কিন্তু মারচেসা! মারচেসা-র ঠোঁট দুটো তিরতির করে কাঁপতে লাগল। মুহূর্তের মধ্যে তার চোখ দুটো পানিতে ভরে উঠল। একে স্থাস ফুলের পাপড়ির মতো নরম আর প্রায় তরল চোখ–চোখের মণিদুটো যেন পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছে।
সত্যি! চোখ দুটো কাণায় কানায় পানিতে ভরে উঠেছে। দেখুন ওই দেখুন, কেমন পানি থৈ থৈ করছে।
আর মরচেসার দেহ আর মন বার বার কেমন শিহরিত হয়ে উঠছে। একটু আগেও যা নিশ্চল-নিথর পাথরের মূর্তি ছিল। এখন তার মধ্যে যেন প্রাণের সঞ্চার ঘটেছে; পাথরের মূর্তি যেন প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। তার মুখের পাথরের মতো পাগ্রতা, পাথরের বুক ওঠা-নামা আর পাথরের পা দুটো বরফের মতো ধবধবে সাদা রঙ–হঠাৎই কিছুর ওপর যেন রক্তিম স্রোত বয়ে চলল।
নেপোলির মৃদুমন্দ বাতাস যেমন ঘাসের রূপালি ফুলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়, তিরতির করে কাঁপতে থাকে, ঠিক তেমনই মৃদু একটা কম্পন শিহরণ তার দেহ পল্লবের ভেতরে বইতে লাগল।
এ কী অভাবনীয়, অদ্ভুত ব্যাপার! মারচেসা অকস্মাৎ কেন এমন রক্তিম হয়ে উঠল? কেন তার মধ্যে এমন অবিশ্বাস্য পরিবর্তনের জোয়ার বইতে শুরু করেছে?
না, এ প্রশ্নের কোনো জবার দেওয়া সম্ভব নয়, আসলে কোনো জবাবই যে নেই। কেবলমাত্র এটুকুই বলা যেতে পারে, মায়ের ভীত সন্ত্রস্ত মন, নিরবচ্ছিন্ন আতঙ্কের জন্য লম্বা লম্বা পায়ে শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় চটি পরা সম্ভব হয়নি। আসলে চটি পরার মতো মানসিকতাই তার ছিল না। তার ওপর খোলা কাঁধের ওপর প্রয়োজনীয় আবরণ চাপানোও হয়নি। এ যদি না-ই হয় তবে তার দেহল্লব অকস্মাৎ এমন লক্ষিত বা হবে কেন?
আর চারদিকের বহু অনুসন্ধিৎসু চোখের চাহনি কি? –কাঁপা কাঁপা বুকের বার বার অস্বাভাবিক ওঠা নামা কি?
কি? কি? কি? নবাগত যুবক মেনতানি প্রাসাদের দিকে এগিয়ে যাবার পর আকস্মিকভাবে তার একটা হাত কি রূপসি মারচেসার কাঁধ ছুঁয়ে গিয়েছিল–তাই কি? সে জন্যই কি তার মধ্যে এমন আকস্মিক পরিবর্তন লক্ষিত হচ্ছে! সে যুবকটার কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় সে এতই গলা নামিয়ে, অস্বাভাবিক গলা নামিয়ে অথবা খুবই দ্রুততার সঙ্গে সে অর্থহীন কথাগুলো উচ্চারণ করেছিল কেন?
কি বলেছিল, কি বলেছিল সে? সে কি বলেছিল পানির কুলকুল রবকে আমি ভুল শুনেছিলাম, তুমিই বিজয়ীর সম্মানলাভে ধন্য হয়েছ। সূর্যোদয়ের এক ঘণ্টা পরে, আমরা মিলিত হব–কথা থাকল। এমন অর্থহীন কথা কেন সে উচ্চারণ করেছিল?
