দীর্ঘসময় ধরে গবেষণা চালাবার পর সেটা যে এ বন্ধুরই হাতের লেখা, বহু কষ্টে তা বুঝতে পারলাম।
সে পাতায় যা লেখা ছিল তা মোটামুটি এরকম–
ওগো আমার প্রেম-ভালোবাসা, তুমিই আমার সর্বস্ব ছিলে। আমার মন সর্বদাই তোমার জন্য কেঁদে আকুল হতো।
সাগরের মাঝে সবুজ একটা দ্বীপ। প্রেম-ভালোবাসা একটা ঝর্ণাধারা, পূজোর একটা বেদী পরীদের দেশের ফুলে-ফুলে সজ্জিত–সে সব ফুল-ফল আমারই জন্য। ওগো আমার প্রেম-ভালোবাসা সব, সবকিছুই তোমার আমার জন্য।
কিন্তু হায়! সে শান্তি-মুখের স্বপ্ন যে বড়ই ক্ষণস্থায়ী। হায়রে আমার নক্ষত্রোজ্জ্বল আশা-আকাঙ্ক্ষা, তোমার উদয় কেন হলো? মেঘের আড়ালে আত্মগোপন করার জন্যই যে তোমার প্রকাশ হলো! তুমি বড়ই ক্ষণস্থায়ী; এই আছ, এই নেই! হায়!
কার তীব্র কণ্ঠস্বর যেন ভবিষ্যতের ওপাড় থেকে বাতাসবাহিত হয়ে কাছে এসে বাজছে। কে যেন গলাছেড়ে বলছে–অগ্রসর হও, এগিয়ে যাও।
কিন্তু আমার অন্তরাত্মা যে হন্যে হয়ে ঘুরে ঘুরে মরে অতীতের বুকে, ব্যবধান বড়ই অস্পষ্ট; নির্বাক, নিশ্চল আর অভিভূত! কারণ, হায়! হায়! আমার কাছে, আমার সামনের পৃথিবীর আলো যে নিপ্রভ–না, নিষ্প্রভ নয়, এ একেবাওে নিভেই গেছে।
সৈকত ভূমির বালির রাশিতে যে বাণী গভীর সমুদ্রকে বাধা দেয়, আটকে রাখে, তা হচ্ছে–আর নয়! আর নয়। কিছুতেই আর নয়।
হায়! বজ্রপাতে পুড়ে-যাওয়া গাছের শাখায় শাখায় আর কোনোদিন কুঁড়ি দেখা দেবে না, ফুল ফুটবে না এবং আহত ঈগলও আর কোনোদিন আকাশে ডানা মেলবে না। সময় আজ আমার কাছে মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, আমার রাতের যত স্বপ্ন সবকিছু কাকে কেন্দ্র করে? সবই তো ওই কালো, মায়া-কাজল পরানো চোখ দুটোকে কেন্দ্র করে।
আর যেখানে তোমার পদচারণে ধ্বনি উত্থিত হয়, মনোলোভা শব্দ উত্থিত হয় সেখানেই অপার্থিব নাচ শুরু হয়ে যায়। হায়! এ কী অদ্ভুত কাণ্ড! আর সে অদ্ভুত অপার্থিব নাচ ইতালির নদীর তীরে তীরে শুরু হয়ে যায়। হায়! এ কী কাণ্ড!
ঘায়! অভিশপ্ত মুহূর্তে তারা তোমাকে সমুদ্রের ঢেউয়ের ধাক্কায় ধাক্কায় একটা অপবিত্র উপাধানে প্রেম-ভালোবাসা থেকে তোমাকে বয়ে নিয়ে চলে গেল।
তারা তোমাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল আমার কুয়াশাচ্ছন্ন রাজ্য থেকে, আমার বুক থেকে। কোথায়? কোথায় নিয়ে গেল? উলুখাগড়ার রূপালি বন যেখানে প্রতিনিয়ত কেঁদে মরে!
