বিমানচারী শেষপর্যন্ত করলেও তা-ই। সে একের পর এক বালির থলে বিমান থেকে ঝটপট নিচে ফেলে দিতে লাগল।
বালির থলেগুলো যে কোথায় কার ঘাড়ের ওপর পড়ছে, সেদিকে তার ভ্রূক্ষেপমাত্র নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেগুলো একের পর এক সরাসরি নগর প্রধানের পিঠের ওপর দমাদম পড়তে লাগল। আর এরই ফলে তিনি এতগুলো মানুষের চোখের সামনে একবার বা দুবার নয়, পর পর ছয়বার ডিগবাজী খাওয়ার ভঙ্গিতে উলটে গেলেন। যাকে বলে কেবলমাত্র বেইজ্জতের ব্যাপারই নয়, এতে তিনি রীতিমত নাস্তানাবুদ হতে লাগলেন।
তবে এও সত্য যে, কেউ যদি মনে করেন নগর-প্রধান অ্যান্ডারডু বিমানচারীর এরকম একটা বিচ্ছিরি কাণ্ডকে নীরবে বরদাস্ত করেছেন, মুখ বুজে হজম করেছেন তবে কিন্তু ভুলই করা হবে।
বরং উপস্থিত নগরবাসীদের বক্তব্য, তিনি আধা ডজনবার ডিগবাজী খাওয়ার সময় প্রত্যেক বারই পাইপ থেকে খুব জোরে বাঁশি বাজাতে লাগলেন। সাধ্যমত জোরেই বাঁশি বাজালেন। তাতে তার প্রচণ্ড ক্ষোভই প্রকাশ পেয়েছে। আর সবাই এও মনে করল, শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি বুঝি এভাবে বাঁশিতে ফুঁ দিতেই থাকবেন।
বালির থলে গুলো ফেলে দেওয়ার ফলে আকাশ যানটা অনেকাংশে হালকা হয়ে যাওয়ায় ক্রমে ওপরে উঠতে উঠতে ইতিমধ্যে বেশ ওপরে উঠে গেছে। তারপর সেটা শূন্যে ভাসতে ভাসতে একসময় রটারডাম নগরের অনেক উঁচু দিয়ে এক সময় দ্রুত মেঘের আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে দিল। ঠিক সেভাবে সেটা মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছিল ঠিক সে-রকমভাবেই ক্রমে মেঘের ভেতরে ঢুকে সম্পূর্ণরূপে মেঘের মধ্যে আত্মগোপন করল। সেটা রটারডামের ভালো মানুষদের বিস্ময় মাখানো নজরের বাইরে চিরদিনের মতো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।
বিমানটা দৃষ্টির বাইরে চলে যাওয়ার পর এবার পথচারী জনতার নজর পড়ল বিমান থেকে উড়ে-আসা চিঠিটার ওপর। সত্যি বলতে কি, বিমানটার অবতরণ এবং চিঠিটানিক্ষেপের ফলে মহামান্য নগরপালক ভন অ্যান্ডারভুকের দেহ-মন আর মর্যাদাকে রীতিমত বিপর্যস্ত করে দিয়েছে।
বালির বস্তার আঘাতে পদস্থ ব্যক্তিটি যত ডিগবাজী খান আর পথে গড়াগড়ি খান না কেন চিঠিটাকে কিন্তু নজরে নজরে রেখেছেন, কিছুতেই হাতছাড়া হতে দেননি।
পথচারীরা অনুসন্ধিৎসু নজরে চিঠিটার দিকে লক্ষ্য রেখে নিঃসন্দেহ হলো যে, চিঠিটা জায়গা মতোই পড়েছে। অর্থাৎ তিনি নিজেই হাত বাড়িয়ে পথের ওপর থেকে চিঠিটা হাতে তুলে নিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, চিঠিটা লেখা হয়েছে ‘রটারডাম কলেজ অব অ্যাস্ট্রনমি’র সভাপতি এবং সহ-সভাপতি অর্থাৎ ভন অ্যান্ডারডুক এবং তাঁর সহকারী অধ্যাপক রুবাদুরের নামে। সভাপতি ভন অ্যান্ডারডুক চিঠিটা হাতে নিয়ে তাঁর সহকারী অধ্যাপক রুবাদুরের সামনে; পথের মাঝে দাঁড়িয়েই চিঠিটা খুললেন।
