আমার হাতের পাত্রটাতে পানীয় ঢেলে কানায় কানায় ভরে দিয়ে সে নিজে ব্যস্তভরে একের পর এক পাত্র পানীয় গলায় ঢালতে লাগল।
পর মুহূর্তেই একটা ধূপদানের অত্যুজ্জ্বল আলোর দিকে সে নিজের হাতের পানীয় ভর্তি পেয়েলাটাকে তুলে ধরল। তারপর সে আপন মনে বলতে লাগল–আমার জীবনের কাজই তো হচ্ছে স্বপ্ন দেখা, স্বপ্নে মশগুল হয়ে থাকা। তাই তো নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছ, আর তাই আমি নিজের জন্য স্বপ্ন কুঞ্জকে গড়ে তুলেছি।
আর একটা কথা আমার পক্ষে কি ভেশিমের জন্য এর চেয়ে বেশি কিছু গড়ে তোলা সম্ভব হতো? বল, এর চেয়ে বেশি কিছু কি আমি গড়ে তুলতে পারতাম?
তবে এ-কথা তো খুবই সত্য যে, তোমার চারদিকে যে স্থাপত্যনিদর্শন এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে রয়েছে, এসব কী তুমি দেখতে পাচ্ছ?
আমি কিন্তু বলব, এই যে চারদিকে এত অসঙ্গতি, তা কেবলমাত্র কাপুরুষদের চোখেই ধরা পড়ে। আর কয়েক মুহূর্ত আগেও যে চোখ দুটো অত্যুজ্জ্বল ছিল, এখন সে দুটো মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে গেছে।
আমার সর্বাঙ্গ টলতে আরম্ভ করল। নিজেকে সামলে রাখাই আমার পক্ষে দায় হয়ে পড়ল। কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে টলতে টলতে টেবিলটার কাছে এগিয়ে গেলাম। সেটার একেবারে গা-ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়লাম।
ভাঙা-কালো একটা পানপাত্রের ওপর আমার হাত পড়ল। সচকিত হয়ে সোজাভাবে দাঁড়িয়ে পড়লাম। আর একেবারেই হঠাৎ সে ভয়ঙ্কর বাস্তব সত্যের একটা সামগ্রিক ব্যাপারের চেতনা, একটা বিদ্যুতের ঝিলিকের মতো আমার মন-প্রাণকে উদ্ভাসিত করে দিল। আর সে আলোর বন্যায় আমি ভেসে গেলাম।
দ্য আনপ্যারালালড অ্যাডভেঞ্চার অব ওয়ান হ্যান্স ফাল
রটারডাম থেকে সব শেষে যে খবর পাওয়া গেছে তা হচ্ছে ওই নগরটা বর্তমানে দার্শনিক উত্তেজনায় তোলপাড় হচ্ছে। উত্তেজনা রীতিমত তুঙ্গে উঠে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আসলে রটারডাম শহরে সম্প্রতি এমন সব ঘটনা ঘটে চলেছে যা একেবারেই অভাবনীয়, আর নতুনও বটে। ঘটনাগুলোকে ভালোভাবে বিচার করলে বলতেই হয় সেগুলো প্রচলিত চিন্তাধারা ও মতামতের পুরোপুরি বিরোধী। এমন কোনো ব্যাপার স্যাপার সেখানকার মানুষ অন্তর থেকে সমর্থন করা তো দূরের ব্যাপার ভাবতেই উৎসাহ পাচ্ছে না।
আর আমার মতামত যদি জানতে চাওয়া হয় তবে আমি নির্দিধায় বলব, এর আগেই ব্যাপারটা নিয়ে ইউরোপের সর্বত্র তুলকালাম কাণ্ড শুরু হয়ে গেছে। সবাই উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে তাণ্ডবে মেতে উঠেছে। সুস্থ স্বাভাবিক চিন্তাধারা নিয়ে প্রচলিত মতামতের বিরোধী বক্তব্য বিচার বিশ্লেষণ করার মতো মানসিকতা এ পরিস্থিতিতে কারোরই নেই।