উপরোক্ত পংক্তিগুলো যেহেতু ইংরেজি ভাষায় লিখিত ছিল তাই আমি নিঃসন্দেহ ছিলাম না যে, তাদের লেখকের ওই বিশেষ ভাষাটা রপ্ত ছিল। আমি কিন্তু তাতে তিলমাত্রও অবাক হইনি। সত্যি কথা বলতে কি, আমার তো ভালোই জানা ছিল যে, অনেক কিছুই তার জানা আছে, অনেক কিছুই রপ্ত আছে। আর তার জানা বিষয়গুলোকে দশজনের কাছে গোপন রাখতেও সে খুব মজা পেত, খুবই সত্য কথা।
তবে লেখাটার উল্লিখিত তারিখ আর সে সঙ্গে জায়গার নামটা পড়ার পর আমার মধ্যে অন্তহীন বিস্ময়ের উদ্রেক ঘটল।
লেখাটার সবার ওপরে লন্ডন কথাটা লেখা হয়েছিল। তারপর সেটাকে কেটে দেওয়া হয়েছে। আর এমনভাবে কাটা হয়েছে যাতে অনুসন্ধানি নজরে দেখলে কথাটা বোঝা যায়।
এই মাত্রই তো বললাম জায়গাটার নামটা পড়ার পর আমার মধ্যে অন্তহীন বিস্ময়ের উদ্রেক করল। আমার খুব ভালোই স্মরণ আছে যে, এর কারণ সম্বন্ধে আগের কোনো এক কথা প্রসঙ্গে আমি নতুন এ-বন্ধুবরকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তবে। জিজ্ঞাসা করেছিলাম, অতীতে কোনো সময়ে লন্ডন শহরের বাসিন্দা মার্চে ডি মেনতানির সঙ্গে কি তার দেখা হয়েছিল? কারণ বিয়ের আগে সে মহিলাটি বেশ কয়েক বছর সে শহরে কাটিয়েছিল।
আমার প্রশ্নের উত্তরে সে যা বলেছিল, তা যদি আমি নিতান্ত ভুল বুঝে না থাকি তবে–সে আমাকে বলেছিল, সে কোনোদিনই গ্রেট ব্রিটেনের সে রাজধানী শহরটায় পা দেয়নি।
প্রসঙ্গ ক্রমে সে আমাকে এও অবশ্যই বলা দরকার, আমি একবার নয়, বহুবারই শুনেছি যে, আমার এ নতুন বন্ধুবর কেবলমাত্র যে জন্মসূত্রে তা-ই নয়, শিক্ষাদীক্ষার ব্যাপারেও একজন নির্ভেজাল ইংরেজ।
আমার হাতে যে কবি পলিটিয়ানের ট্র্যাজিডি দ্য অরফিও-টা রয়েছে সেটার দিকে নজর না দিয়েই আমার বন্ধুবর বলল–আরও একটা ছবি আছে যেটা তোমাকে দেখানো হয়নি।
আমি মুচকি হেসে বললাম–না দেখালে আমি কী করে দেখব? আমার কথা শেষ হতে না হতেই সে হাত বাড়িয়ে একটা পর্দা সরিয়ে দিল।
আমার চোখের সামনে থেকে পর্দাটা সরে যেতেই একটা ছবির দিকে আমার দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো।
সে অঙ্গুলি-নির্দেশ করে বলল–এটা মার্চেসা এফ্লোদিত-এর প্রতিকৃতি।
আমি অপলক চোখে, মার্চেসা এফ্লোদিত-এর পূর্ণাবয়ব প্রতিকৃতিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। ছবিটার যে বিশেষত্বটুকু আমার চোখে ধরা পড়ল, তাতেই আমার পক্ষে ছবিটা থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া দায় হয়ে পড়েছে।
বাস্তবিকই ছবিটা প্রতিকৃতির দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকার মতোই বটে। আর এও স্বীকার করতেই হবে, কোনো মানুষের শিল্প-দক্ষতা সে নারীর অতিমানবিক সৌন্দর্যকে এর চেয়ে নিখুঁত করে আঁকতে পারত না, অবশ্যই না।
ডিউকের প্রাসাদের দরজায় গত রাতে সে অপার্থিব মূর্তিটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম, আর একবার সে-ই আমার সামনে এসে দাঁড়াল। তার মুখে হাসির ঝিলিক বিরাজ করলেও তারই মধ্যে আত্মগোপন করে রয়েছে রীতিমত দুর্বোধ্য অসঙ্গতি, সে বিষণ্ণতার অস্পষ্ট ছাপটা যা চিরদিনই পূর্ণ সৌন্দর্যের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে সম্পর্কযুক্ত।
