ব্যাপারটা ক্রমেই সবার মধ্যে যার পরনাই রহস্যের সঞ্চার করল। আর হবে নাই বা কেন? আর এর গঠন প্রকৃতি এমন অবিশ্বাস রকম বিচিত্র যে অগণিত নারী-পুরুষ তার দিকেনিষ্পলক চোখে হাঁ করে দীর্ঘসময় ধরে তাকিয়ে থেকেও ব্যাপারটা সম্বন্ধে সামান্যতম আঁচও করতে পারছে না। আর যদি ব্যাপারটা সম্বন্ধে কোনো ধারণাই করতে না পাওে, তবে তার স্তব স্তুতিই বা কি করে করবে। ফলে কপরেল চামড়ায় বিস্ময়ের ভাজ এঁকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া তাদের কারও তো কিছু নেই।
আসলে ওটা কী? এমন কোন বস্তু যা আকাশের গায়ে মেঘের ফাঁকে ফাঁকে ঘুরে বেড়াচ্ছে? কিভাবেই বা এমন অসম্ভব একটা কাণ্ড সম্ভব হচ্ছে?
খামখেয়ালিভাবে একত্রে জমা-হওয়া রটারডামের মানুষগুলো যত ভূতের নাম তাদের জানা আছে তাদের নাম করে করে তারা জানতে চাইছে, ওটা কীসের ইঙ্গিতবাহী। কেউ কিছু জানে না, বুঝতে পারছে না, এমনকি সামান্যতম অনুমানও করতে পারছে না।
না কেউ-ই না, অন্য কেউ তো সামান্য ব্যাপার এমনকি নগরের কর্তাব্যক্তি মিনহীর সুপারবাস ভন অ্যান্ডারডুক অকস্মাৎ উদ্ভুত এ-রহস্যটা উদ্ঘাটনের সামান্যতম সূত্রও খুঁজে পাচ্ছে না।
পরিস্থিতি সম্পূর্ণ প্রতিকুল বলে কারো পক্ষে কিছু করাও সম্ভব হচ্ছে না। কোনো যুক্তিগ্রাহ্য মন্তব্যও করতে পারছে না। সবাই অসহায় ও অস্থির দৃষ্টি মেলেনিশ্চেষ্টভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
কিছুই করার নেই বুঝেও পথে জড়ো-হওয়া প্রতিটা মানুষ নিজনিজ বাঁশিটাকে আবার মুখে তুলে নিল। দু-ঠোঁটের ফাঁকে রেখে শক্ত করে চেপে ধরল। কিন্তু হঠাৎ যেন তারা কেমন থমকে গেল।
সবার মুখেই বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল। কয়েক পা হাঁটল। আবার থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। আসলে এমন একটা অভাবনীয়, একেবারেই উদ্ভট পরিস্থিতিতে কি যে করণীয়, তা-ই ভেবে উঠতে পারছে না। শেষপর্যন্ত করার মতো কিছু না পেরে সবাই আবার নিজনিজ বাঁশিতে ফুঁ দিল। এতগুলো বাঁশির সমবেত ধ্বনি রীতিমত আলোড়ন সৃষ্টি করল।
এরই মধ্যে আকামেমর বিচরণকারী সেই কৌতূহল-উদ্দীপক নিরেট পদার্থটা নগরের মাথার উপরে আরও অনেক, অনেক নিচে নেমে এসেছে। কখন আর কিভাবে সে ওটা গুটিগুটি এতটা নিচে নেমে এসেছে, কেউ টেরও পায়নি। ধোয়া উদগীরক পদার্থটা সমবেত জনতার মনে আরও অনেক বেশি কৌতূহল সঞ্চার করল।
সবাই তো ঘাড় ঘুরিয়ে চলমান সে বস্তুটার দিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইল। তাদের বিস্ময় উত্তরোত্তর বেড়েই চলল।
মিনিট কয়েকের মধ্যেই অদ্ভুত যে বস্তুটা ক্রমে নিচে নামতে নামতে একেবারেই কাছাকাছি চলে এলো।
এবার ব্যাপারটা নিয়ে এতগুলো মানুষের ধন্ধ প্রায় ঘুচে গেল। হ্যাঁ, এতক্ষণে নিঃসন্দেহ হওয়া গেল, নির্ঘাৎ ওটা বেলুন বা বেলুন জাতীয় কোনো একটা বস্তু।
