তার হাত দুটোর পরিস্থিতি? ডান হাতটা ভাঁজ করে বুকের ওপর রাখা আছে। আর অদ্ভুত আকৃতিবিশিষ্ট পাত্রের দিকে ডান হাতটাকে বাড়িয়ে দিয়েছে।
আর পরীর মতো ছোট্ট যে পা-টাকে দেখা যাচ্ছে, সেটাকে নিচে নামিয়ে দিয়ে কোনোরকমে মাটি স্পর্শ করেছে। আর তার ডানা দুটো? ঝলমলে আলোয় আলোকিত পশ্চাৎপটে দেখা যায় কি যায় না, এমন ভঙ্গিমায় তার সুদৃশ্য ডানা দুটো আলতোভাবে উড়ছে। বাঃ! কী মনোরম দৃশ্য!
আমার দৃষ্টি এবার প্রতিকৃতিটার ওপর থেকে সরে এসে পাশে অবস্থানরত নতুন বন্ধুর ওপর গিয়ে পড়ল।
সে কিছু বলার আগেই, নিজে থেকেই আমার ঠোঁট দুটো বার বার নড়ে উঠল, উচ্চারিত হলো চাপম্যান-এর লেখা বুসিডি এর বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটা কথা–
ওই–ওই তো সে উঠে দাঁড়িয়েছে। সে রোমক মূর্তির মতো খাড়াভাবে দাঁড়িয়েছে। মৃত্যু যতদিন তাকে শ্বেতপাথরে পরিণত না করে দেয়, ততদিন সে দাঁড়িয়ে থাকবে। দাঁড়িয়েই থাকবে।
আমার কথা শেষ হলে বন্ধুবর গুটিগুটি এগিয়ে গেল রূপার কাজ করা একটা টেবিলের দিকে। সেটা ঘরের ঠিক কেন্দ্রস্থলে না হলেও ভজন থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখে? আমি কিন্তু বলব, স্থান এবং কালে ভয়ই তাকে এমনটা করতে বাধ্য করে। আমি নিজেরই অতীতে একসময় বড়ই শিল্পপ্রীতি ছিলাম। তবে এও সত্য যে, সেটা আমার পক্ষে চরম বোকামি ছিল। আর তা-ই আমার মন-প্রাণকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। এও স্বীকার না করে উপায় নেই যে, বর্তমানে এসবই আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করছে।
আজ আমার আত্মা এসব আরবীয় ধূপধানের মতোই অগ্নিজ্বালায় দাউ দাউ করে জ্বলছে তো জ্বলছেই। আর সে দৃশ্যের যথার্থ স্বপ্নের মুল্লুকের চিত্র দর্শনের উপযোগি করে তৈরি করে তুলেছে, বর্তমানে আমি যার দিকে দ্রুত ধেয়ে চলেছি।
কথা বলতে বলতে আমার বন্ধুবর অকস্মাৎ থমকে গেল। কথা বলা বন্ধ করে মুখে একেবারে কলুপ এঁটে দিল। তার মাথাটা সামনের দিকে ঝুঁকতে ঝুঁকতে অচিরেই একেবারে বুকের ওপর ঝুঁকে পড়ল।
আমি তার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলাম। উৎকণ্ঠার সঙ্গে তার প্রতিটা মুহূর্তের দিকে নজর রেখে চললাম।
আমার মনে হল, আমার নতুন এ বন্ধুবরের কানে এমন একটা শব্দ আছে, সে দিকে তার শ্রুতি আকৃষ্ট হচ্ছে তা আমি শুনতে পাচ্ছি না।
শেষমেশ সে ঝট্ করে সোজাভাবে দাঁড়িয়ে পড়ল। ব্যস্তভাবে ওপরের দিকে মুখ তুলে তাকাল। তারপর ছিলচেস্টারের বিশপের লেখা কবিতার দুটো পংক্তি আবৃত্তি করল
ওখানেই, আমার অপেক্ষায় ওখানেই থাক। ওই উন্মুক্ত প্রান্তরেই আমি তোমার সঙ্গে মিলিত হবই হব।
না, আর দাঁড়িয়ে থাকার মতো শক্তি সামর্থ্য তার রইল না। মদের মাদকতা শিক্ত তার কায়িক শক্তিকে গ্লাস করে ফেলল। হলো সে অটোমানের ওপর টানটান হয়ে শুয়ে পড়ল। পর মুহূর্তেই সিঁড়ি থেকে দ্রুত পায়ে চলার শব্দ ভেসে এলো। বার বার দরজায় গায়ে আঘাত পড়তে লাগল।
আমি উৎকর্ণ হয়ে শব্দটা শুনলাম। তারপরই আমার মনে দ্বিতীয় গোলযোগের আকাঙ্খ উঁকি দিয়ে উঠল। ঠিক তখনই মেনতানির বাড়ির পরিচারকটা উৰ্ধশ্বাসে ছুটতে লাগল। তার সর্বাঙ্গ থর থর করে কাঁপছে। সে আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে কেটে কেটে কোনোরকমে কয়েকটা টুকরো টুকরো অসংলগ্ন কথা উচ্চারণ করল–আমার মনিবাণি! আমার মনিবাণি! বিষ! বিষ! হায়! হায় রূপসি এফ্রোদিতে! রূপসি এফ্রোদিতে!
