সবকিছু মিলিয়ে এমন একটা দর্শনীয় দেহসৌষ্ঠব চোখের সামনে ধরা দেয় যার তুলনা চলতে পারে একমাত্র সম্রাট কমোভাস-এর শ্বেতপাথরের মূর্তির সঙ্গেই। সত্যি কথা বলতে কি, সম্রাট কমোভাস-এর মূর্তি ছাড়া তার মতো দেহসৌষ্ঠব অন্য কোথাও, অন্য কারো মধ্যেই আমি অন্তত দেখিনি।
আর স্পষ্ট করে বললে আগন্তুক যুবকের মুখে এমন কোনো বৈশিষ্ট্য লক্ষিত হয়, এমন কোনো স্থায়ী প্রকাশভঙ্গিও নেই যা স্মৃতির পাতায় আঁকা হয়ে যেতে পারে, দীর্ঘসময় মনে থাকে। অর্থাৎ তার মুখটা এমনই একটা মুখ যা দেখার পর মুহূর্তেই মন থেকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয়ে যায়। আরও আছে, তার মুখটা মন থেকে মুছে ফেললেও আবারও অন্তরের অন্তরতম কোণে টেনে আবার চাপা ও অফুরন্ত আকাঙ্ক্ষা অবশ্যই থেকে যায়। তবে এও খুবই সত্য যে, প্রত্যেকটা দ্রুতগতিসম্পন্ন আবেগই যে তার মুখের আয়নায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় না তা নয়। তবে যে কোনো আয়নার মতোই আবেগটা যখন ফুরিয়ে যায় তখন মুখের আয়নায় তার কিছুমাত্র নজিরই রেখে যায় না। অর্থাৎ সবটুকু চিহ্নিই নিঃশেষ হয়ে যায়।
সে-রাতে আগন্তুক যুবকটার সঙ্গে যখন আমার ছাড়াছাড়ি হলো, অর্থাৎ যখন বিদায় নিয়ে আমার কাছ থেকে চলে গেল, তখন সে আচমকা আমার হাত দুটো চেপে ধরল। আমি ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে তার মুখের দিকে তাকালাম।
সে আমার হাত দুটো চেপে ধরে বলল–বন্ধু, তোমাকে একটা অনুরোধ করতে চাই।
বল, কি বলতে চাইছ, নির্দিধায় বল?
কথা দাও, আমার অনুরোধ তুমি রাখবে?
আমি ম্লান হেসে বললাম–কি তোমার অনুরোধ তাই তো জানা হলো না, কথা দেব কি করে?
আমার হাত দুটো ধরে রেখেই সে বলল–আগামীকাল খুব ভোরে তোমাকে আমার সঙ্গে দেখা করতে হবে। কথা দাও, তুমি যাবে।
আমরা বুঝতে পারলাম, ব্যাপারটা খুব জরুরি। তাই মুখের হাসিটুকু অব্যাহত রেখেই আমি ঘাড় কাৎ করে তার কথার জবাব দিলাম–কথা দিচ্ছি, কাল ভোরে তোমার ওখানে যাব।
আমি কথা রক্ষা করলাম। পরদিন কাকডাকা সকালে তার পাল্লাজোতে উপস্থিত হলাম। সুবিশাল এক প্রাসাদ। কেবলমাত্র সুবিশাল বলাটা হয়তো ঠিক হবে না। জাকজমকপূর্ণ, অসাধারণ কারুকার্যমণ্ডিত একটা প্রাসাদ। বড় খালটার গায়ে, রিয়ালোটর অদূরে সেটা অবস্থিত। তবে এও সত্য যে, হঠাৎ করে দেখলে মনে হয় পরিবেশ–বিশেষ করে বাড়িটা যেন রীতিমত বিষণ্ণতায় ভরপুর।
আমি সদর-দরজায় পা দিতেই এক প্রবীন ব্যস্ত পায়ে এগিয়ে এসে আমাকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেল।
আমি তার পিছন পিছন মোজাইক-করা একটা চওড়া ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগলাম।