হ্যাঁ, সেটা বেলুন জাতীয় পদার্থ ঠিকই। কিন্তু সবার মনেই একই প্রশ্ন কই, এরকম কোনো বেলুন তো এর আগে কেউ কোনোদিন রটারডামের আকাশে দেখেনি! ব্যাপারটা নিয়ে জল্পনা কল্পনা করার মতো অবকাশ কারো নেই। একে, অন্যের চোখের দিকে কেবল নীরব চাহনি মেলে তাকাতে লাগল আর সবিস্ময়ে আপন মনে ব্যাপারটা নিয়ে ভেবে চলল।
ওটা বেলুন বা বেলুন জাতীয় পদার্থ বটে। কিন্তু আসলে বস্তুটা কি? আমার মনেও একই প্রশ্ন বার বার জাগতে লাগল। নোংরা খবরের কাগজ দিয়ে তৈরি এমন একটা বিচিত্র বেলুনের কথা কে, কবে আর কোথায়ই বা শুনেছে? অন্য কোনো দেশের মানুষ শুনে থাকলেও হল্যান্ডের মানুষ যে শোনেনি, এ-বিষয়ে তিলমাত্র সন্দেহও নেই।
ইতিপূর্বে কেউ কোনোদিন এমন অদ্ভুত বেলুনের কথা না শুনলেও আজ, এ মুহূর্তে তাদের নাকের ডগায় না হলেও নাক থেকে কিছুটা ওপরে এরকম বিচিত্র একটা বেলুন যে অবস্থান করছে, তা তো আর অস্বীকার করার উপায় নেই।
তবে এও সত্য যে, অত্যন্ত বিশ্বস্ত সূত্রে আমি জানতে পেরেছি, এমন কোনো মশলা ব্যবহার করে ওটাকে তৈরি করা হয়েছে, যা ইতিপূর্বে কোনোদিনই এ ধরনের কোনো কাজে ব্যবহার করা হয়নি।
আর এ-কথাটা বলতে বাধা নেই, রটারডামের অধিবাসীদের শুভবুদ্ধির প্রতি এ একটি মারাত্মক অসম্মানজনক ব্যাপার। আর শূন্যে ভাসমান বস্তুটার যে গঠনপ্রকৃতি, তা তো আরও অনেক বেশি অপবাদের ব্যাপার। কেন? কীসের নিন্দা? আসলে বস্তুটার গঠন প্রকৃতি এমন বিচিত্র ধরনের যে, সেটা দেখতে উলটে দেওয়া একটা গাধার টুপির চেয়ে ভালো কিছু নয়। গাধার টুপির চেয়ে খারাপ দেখতে কিছু থাকলে তা-ও ভাবা যেতে পারে।
আর ইয়া বড় একটা লোমশ টুপিকে বিচিত্র যন্ত্রটার শেষপ্রান্তে নীল রঙের ফিতে দিয়ে অনেকটা মোটর গাড়ির মতো করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর বেশি বিচিত্র, যা ব্যাপার তা হচ্ছে, ওই লোমশ টুপিটার মাথায় অর্ধগোলাকার একটা টুপিকে কালো রঙের ফিতে আর রূপার বকলেস দিয়ে আচ্ছা করে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এমন বিচিত্র আকৃতির কোনো বস্তুর কথা ভাবতেও উৎসাহ পাওয়া যায় না।
তবে এ-কথা স্বীকার না করে পারা যাবে না যে, রটারডাম নগরের অধিবাসীরা শপথ করে বলতে পারে যে, তারা এমন দৃশ্য তো ইতিপূর্বে বহুবারই চাক্ষুষ করেছে। প্রকৃতপক্ষে এখন ব্যাপারটাকে উপস্থিত সবাই অভ্যস্ত দৃষ্টিতেই।
তবে এও সত্য যে ভ্রাট গ্রেটেল কাল শূন্যে ভাসমান বেলুনের মতো বস্তুটাকে। দেখামাত্রই বিস্ময় বিস্ফরিত চোখে তাকিয়ে আনন্দের সঙ্গে চেঁচিয়ে বলে উঠেছিল। তার অন্তরঙ্গ জনটির ঠিক ওরকমই একটা টুপি ছিল। আর এও বলে রাখা দরকার যে, প্রায় বছর পাঁচেক আগে ভ্রাউ গ্রেটেলও তার সঙ্গিসহ রীতিমত আকস্মিকভাবে বেপাত্তা হয়ে গিয়েছিল। আর নিতান্তই বিনা কারণে ঘটেছিল।
