অদ্ভুত কারুকার্যমণ্ডিত ধুনচি থেকে বাতাসবাহিত পরস্পর বিরোধী ধূপের গন্ধ নির্গত হয়ে নাকে এসে পৌঁছাচ্ছে। হরেক রঙের অগণিত আলোকরশ্মির দশ ইন্দ্রিয়কে বিভ্রান্ত ও বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে।
ঘরের বিভিন্ন আকৃতি ও রঙ বিশিষ্ট দ্রব্য সামগ্রির ওপর ভোরের রক্তিম ও তাজা আলোকচ্ছটা পতিত হচ্ছে। আর সে আলোকচ্ছটা গলিত চিলি সোনার বহু মূল্য কার্পেটের গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যেন হাজারো শিখায় ঝিল্লা দিচ্ছে। আর সে আলোকচ্ছটায় ঘরের সবকিছু যেন উদ্ভাসিত হয়ে পড়ছে। সে যে কী অপরূপ শোভা তা ভাষার মাধ্যমে কারো মধ্যে সম্যক ধারণা দান করা সম্ভব নয়।
আমি ঘরের দরজায় দাঁড়িয়েই ভেতরের সবকিছুর ওপর কৌতূহলী চোখের মণি দুটো বুলাতে লাগলাম। অন্য কোনো দিকে আমার খেয়ালমাত্রও নেই। এমন সময় গৃহকর্তা আচমকা যেন অট্টহাসিতে ফেটে পড়ার জোগাড় হলো। হাসতে হাসতে তার যেন দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল।
পর মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে, হাসি থামিয়ে গৃহকর্তা অঙ্গুলি-নির্দেশ করে একটা চেয়ারে আমাকে বসতে অনুরোধ করলেন। তারপরই একটা অটোম্যানের ওপর। টানটান হয়ে শুয়ে পড়ল।
আমার ভ্যাবাচ্যাকা-খাওয়া ভাবটা দেখে সে বলল–আমার ঘরটা যে তোমার মধ্যে বিস্ময়ের সঞ্চার করেছে তা আমার বুঝতে বাকি নেই, বন্ধু। কথা বলতে বলতে সামনের মূর্তিগুলোর দিকে অঙ্গুরিনিদের্শ করে বলল–এই যে পাথরের মূর্তিগুলো দেখছ–ঔসব ছবি, আর ভাস্কর্য শিল্প নিদর্শন এবং পর্দাগুলোর ব্যাপারে আমার নিজস্ব রুচি এবং ধ্যান-ধারণা তোমার মধ্যে বিস্ময়ের উদ্রেক করেছে। আমার প্রাসাদ ও অন্যান্য জাকজমক তোমার মনপ্রাণকে একেবারে কাণায় কাণায় ভরিয়ে দিয়েছে, তাই না? কিন্তু সুপ্রিয় আমাকে কিন্তু মার্জনা করতে হবে।
আমি আচম্বিতে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে তার মুখের দিকে তাকালাম। মনে মনে ভাবলাম, ক্ষমা? কেন ক্ষমা? ক্ষমার প্রশ্ন উঠছে কেন?
আমাকে মুখ খোলার সুযোগ না দিয়ে গৃহকর্তাই আমার মুশকিল আসান করতে গিয়ে বলল–কী ভাবছ বন্ধু? কেন ক্ষমা, তাই ভাবছ তো? আমাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই সে বলল–আমার উদাত্ত হাসির কথা বলতে চাইছি। আমার উদাত্ত হাসিকে মার্জনা করতেই হবে।
আমার চোখ-মুখের বিস্ময়ের ছাপটুকু গৃহকর্তার নজর এড়াল না। আমার মুখের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে সে এবার বলল–কী ব্যাপার, বল তো বন্ধু, তোমার মুখের বিস্ময়ের ছাপটুকু যে কিছুতেই মিলছে না। তোমার অবস্থা যে একেবারেই কাহিল হয়ে পড়েছে দেখছি!
