ভাটা পড়ে গেছে।
সত্যি কথা বলতে কি, সরকারের ক্ষমতা যত হ্রাস পেতে লাগল, যতই শক্তির ঘাটতি হতে লাগল, লোহা আর চামড়ার স্থায়িত্ব ততই বেড়ে যেতে লাগল। সে এক কঠিন পরিস্থিতির উদ্ভব হল।
শেষপর্যন্ত পরিস্থিতি এমন খারাপ হয়ে পড়ল যে, অল্পদিনের মধ্যেই রটারডাম নগরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত তন্ন তন্ন করে খুঁজেও এক জোড়া হাপর জোগাড় করা সম্ভব হলো না। কী সমস্যায়ই না পরা গেল। এত বড় একটা নগরে একটা হাপরও মিলল না। এমনকি এমন এক জোড়া হাপরের হদিস পাওয়া গেল না, যার কোনোরকম হাতুড়ি ঘা দেওয়া বা সেলাই করার দরকার হতে পারে।
এমন একটা সমস্যা-সঙ্কুল পরিস্থিতির মধ্যে কি করে টিকে থাকা সম্ভব বা বেশি দিন বরদাস্ত করা যেতে পারে সেটাই চিন্তার বিষয়।
পরিস্থিতির শিকার হয়ে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আমি ইঁদুরের মতো নিঃস্ব, একেবারে গরিব হয়ে গেলাম। যাকে বলে একেবারেই কপর্দকশূন্য হয়ে গেলাম।
পরিস্থিতি আবার আমাকে এমন রক্তচক্ষু দেখাতে লাগল যে, স্ত্রী-পুত্রের ভরণপোষণের ব্যাপারটাও আমার কাছে রীতিমত অসম্ভব হয়ে পড়ল। আমি একেবারে হাঁপিয়ে উঠলাম। আমার ভালো লাগত না। অন্তহীন হাহাকার আর হতাশা আমাকে পেয়ে বসল।
অসহ্য! সে মুহূর্তে জীবনটা আমার কাছে একেবারেই অসহ্য হয়ে উঠল। তখন আমার প্রধানতম ও একমাত্র চিন্তা হয়ে দাঁড়াল কিভাবে জীবনটাকে শেষ করে দিয়ে দুর্বিসহ অশান্তির হাত থেকে চিরদিনের মতো নিষ্কৃতি পাওয়া যায়। আর একমাত্র চিন্তা আমার মাথায় ভর করল, জীবনটাকে শেষ করে দেবার সুবিধাজনক উপায় কী? একই উপায় উদ্ভাবন করতে গিয়ে তন্ময় হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতে লাগলাম।
কিন্তু আপন চিন্তায় বিভোর হয়ে থাকার মতো সুযোগই বা কোথায়? পাওনাদাররা আমাকে স্থির থাকতে দেয় না। তারা সময় অসময়ে বাড়ি বয়ে এসে জোর তাগাদা দিতে লাগল। তাদের ঘন ঘন তাগাদায় দুদণ্ড স্থির হয়ে বসে যে জীবনটাকে খতম করে দেওয়ার কথা ভাবব, তার সুযোগ তারা দিচ্ছে কই।
পরিস্থিতি ক্রমেই আবারও দুর্বিষহ হয়ে পড়তে লাগল। পাওনাদাররা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমার বাড়িটার চারদিকে পাহারা দিতে থাকে। বাড়ির সীমানার বাইরে বেরোলেই আমাকে সাঁড়াশির মতো চেপে ধরবে, এটাই তাদের লক্ষ্য।
পরিস্থিতি আরও একধাপ খারাপের দিকে গেল। পাওনাদাররা এগিয়ে এসে পালা করে আমার বাড়ির দরজায় বসে থেকে কড়া পাহারা দিতে লাগল। শুধু কি এ-ই? কড়া সুরে আমাকে আইনের হুমকি দিতেও ছাড়ল না। তিনটি লোক এভাবে আমাকে ভোগান্তির চরম সীমায় ঠেলে দিল। তারাই আমাকে সবচেয়ে বেশি করে উত্যক্ত করতে লাগল।