খামটার মুখ খুলে ভেতর থেকে একটা চিঠি বের করে আনলেন। দেখলেন তাতে স্পষ্টাক্ষরে লেখা রয়েছে–
‘মহামান্য সভাপতি ভন অ্যান্ডারডুক ও সহ-সভাপতি রুবাদুব, রটারডাম কলেজ অব অ্যাস্ট্রনমি’ মহাশয়দ্বয়–
আপনাদের হয়তো স্মরণ থাকতে পারে যে, গত পাঁচ বছর আগে হান্স ফাল নামক কোনো এক ব্যক্তি তিনজন সহকারীকে নিয়ে রটারডাম নগর থেকে বেপাত্তা হয়ে গিয়েছিল। হান্স ফালের সম্পূর্ণ নাম ছিল–ভ্রাট গ্রেটেল হান্স ফাল। আর সে ছিল পেশায় কর্মকার। লোহা পড়িয়ে, পিটিয়ে পাটিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তৈরি করাই ছিল তার জীবিকার একমাত্র উপায়। আর তার তিন সঙ্গিও একই পেশায় নিযুক্ত ছিল।
কিন্তু কেন যে হান্স ফাল কাউকে কিছু না জা নিয়ে, না বলে চুপিসারে বাড়ি থেকে বেপাত্তা হয়ে গিয়েছিল তা কেউই জানে না। মহাশয়দ্বয়, আশা করি আপনারা জেনে অবশ্যই খুশি হবেন যে, আমিই সেই হারিয়ে যাওয়া হান্স ফাল।
আমার সহ-অধিবাসী ও পরিচিতজনরা জানেন যে, ঘেউয়ের ক্রাউট নামক গলির মুখে মুখে অবহিত ছোট্ট ইটের বাড়িটায় গত চল্লিশ বছর যাবৎ আমি বসবাস করছি।
আমি যখন নিখোঁজ হই, তখনও সে বাড়িতেই অবস্থান করছিলাম, অর্থাৎ সে বাড়িটা থেকেই বেপাত্তা হয়ে গিয়েছিলাম।
কেবলমাত্র আমার কথাই বা বলি কেন? আমার পূর্ব পুরুষরাই বংশ পরম্পরায় সে বাড়িটাতেই বাস করে গেছেন।
আমার পূর্বসূরীরা আর আমি একই কর্মকার বৃত্তির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করি। আমাদের পেশার মুখ্য কাজ ছিল হাপর মেরামত করা। এ সম্মানজনক আর লাভজনক। কাজেই আমরা স্মরণাতীতকালে নিজেদের লিপ্ত রেখেছি। আমাদের বংশের কেউ ভুলেও বংশগত পেশা ছেড়ে অন্য কোনো পেশায় নিযুক্ত হয়নি।
সম্প্রতি মানুষ রাজনৈতিক কার্যকলাপে যেভাবে মেতে উঠেছে, রাজনীতিকে জীবনের সবচেয়ে অবলম্বন হিসেবে বেছে নিয়ে তাতেই সম্পূর্ণরূপে আত্ম নিয়োগ করেছেন তাতে আমার মতো রটারডম নগরের একজন সৎ মানুষের কাছে আমার এ বংশগত পেশাকে আঁকড়ে থাক ছাড়া অন্য কোনো পেশার প্রতি আগ্রহান্বিত হওয়া উচিত নয়। উপযোগিও অবশ্যই নয়।
আরও খোলসা করে বলছি–আমার পেশায় জমার পরিমাণ ভালো; আর কোনোদিনই কাজের অভাব হয় না। কাজ করতে পারলে, শরীর বরদাস্ত করলে কাজ যতই চাওয়া যাবে অভাব হবে না, অতীতেও কোনো দিন হয়নি।
কিন্তু যে কথা বলতে চাচ্ছিলাম, কথায় কথায় সে প্রসঙ্গ থেকে সরে এসেছি। হ্যাঁ যে কথা বলছিলাম, আমরা ক্রমেই স্বাধীনতা, দীর্ঘ রাজনৈতিক আলোচনা ও ভাষণ, সংস্কারবাদ আর অনুরূপ সবকিছু ফলাফলগুলো সম্বন্ধে জানতে ও বুঝতে শিখে ফেললাম।