আমি ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে তার দিকে নীরব চোখ মেলে তাকিয়ে রইলাম। সে তার বক্তব্য অব্যাহত রাখল–হ্যাঁ যে কথা বলতে চাচ্ছিলাম, এমনকিছু কিছু জিনিসের অস্তিত্ব লক্ষিত হয় যা পুরোদস্তুর হাস্যকর। আর তাতে মানুষের হাসতে হাসতে পেটে খিল লেগে যাবার জোগাড় হবে, নয়ত মরেই যাবে।
মরে যাবে! হাসতে হাসতে মরে যাবে!
হা বন্ধু, হ্যাঁ। হাসতে হাসতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া, এর চেয়ে গৌরবের কিছু আছে, নাকি থাকতে পারে, তুমিই বল? স্যার টমাস মোরের নাম নিশ্চয়ই তোমার শোনা আছে, কী বল?
আমি মুখ তুলে তাকালাম।
কিন্তু আমাকে হ্যাঁ বা না উত্তর দেবার আগেই গৃহকর্তাই আবার বলতে শুরু করল–স্যার টমাস মোর, বড় ভালো মানুষ ছিলেন তিনি। স্যার টমাস মোর হাসতে হাসতেই পরলোকে পাড়ি জমিয়েছিলেন। আহা! বড় ভালো লোক ছিলেন!
মুহূর্তের জন্য থেমে গৃহকর্তা আবার মুখ খুলল–ভালো কথা, তুমি কি জান বন্ধু, স্পার্টাতে এক সময় হাজার দেব-দেবীর মন্দির আর পবিত্র বেদী ছিল।
আমি ঘাড় কাৎ করে নীরবে তার প্রশ্নের উত্তর দিলাম। সে পূর্ব প্রসঙ্গের জের টেনে বলে চলল হাজারো দেবদেবীর মন্দির! কিন্তু কী অত্যাশ্চর্য, একেবারেই অবিশ্বাস্য ব্যাপার, কি জানি?
আমি কি জবার দেব ভেবে না পেয়ে তার মুখের দিকে নীরবে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম।
সে বলে চলল–অত্যাশ্চর্য ব্যাপারটা হচ্ছে। স্পার্টার অন্য সব দেব-দেবীর মন্দির ধ্বংস মানে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেলেও হাসির দেবতার মন্দিরটা কিন্তু শেষপর্যন্ত অক্ষত রয়ে গেল। আজও সেটা বহাল তবিয়তে সদম্ভে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
এবার চাপা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে গৃহকর্তা বললেন–কিন্তু হায়! বন্ধু, তুমি আমার বাড়িতেনিমন্ত্রিত অতিথি, সম্মানীয় ব্যক্তি। যাকগে, সে সব পুরনো কাসুন্দি আর না-ই বা ঘাঁটলাম। যে কথা বলতে চাইছি, তোমাকে নিয়ে যে একটু-আধটু আমোদ ফুর্তি করব তারও উপায় নেই। উপায় নেই বলতে, আসার অধিকারই নেই। অতএব তোমার অবাক হবার ব্যাপারটা তো আর অমূলক নয়। তবে একটা কথা, রাজার ঘরের মতো সাজানো আমার ঐ ঘরটার মতো আর একটা ঘর তৈরি করা ও সুসজ্জিত করে তোলা ইউরোপের কারো সাধ থাকলেও সাধ্যে কুলোবে না। তবে এও সত্য যে, আমার প্রাসাদের অন্য ঘরগুলো কিন্তু ঠিক এর সমান মানের নয়, উকট ফ্যাশান যাকে বলে। ফ্যাশানের চেয়ে সেটাই তো ভালো, তোমার কী মতো বন্ধু? কিন্তু এটাই আজ সবার উম্মার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে যা-ই হোক, এ ব্যাপারে আমি একটু বেশি রকমের কঠোরতা পালন করি। যে কেউ হুটহাট করে আমার প্রাসাদে প্রবেশাধিকার পায় না। আমি মাত্র দুজনকে এখানে প্রবেশ করতে দিয়েছি–একজন আমার খানসামা আর দ্বিতীয়জন হচ্ছ, বন্ধু তুমি।
