আর এ বিবরণীর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তাদের খবরাখবর নেবার যাবতীয় প্রয়াসই ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল। বহু চেষ্টা চরিত্র করেও তাদের সম্বন্ধে কোনো কথাই জানা সম্ভব হয়নি।
আসল ব্যাপারটা হচ্ছে, বর্তমানে এ নগরের পূর্বদিকে নির্জন-নিরালা এক পরিবেশে অদ্ভুত ধরনের সব জঞ্জালের স্তূপের মধ্যে এমনকিছু হাড়গোড় আবিষ্কৃত হয়েছে, সেগুলোকে মানুষের কঙ্কাল বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ব্যাপারটা বাতাসের। কাঁধে ভর করে সে মানুষের কানে পৌঁছে গেছে।
হাড়গোড় আবিষ্কারের ব্যাপারটা নিয়ে কিছু লোক নানারকম আলোচনা সমালোচনায় মেতে গেল। শেষপর্যন্ত কিছু লোকের ধারণা হলো ওখানে একটা ভয়ঙ্কর রকমের খুন হয়ে গেছে। তারা এ-বিষয়েও নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল যে, ভ্রাউ গ্রেটেল তার শিকার হয়েছে। অতএব ওসব হাড়গোড় তারই।
যাক, প্রসঙ্গটাকে অন্য দিকে আর টেনে না নিয়ে গিয়ে আসল ব্যাপারটায় ফিরে যাওয়া যাক।
ওই সেই বিচিত্র বেলুনটা মাটি থেকে একশো ফুটের মধ্যে নেমে এলো। এবার সেটাকে সবাই খুব ভালোভাবেই দেখতে পেল। ভিড় করে অপেক্ষমান মানুষগুলো এবার কেবলমাত্র বেলুনটাকেই নয়, বেলুনের আরোহীকেও দেখতে পেল। কেবল দেখতে পেল বললে ঠিক বলা হবে না, বরং স্পষ্টভাবেই দেখতে পেল।
সত্যি লোকটা বড়ই অদ্ভুত। আর দেখে তাদের এও মনে হলো তার দৈহিক উচ্চতা খুব বেশি হলেও দুই ফুট। কিন্তু সামান্য উচ্চতায়ই লোকটা হয়তো বা দৈহিক ভারসাম্য হারিয়ে তার ছোট্ট আকাশযানটা থেকে গড়িয়ে পড়ে যেত। তবে তার পড়ে na যাওয়ার কারণ হচ্ছে, বৃত্তাকার একটা বেষ্টনির মধ্যে সে আবদ্ধ থাকার জন্যই দৈহিক ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে আর সেটা বুক সমান উঁচু এবং দড়ি দিয়ে আচ্ছা করে বাঁধা। তাই দুর্ঘটনা ঘটতে পারেনি।
ছোটখাট মানুষটা উচ্চতার তুলনায় তার দেহটা বেশি রকম স্থূল হওয়ায় ধরতে গেলে একটা বলের মতো আকৃতি হয়ে গেছে। তবে তার পা দুটো দেখা যাচ্ছে না বটে, কিন্তু হাত দুটো একেবারেই বিশ্রি এবং অস্বাভাবিক লম্বা। মাথার চুলগুলো সনপাটের মতো ধবধবে সাদা। আর সেগুলো একটা সরু ফিতে দিয়ে শক্ত করে বেঁধে রাখা। আর নাকটা টিয়া পাখির ঠোঁটের মতো অস্বাভাবিক লম্বা ও সামান্য বাঁকানো। এক পলক দেখলেই মনে হয় সেটা উত্তেজকও অত্যুজ্জ্বল এবং তীক্ষ্ণ। আর একটা ব্যাপার আমাকে বড় কম অবাক করেনি। তার মাথায় কান বলে কিছু নেই। কানের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে দুটো একদম মসৃণ। কোনোদিন কানের অস্তিত্ব ছিল বলেও মনে হলো না। বয়সের ভারে তার চিবুক আর গাল দুটো কুঁচকে গেছে। তবে ফোলাফোলা ভাব অবশ্যই আছে আর ভাঁজ পড়াও বটে।