আর জ্যোতির্বিদ্যা, সুস্থ চিন্তাধারা, পর্যালোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আর জ্যোতির্বিদ্যার বক্তব্যও মতামতের সাধ্যমত খোঁজ খবর নিয়ে যা শোনা গেছে তা হচ্ছে মাসের…তারিখে (সঠিক মাস ও তারিখ আমার পক্ষে বলা সম্ভব হচ্ছে না) অগণিত জনসমাগম, উদ্দেশ্যটা কি তা জানা নেই (স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি) শান্ত ও সুশৃঙ্খল রটারডাম নগরের এক্সচেঞ্জ এলাকাটিতে ঘটেছিল।
সেদিন খুবই গরম পড়েছিল। এ-ঋতু হিসেবে গরমটাকে অভাবনীয়ই বলতে হয়। কেবলমাত্র অস্বাভাবিক গরমই নয়, বাতাসের লেশমাত্রও ছিল না। কেমন যেন একটা থমথমে ভাব। তবে আকাশের গায়ে মেঘ গাঢ় থেকে গঢ়তর হচ্ছে। মনে হলো কিছুক্ষণের মধ্যে বৃষ্টি নামলে নামতেও পারে।
হ্যাঁ, যা ভেবেছিলাম, কার্যত হলও তা-ই। জমাট-বাঁধা মেঘ থেকে পুষ্পবৃষ্টির মতো ছিটেফোঁটা বৃষ্টি শুরু হল। ব্যাপারটা এমন দাঁড়াল ভ্যাপসা গরম থেকেনিস্কৃতি দেবার জন্য প্রকৃতিদেবী এমন তৎপর হয়েছে।
তা সত্ত্বেও দুপুরের দিকে সেই সমবেত জনতার মধ্যে একটু আধটু অস্থিরতা ও উত্তেজনা দেখা দিল। হাজার দশেক মানুষের কণ্ঠস্বর আকাশ বাতাস মথিত করতে লাগল। তারপরই দশ হাজার মানুষ আকাশের দিকে মুখ তুলল। পরমুহূর্তেই দশ হাজার বাঁশি যেন একই সঙ্গে বেজে উঠল।
এতগুলো মানুষের সমবেত কণ্ঠস্বর যে ধ্বনি তুলল, তার সঙ্গে একমাত্র নায়াগ্রা জলপ্রপাতের অবর্ণনীয় গর্জনেরই তুলনা চলতে পারে। গগনভেদি চিৎকার চাচামেচি যেন পুরো শহরটাকে তোলপাড় করতে লাগল। সে যে কী হৈ হট্টগোল, তা ভাষার মাধ্যমে কারো মধ্যে ধারণার সঞ্চার করা সম্ভব নয়। আর সে চিৎকার চাচামেচি রটারডাম নগরের চারদিকের বাড়িগুলোতে বাধা পেয়ে বার বার প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এসে রীতিমত এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটল। সব মিলে পরিবেশটা যেন সম্পূর্ণরূপে অভাবনীয় হয়ে উঠল।
এমন হৈ-হট্টগোলের উৎস কোথায়–কোত্থেকে আসছে তা অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যপারটা সবার কাছে পানির মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। ব্যাপারটা কারো কাছেই অজানা রইল না। যে জমাটবাঁধা মেঘের কথা একটু আগেই উল্লেখ করলাম তারই একটা টুকরোর পিছনেনিরেট একটা পদার্থ হঠাৎ লক্ষ্য করলাম। সত্যিকারেরই অদ্ভুত সে পদার্থ।
আমি বিস্ময়-মাখানো দৃষ্টিতে বিচিত্র ধরনের যে নিরেট পদার্থটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। চোখের পলক ফেলতেও ভরসা পাচ্ছি না, যদি মুহূর্তের মধ্যে দৃষ্টির বাইরে চলে যায়।
আপাতদৃষ্টিতে দেখা অদ্ভুত সেনিরেট পদার্থটা অচিরেই অধিকতর স্বচ্ছ হয়ে উঠল। সত্যি কথা বলতে কি, এমন কোনো পদার্থকে এর আগে কেউ-ই আকাশে বিচরণ করতে দেখেনি।