আমি যারপরনাই মনমরা হয়ে পড়লাম। মাঝে মাঝে তাদের ওপর প্রতিশোধাত্মক জেদও আমার মধ্যে চলতে লাগল। দাঁতে দাঁত চেপে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, যদি কোনোদিন মওকা মেলে, এ তিনজনকে যদি হাতের মুঠোয় পাই, তবে এভাবে নিরবচ্ছিন্ন উৎপীড়ন এবং অপমানের প্রতিশোধ নেবই নেব। উপযুক্ত বদলা নানিতে পারলে আমার আমার দেহ-মনের জ্বালা কমবে না। সেই শুভ মুহূর্তের আশায়, পথ চেয়ে তখনকার মতো আত্মহত্যার পরিকল্পনাটাকে বাতিল করে দিলাম। ভাবলাম, দেখাই যাক না, পরিস্থিতির পরিবর্তন হয় কি না, আমার দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির চাকা ঘোরে কিনা।
ওই তিন হতচ্ছাড়া পালা করে রোজই আমার দরজা আগলে বসে থাকতে লাগল। কিন্তু দিন কয়েক এভাবে চালাতে চালাতে তাদের উৎসাহে একটু ভাটা পড়ল। লক্ষ্য। করলাম, পাহারা দিতে দিতে তাদের একজন মাঝে মধ্যেই কোথায় চলে যায়। আমি মনে মনে ভাবলাম, এ-ই মওকা। ব্যস, আর দেরি নয়। একদিন সুযোগের সদ্ব্যবহার করলাম। তাদের চোখে ধূলো দিয়ে আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম। কিন্তু মনে আমার অন্তহীন হতাশা আর হাহাকার। বাড়ি থেকে বেরিয়ে হতাশ মনে বিনা উদ্দেশ্যে ছোট-বড় রাস্তা আর গলি দিয়ে হেঁটে এগিয়ে চললাম। কিন্তু কোথায় যাচ্ছি, কেনই বা হেঁটে চলেছি কিছুই আমার জানা নেই।
বিনা উদ্দেশ্যে হাঁটতে হাঁটতে শেষপর্যন্ত এক সময় একটা গলির মোড়ে পৌঁছলাম। সামনের একটা বইয়ের দোকানের কাছে গিয়ে আচমকা গতি থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম।
দোকানটার সামনে কয়েকটা চেয়ার পেতে রাখা হয়েছে, বুঝতে অসুবিধা হলো, খদ্দেরদের বসার জন্যই এ-আয়োজন। সে যা-ই হোক, চেয়ার যখন খালি পাওয়া গেছে তখন বসতে আপত্তি কোথায়। মুহূর্তমাত্র দেরি না করে আমি তাদের একটা টেনে বসে পড়লাম। আর কেন যে হাতের কাছে যে বইটা পেলাম সেটাকে তাকের ওপর থেকে টেনে হাতে নিয়ে নিলাম বলতে পারব না।
জ্যোর্তিবিজ্ঞানের ওপর লেখা একটা বই। বইটা হাতে নিয়ে একের পর এক পাতা ওল্টাতে লাগলাম। দু-চারটা পাতা উলটেই বুঝতে পারলাম, বইটা ভালোই। তবে সেটা বেশি মোটা নয়, চটি।
বইটার লেখকের নাম ছাপা আছে–এনামের। তিনি বার্লিনের অধ্যাপক হতে পারেন। আর তা যদি না হন তবে এনামের কোনো ফরাসি পণ্ডিত।
স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, এরকম ব্যাপার স্যাপার সম্বন্ধে আমার একটু-আধটু কৌতূহল দীর্ঘদিনের। আর এ-বিষয়ে অল্পবিস্তর খোঁজখবরও আমি রাখি।
