আমি কিছু সময় তার মুখের দিকে তাকিয়ে স্থবিরের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। আসলে কী ভাবে যে তার বক্তব্যের স্বীকৃতি দেব, হঠাৎ করে ভেবে পেলাম না। পর মুহূর্তেই তার বক্তব্যের স্বীকৃতিস্বরূপ মাথাটা সামান্য নত করলাম।
বুঝতে পারলাম শয্যা ছেড়ে নামার চেষ্টা করছে। আমি ব্যস্ত-পায়ে এগিয়ে তার খাটের গা-ঘেঁষে দাঁড়ালাম। আমার কাঁধে ভর দিয়ে সে খাট থেকে নেমে এলো।
তারপর আমার কাঁধে হাত রেখে ঘরে পায়চারি করতে লাগল।
ঘরে ঘুরতে ঘুরতে সে আমাকে লক্ষ্য করে কয়েকটা ছবির দিকে পর পর অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলল–বন্ধু, এই যে ছবিগুলো দেখতে পাচ্ছ, সবই গ্রীক আমল থেকে শুরু করে সিমাবু কাল পর্যন্ত, আর সিমাবু আমল থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত পর পর টাঙানো হয়েছে।
তাই বুঝি?
অবশ্যই। আর একটু ভালোভাবে লক্ষ্য করলে তুমি নিজেই বুঝতে পারবে ভাসুই মতবাদের পরোয়া না করে এগুলোর মধ্যে বহু ছবিকেই বাছা হয়েছে।
হুম্।
আর একটা কথা, সব ছবিই কিন্তু এ ঘরের পক্ষে খুবই মানানসই নির্বাচন। বুঝেছ বন্ধু? এ ছবিগুলো কার বা কার আঁকা, তোমার জানতে ইচ্ছে করছে না?
আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকালাম।
সে-ই আবার বলতে আরম্ভ করল–অজ্ঞাতনামা কৃতীশিল্পীদের মহৎ চিত্রশিল্প বলে অবশ্যই মনে করা যেতে পারে।
এবার দেওয়ালের এক পাশে টাঙানো কয়েকটা ছবির দিকে অঙ্গুলি-নির্দেশ করে সে বলল–এই যে অসমাপ্ত শিল্পকর্মগুলো দেখছ, এদের চিত্রশিল্পীরা তাদের আমলে খুবই খ্যাতিমান হলেও আজকের দিনের শিল্পবোদ্ধারা তাদের নীরবতার ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন, আর আমার কাছে।
কথা বলতে বলতে সে অকাস্মাৎ তমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। ঘাড় ঘুরিয়ে আমার মুখের দিকে তাকাল। তারপর বলল–একটা কথা, জিজ্ঞেস করতে পারি কী বন্ধু?
কী? কী কথা? তুমি নির্দিধায়–
আমাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই সে বলল–কথাটা হচ্ছে, ম্যাডোনা দেলা পিয়েতা সম্বন্ধে তোমার কী ধারণা, বল তো?
আমি অপরূপ রূপসমৃদ্ধ ছবিটার দিকেই সৃষ্টি নিবদ্ধ রাখলাম। তার কথায় যেন হঠাৎই সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বলে উঠলাম–এটা যে গিদোর নিজেরই মূর্তি। আমি সোৎসাহে কথাটা ছুঁড়ে দিলাম।
হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ।
কিন্তু এটা তুমি, কোত্থেকে, কীভাবে সংগ্রহ করেছ?
গৃহকর্তা নীরবে ম্লান হাসল। আমি বলে চললাম–ভাস্কর্য শিল্পের ক্ষেত্রে ভেনাসের যে স্থান মর্যাদা, চিত্রশিল্পের ক্ষেত্রে সে-ও সে স্থানলাভের যোগ্য বলেই স্বীকৃত।
সে কপালের চামড়ায় চিন্তার ভাঁজ ফুটিয়ে তুলে বলল–হ্যা! ভেনাস, রূপসি ভেনাস? মেদিসির ভেনাস? ছোট মাথা আর মাথাভর্তি সোনালি চুল?