সমবেত জনতা ক্রমে নীরব হতে লাগল। এক সময় হৈ হট্টগোল, চিৎকার চ্যাঁচামেচি, গণ্ডগোল সবই থেমে গেল–পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলো।
এক এক করে প্রাসাদটাগুলো ঘুটঘুঁটে অন্ধকারে আত্মগোপন করে রইল। আর সে আগন্তুক যুবক? হ্যাঁ, আমি এখন তাকে সনাক্ত করতে পেরেছি। মসৃণ কালো পাথরটার ওপর সে একা, একেবারেই একা দাঁড়িয়ে থাকল।
আগন্তুক যুবকটা এখন কল্পনাতীত উত্তেজনায় থর থর করে কাঁপছে। আর অনুসন্ধিৎসু নজরে একটা ডিঙি নৌকার খোঁজে বার বার এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। তার অবস্থা দেখে আমি তাকে আমার ডিঙিটায় উঠতে না বলে পারলাম না। আর সেও নিজের সমস্যা দূর করতে গিয়ে আমার ভদ্রতাটুকুর সুযোগ নিল।
আমরা উভয়ে খোঁজাখুঁজি করে দরজাটার কাছ থেকে একটা বৈঠা জোগাড় করে ফেললাম। এবার বৈঠার টানে ভিঙিটা আমার নিয়ে তরতর করে আগন্তুক যুবকটার। মাথা গোঁজার স্থানের উদ্দেশ্যে এগিয়ে চললাম।
ভিঙিতে উঠে আগন্তুক যুবকটা আমার মুখোমুখি বসল। খুবই অল্প সময়ের মধ্যে সে নিজেকে সামলে সুমলে নিল। তারপর আমাদের সামান্য পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে সে রীতিমত বিনয়ের সঙ্গে এবং যথেষ্ট ভদ্রতা বজায় রেখে আমার সঙ্গে কথা বলতে আরম্ভ করল।
আমার নিজের কথায় আবার ফিরে যাই। সত্যি বলতে কি, এমনকিছু কিছু ব্যাপার আছে যার খুঁটিনাটি বিষয়ের দিকে নজর দিতে, চিন্তাভাবনা করতে আমার খুব ভালো লাগে।
আগন্তুক যুবকটা জগতের কাছে এখনও আগন্তুক বলেই পরিচিত। তার অন্য কোনো পরিচয় তো কারোই জানা নেই। তাই বাধ্য হয়ে আমিও তাকে আগন্তুক বলেই সম্বোধন করব। এ ছাড়া উপায়ও তো কিছু নেই। এ ছাড়া তার চেহারা ছবিটাও তো সে রকমই একটা ব্যাপার।
তার উচ্চতা সঠিক জানা নেই, আর তা না জানলেও তার দৈহিক বিবরণ দেওয়ার তেমন কোনো সমস্যা হবে না। এতএব এভাবেই ব্যাপারটা ব্যক্ত করছি– মাঝারি উচ্চাতার চেয়ে একটু কমই তার দৈহিক উচ্চতা। তবে এত সত্য যে, প্রচণ্ড কোনো আবেগ-উচ্ছ্বাসের মুহূর্তে তার দৈহিক উচ্চতা সামান্য বেড়ে যায়।
আর তার গড়ন একহারা। এ চেহারায় ব্রীজ অব সাইজ-এ কাজের তৎপরতার যতটা পরিচয় পাওয়া যায়, বিপদের মুহূর্তে কিন্তু ঠিক অতটা মেলে না। অর্থাৎ হারকিউলিসের মতো তার যে শক্তির খ্যাতি রয়েছে, তা কিন্তু বিপদের মুহূর্তে ছাড়া অন্য কোনো সময় লক্ষিত হয় না।
এবার তার মুখায়বের দিকে নজর দেওয়া যাক। সত্যি করে বলতে গেলে তার মুখ আর থুতনিতে দেবতাসুলভ আদল বর্তমান। টানাটানা চোখ দুটো অসংযত। আর সে দুটো বাদামি থেকে কালো পর্যন্ত রং পরিবর্তিত হয়।
আর মাথাভর্তি একরাশ কোঁকড়ানো কালো চুল। চুলের গোছার ফাঁক দিয়ে তার উন্নত ও প্রয়াত কপালটা থেকে থেকে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ফলে মনে হয়, আলো আর হাতির দাঁতের শুভ্রতায় ঝলমল করতে থাকে।