আমি বুকভরা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে ছুটতে ছুটতে অটোমানটার কাছে হাজির হলাম। ঘুমন্ত বন্ধুবরকে অত্যাশ্চর্য, রীতিমত অবিশ্বাস্য খবরটা শোনাবার জন্য জাগাতে চেষ্টা করলাম।
আমি যেন একেবারে আকাশ থেকে পড়লাম। যারপরনাই স্তম্ভিত হয়ে পড়লাম। তার হাত-পা কাঠের মতো শক্ত হয়ে গেছে। ঠোঁট দুটোর রক্ত কেন্দ্রস্থলে প্রায় কাছাকাছি রক্ষিত ছিল।
টেবিলের ওপর কয়েকটা সুন্দর, মনোলোভা কারুকার্যমণ্ডিত পানপাত্র রক্ষিত ছিল। আর পানপাত্র দুটোর কাছাকাছি বড় বড় দুটো ইউট্রাস্কন পাত্র সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। একটা ব্যাপার আমার নজর এড়ালো না, প্রতিকৃতিটার সামনের দিককার মতোই টেবিলটাকে অনন্য কারুকার্যে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। অনুসন্ধিৎসু নজরে তাকিয়ে থাকার পর আমার মনে হলো, তাতে মোহানিস বার্জারই ভরে রাখা ছিল।
আমি যখন শিল্পকর্ম নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছি তখন সে হঠাৎই বলে উঠল–বন্ধু, অনেকক্ষণ ধরে আমরা শুধু কথাই বলে চলেছি, তাই না?
তাতে কি আছে, ভালোই তো লাগছে।
না, এখন আর কোনো আলোচনা নয়। চল, আগে একটু পান করে চাঙ্গা হয়ে নেবে। এখন সকাল, একেবারেই সকাল, তবু চল দু-এক পেয়ালা পান করা যাক। দেখবে, তাতে শরীর ও মন চাঙ্গা হয়ে উঠবে।
সূর্যোদয়ের প্রথম ঘণ্টাটা দেবদূতের হাতুড়ির আঘাতে প্রথম ঘণ্টাটা মনোলোভা ও শ্রুতিমধুর সুরে বেজে উঠল। সে ঘণ্টাধ্বনি ঘরময় বার বার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
ঘণ্টাধ্বনিটা যেন বলতে লাগল–সত্যি এখন খুবই সকাল। তা হোক গে। এসো। আমরা গানে গানে মন-প্রাণ ভরিয়ে তুলি। আমরা পান করি, আকণ্ঠ পান করে শরীর ও মনকে চাঙ্গা করে তুলি।
বাতি আর ধূপদানিগুলো দূরের ওই অতি উজ্জ্বল অতিকায় সূর্যটাকে পরাজিত করার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। এসো তার সম্মান রক্ষার্থে আমরা পানীয় দিয়ে পানপাত্র দুটোকে ভরে নিই।