আর তার পোশাক পরিচ্ছদ? গায়ে আকাশ-নীল রঙের সার্টিনের তৈরি ঢিলেঢালা একটা ফ্রক-কোট। আর তার সঙ্গে রং মিলিয়ে একটা ব্রীচেস পরা। রূপার একটা বকলেস দিয়ে হাঁটুর সঙ্গে বেঁধে দেওয়া। আর মাথায় পড়েছে হলুদ রঙের একটা টুপি। একদিকে কাৎ করে মাথায় বসানো। লাল ও লম্বাটে একটা রেশমি রুমাল অদ্ভুতভাবে একটা বো-নেট বেঁধে চমৎকারভাবে বুকের ওপর ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। মা নিয়েছেও চমৎকার।
সমতল থেকে শখানেক ফুট নেমে আসার পর বেঁটেখাট বুড়ো লোকটা যেন হঠাৎ ভয়ে মুষড়ে পড়ল। তার হাবভাব দেখে মনে হলো খুবই ভয় পেয়ে গেছে। আর এও মনে হল, মাটির আর কাছাকাছি আসতে মোটেই আগ্রহী নয়। কেন সে মানুষের তার এমন অনীহা তা-ও বুঝা গেল না।
ভূমির কাছাকাছি আসতে চান না বলেই হয়তো বহু কষ্টে একটা ক্যানভাসের ঝোলা হাতে তুলেনিল। কি সব দিয়ে যেন সেটা ভর্তি। মুহূর্তের মধ্যেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল, ঝোলাটার ভেতরে হাতটা চালান করে দিয়ে ভেতর থেকে মুঠো ভর্তি করে বালি তুলে নিয়ে নিয়ে ছড়িয়ে দিতে লাগল। ব্যস, তারপরই সে একেবারে স্থির হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ নিশ্চল-নিথরভাবে বসে থাকার পর এক সময় সে ঝটপট হাতটাকে ফ্রক কোটের পকেটে চালান করে দিল। সেখান থেকে মরক্কো চামড়া দিয়ে বাঁধানো একটা নোটবই বের করে আনল।
এবার সে নোট বইটাকে হাতের ওপর নিয়ে হাতটাকে বার কয়েক ওপরনিচ করে তার ওজন সম্বন্ধে ধারণা করে নিয়ে সবিস্ময়ে সেটার দিকে তাকিয়ে রইল। বইটার ওজনই তার এরকম বিস্ময়ের কারণ।
কয়েক মুহূর্ত বইটার দিকেনিষ্পলক চোখে বইটার দিকে তাকিয়ে থাকার পর সে সেটা খুলে ভেতর থেকে একটা লম্বা কাগজ বের করে আনল। কাগজ বলতে আসলে সেটা একটা চিঠি।
হাতের চিঠিটা বার দুতিন উলটে পাল্টে দেখে নিয়ে সে সেটাকে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা নগর প্রধান সুপারবাসের দিকে ছুঁড়ে দিল।
চিঠিটা ভাসতে ভাসতে এসে নগর প্রধানের পায়ের কাছে পড়ল।
নগর প্রধান মুহূর্তের জন্য চিঠিটার দিকে তাকিয়ে সেটাকে মাটি থেকে তুলে নেবার জন্য নিচের দিকে ঝুঁকলেন। তার পাশে দাঁড়িয়ে-থাকা কৌতূহলী নগরবাসীরা নীরবে ব্যাপারটা লক্ষ্য করতে লাগল। তারা মুখে কিছু না বললেও তাদের মধ্যে কৌতূহল ও চাঞ্চল্যের অভাব নেই।
বিমানচারীর রটারডাম নগরের কাজ মিটে গেছে। এখানে তার আর কোনো দরকার নেই। কেবলমাত্র চিঠিটা যথাস্থানে পৌঁছে দিয়ে সে আবার ওপরে ওঠার জন্য তৎপর হল।
বিমানটাকে ওপরে তুলতে হলে তাকে সেটা থেকে আরও কয়েকটা বালির থলেকে নিচে ফেলে দিতে হবে। এভাবে বিমানটাকে হালকা করতে পারলে তবেই তো সেটা ধীরে ধীরে উর্ধগামী হবে।