তাঁর আবেগ-উচ্ছ্বাসটুকু আমার নজর এড়াল না।
সে আগের মতো আবেগের সঙ্গে বলতে লাগল–তার বাঁ হাতের অংশবিশেষ। আর ডান হাতের পুরোটাই পুনঃস্থাপন। এবার গলা নামিয়ে অধিকতর গলা নামিয়ে বলল–বন্ধু, আমার কিন্তু মনে হয়, সে ডান হাতের ভঙ্গটুকুতেই স্নেহধারা বর্ষিত হচ্ছে। এই এপোলোর ছবিটা যে কপি-করা এতে কিছুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। আর আমি নিজে? আমি এমনই বোকা অন্ধ যে এপোলোর স্পর্ধিত প্রেরণাটাও বুঝে উঠতে পারিনি। তুমি আমার প্রতি করুণা প্রদর্শন করতে পার সত্য, কিন্তু আন্তিনুসকে বেছে নেওয়া ছাড়া গত্যন্তরও তো কিছু নেই। সক্রেটিস কী বলেছিলেন, জানো?
আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে তার মুখের দিকে তাকালাম।
সে আমার জিজ্ঞাসা নিরসন করতে গিয়ে বলল–ভাস্কর্যশিল্পী একখণ্ড শ্বেত পাথরের মধ্যেই তার মূর্তিটাকে পেয়েছিলেন, সক্রেটিসই তো এ-কথা বলেছিলেন, তাই না?
সে যা-ই হোক, গৃহকর্তা এরকম সব ছোটখাট ব্যাপার প্রসঙ্গে যেভাবে আবেগ উচ্ছ্বাসের সঙ্গে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছিল, তার ভেতর দিয়েই ত্রাসের আভাস আমার চোখে ধরা পড়েছে, আর কথা এবং কাজের মধ্যে কিছুটা স্নাছুবিক দাওয়াইয়ের প্রলেপ–এমন একটা উত্তেজনার প্রকাশ, যা সর্বদাই আমার মন-প্রাণকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছে। আবার অনর্গল কথা বলতে বলতে মাঝে-মধ্যে বক্তব্যের গোড়ার দিকটা ভুলে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেছে। তারপর গভীর মনোযোগের সঙ্গে উৎকর্ণ হয়ে থাকে কেন? এমনও হতে পারে কোনো অতিথির আগমনের প্রতীক্ষায়, নতুবা কোনো কাল্পনিক শব্দ শোনার প্রত্যাশায়ই তার এমন থমকে যাওয়ার কারণ।
কিছুক্ষণের জন্য বিরতির ফাঁকে আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম। আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ। হলো অটোমানের ওপর রক্ষিত একটা বইয়ের ওপর। বইটা পণ্ডিত-কবি পলিটিয়ানের লেখা অতি সুন্দর ট্রাজেডি দ্য আরফিও।
বইটা হতে নিয়ে পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে শেষের দিকে পেন্সিলে দাগ দেওয়া একটা অংশের দিকে আমার নজর পড়ল। তৃতীয় অঙ্কের শেষের দিকের একটা অংশ–মর্মভেদী উত্তেজনাপূর্ণ অংশ। এমন একটা অংশ যা পড়লেই যে কোনো পুরুষের মধ্যেই আবেগ-উচ্ছ্বাস মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। আর নারীরা? যে কোনো নারীর বুক নিঙড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসবে, সন্দেহ নেই। সত্যি কথা বলতে কি, পুরো পাতাটাই চোখের জলে ভিজানো।
তার সে পাতাটারই বিপরীত দিকের পাতায় আমি কি দেখতে পেলাম? সে পাতার নিচের ইংরেজি পংক্তিগুলো এমন এক হাতের লেখায় লিখিত, যার সঙ্গে আমার সদ্য পরিচিত এ বন্ধুটার হাতের লেখার কোনো সাদৃশ্যই খুঁজে পেলাম না।