লোকটা আমাকে নিয়ে এমন একটা ঘরে গেল যার ভেতরে ঢোকার আগেই, দরজার সামনে দাঁড়াতেই ঘরের ভেতরের বহু মূল্য বস্তু সামগ্রির অতুলনীয় উজ্জ্বলতা খোলা-দরজা দিয়ে বিচ্ছুরিত হয়ে আসায় চোখ দুটোকে এমন ধাধিয়ে দিল যে, আমি যেন দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে অন্ধ হয়ে গেলাম।
আমার পূর্ব পরিচিত ব্যক্তি যে বিত্তশালী–অগাধ ধন সম্পদের মালিক, তা আমার জানা ছিল বটে। তবে সে একজন রীতিমত টাকার কুমির এ বিষয়ে আমার তিলমাত্র সন্দেহও নেই। তবে এও স্বীকার করছি, তার ধন-দৌলতের বর্ণনা আমি যেরকম ভাষায় শুনেছি তাকে আমি নিজেই অতিরঞ্জিত ও হাসির ব্যাপার আখ্যা না দিয়ে পারিনি; ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে আমার কাছে পরিবেশন করা হয়েছে, এ ব্যাপারে আমি নিঃসন্দেহই হয়ে পড়েছিলাম।
কিন্তু চারদিকে কৌতূহল মিশ্রিত বিস্ময়ের সঙ্গে দৃষ্টিপাত করে করে যা-কিছু আমার সামনে ধরা দিল, তাতে আমি বিশ্বাস করতেই উৎসাহ পাচ্ছিলাম না যে, এমন রাজৈশ্বর্য ইউরোপের কোনো মানুষের বাড়িতে থাকা সম্ভব। কেবলমাত্র আমার কথাই বা বলি কেন? নিতান্ত হলফ করে বললেও কেউই এমন ধন-ঐশ্বর্যের অস্তিত্বের কথা বিশ্বাস করবে না–বিশ্বাস করার মতো ব্যাপারও নয়।
আমি আগেই বলেছি ভোরের আলো ফুটে গেছে। এখন পূব-আকাশে সূর্যদেব উঁকি দিতে শুরু করেছেন। ক্রমে সূর্যের রক্তিম আভায় প্রকৃতি উদ্ভাসিত হয়ে গেল।
এত বেলা হয়ে গেছে তবু ঘরের মধ্যে এখনও অনেক, অনেক উজ্জ্বল বাতি জ্বলছে। ঘরের অবস্থা, জ্বলন্ত বাতি, সবকিছু দেখে এবং আমার বন্ধুর চোখ-মুখের ক্লান্তির ছাপটুকু চাক্ষুষ করে আমি ধরেই নিলাম গত রাতে সে বিছানায়ই আশ্রয় নেয়নি। সে সম্পূর্ণ বিদ্রি অবস্থাতেই সারাটা রাত কাটিয়েছে।
ঘরটার ভেতরের স্থাপত্য, বিশেষ করে ভাস্কর্য শিল্পরীতি এবং আসবাবপত্র ও সাজসজ্জা দেখলেই অনুমান করা যায় যে, মানুষের চোখ দুটোকে ঝলসে দিতে আর চমক সৃষ্টি করতে এ সবের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
উপরোক্ত উদ্দেশ্য সিদ্ধ করতে গিয়ে শালীনতাবোধ অথবা জাতীয়তাবোধের দিকে সামান্যতম নজরও দেওয়া হয়নি।
আমার চোখের মণি দুটো একটা বস্তুর ওপর থেকে অন্য একটা বস্তু, তার পর সেটা থেকে অন্য আর একটা বস্তুর ওপর অনবরত চক্কর খেতে লাগল। কোনো বস্তুর ওপরই বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না বা স্থির হয়ে বসল না।
আমার দৃষ্টি ইতালীয় শিল্পীদের সবচেয়ে ভালো ভাস্কর্যশিল্পের ওপর স্থির থাকল না। এমনকি গ্রীক চিত্রশিল্পীদের অত্যদ্ভুত মূর্তির ওপরও নয় আবার মিশরের অতিকায় খোদাই-শিল্পসামগ্রির ওপরও নয়। এমনকি ঘরের দরজা-জানালার পর্দাগুলোতেও বৈচিত্রের ছোঁয়া আছে। ধরের বহুমূল্য পর্দাগুলোনিচু পর্দার বিষণ্ণ সুরের তালে তারে আলতোভাবে দোল খাচ্ছে। কিন্তু সে সুরের উৎস যে কোথায় তা আমার কাছে অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে।
