তা সত্ত্বেও সারা রাতের উষ্ণ বিষণ্ণতায় ভরপুর আর অচঞ্চল বাতাসেও সে মিহি বস্ত্রখণ্ডের আবরণটার একটা ভাজও উড়ছে না, নড়ছেও না এতটুকুও।
তবুও কী অত্যাশ্চর্য ব্যাপার! তার একমাত্র প্রদীপের সলতে, একমাত্র আশার। আলো খালের পানির অতল গহ্বরে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে, সেদিকে কিন্তু তার উজ্জ্বল চোখের মণি দুটো নিবদ্ধ নেই।
তবে? সে রূপসি নিস্পলক চোখে, স্থির দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছে। এমন অসম্ভব কোনো ব্যাপারের কথা ভাবা যায় না, কি ভাবতে উৎসাহ পাওয়া যায়। তবুও যা বাস্তব তাকে তো আর অস্বীকার করা যাবে না।
আমার বিশ্বাস, পুরনো প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রের কারাগারটাই ভেনিস নগরের উচ্চতম বাড়ি। কিন্তু এ নারী কিভাবে সে বাড়িটার দিকে নিস্পলক চোখে তাকিয়ে আছে ভাবলে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়তে হয়। আর তা কখন, কোন্ মুহূর্তে? যখন তারই একমাত্র সন্তান নিচেই শীতল সলীল সমাধিতে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে।
আর দূরবর্তী ওই ঘুটঘুঁটে অন্ধকার, বিষাদময় কুলুঙ্গীটাও তারই জানালার বিপরীত দিকে যেন বিরাট গ্রীবা বিস্তার করে অবস্থান করছে।
তবে সে সুবিশাল বাড়িটার ছায়ায়, তার স্থাপত্য ও ভাস্কর্যগতিতে, তার আইভিলতা ঝুলে থাকা গম্ভীর কার্নিসটায়, এমনকি আকর্ষণীয় থাকতে পারে যা মারচেসা দ্য মেননী ইতিপূর্বে অন্তত হাজারবার চাক্ষুষ করেছে।
বাজে কথা! কী সব বাজে কথা! কার না জানা আছে যে, এরকম মানুষের চোখ দুটো ভাঙা-আয়নার একটা বিষণ্ণতাকে, একটা দুঃখ-যন্ত্রণাকে বহুগুণ প্রতিবিম্বিত হতে দুঃখ-যন্ত্রণাকে হাতের নাগালের মধ্যে দেখে অগণিত দ্রব্য সামগ্রির মধ্যে প্রতিফলিত হতে? জানে, সবাই-ই তা জানে।
মেনতনি! মারচেসার থেকে বেশ কিছু সংখ্যক সিঁড়ি ওপরে, পানি দরজার খিলানের তলায় পরিপূর্ণ হয়ে মেনতনি স্বয়ং যক্ষের মতো অবস্থান করছে।
কেন মেনতনি দাঁড়িয়ে, কেন? কি করছে সেখানে দাঁড়িয়ে? পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে একটু পর-পর সে হাতের গিটারের তারে টোকা মারছে। আর? আর কিছুক্ষণ বাদে-পরেই সন্তানকে খোঁজ করার জন্য নির্দেশ দিচ্ছে। গিটারের তারে টোকা মারছে। আর সন্তানের খোঁজ করতে বলছে। ব্যস, এটুকুই।
এমন একটা ব্যাপার চোখের সামনে দেখে আমিও যেন কেমন হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। সে মুহূর্তে হঠাৎ করে কর্তব্য নির্ধারণ করাই আমার পক্ষে নিতান্ত অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
আর্তস্বরটা প্রথম শুনেই আমি যে ভিঙিটার ওপর যন্ত্রচালিতের মতো লাফিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম, সে মুহূর্ত থেকেই আমি যেন চলার মতো শক্তি সামর্থ্যটুকুও হারিয়ে ফেলেছিলাম।
কার্যত যা দেখা গেল তা হচ্ছে, উত্তেজিত জনগণের দৃষ্টিতে আমি যেন একটা অলৌকিক অশুভ উপস্থিতিতে পরিণত হয়ে যাই। ফ্যাকাশে বিবর্ণ মুখ আর নিশ্চল নিথর হাত-পাসহ সে ভিঙিটায় চেপে আমিও তাদের মিছিলে ভাসতে ভাসতে এগিয়ে যেতে লাগলাম। তাদের দলের ভিড়ে আমি চলছি তো চলছিই। না, সব চেষ্টাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো।
এতগুলো লোক একজোট হয়ে দীর্ঘসময় ধরে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে পানি তোলপাড় করল। কিন্তু ফায়দা কিছুই হলো না। অনুসন্ধানকারীদের মধ্যে অনেকে দীর্ঘ নিরলস কঠোর পরিশ্রম করেও ব্যর্থ হয়ে, হতাশায় জর্জরিত মনে অনিবার্য দুঃখকে স্বীকার করে নিয়ে বিশ্রাম নিতে লাগল।
না, জলমগ্ন শিশুটাকে উদ্ধারের আশা আর কারোই রইল না, তার মায়েরও না। সবার মুখেই হতাশার কালো ছায়া।
ঠিক তখনই কারাগারের যে কুলুঙ্গিটার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তারই জমাটবাঁধা অন্ধকার কোণ থেকে অতর্কিতে বেরিয়ে এলো একটা আবছা মূর্তি। আপাদমস্তক আলখাল্লায় মোড়া একটা মূর্তি।
অন্ধকারের বুক চিড়ে দাঁড়িয়ে থাকা খাড়া পাহাড়টার চূড়ার ওপর উঠে মূর্তিটা মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। পর মুহূর্তেই আচমকা লাফিয়ে পড়ল খালের ঠাণ্ডা পানিতে।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই মূর্তিটা শিশুটাকে জীবিত শিশুটাকে বুকে জাপ্টে ধরে পানির ওপরে ভেসে উঠল।
তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে জীবিত শিশুটাকে বুকে জড়িয়ে ধরেই সে কালো পাথরটার ওপর এসে মারচেসারের পাশে দাঁড়াল। পানিতে ভিজে জবজবে ও ভারী হয়ে যাওয়ায় মূর্তিটার গায়ের আলখাল্লাটা মহিলার পায়ের কাছে খুলে পড়ে গেল।
দর্শকরা বিস্ময়বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল দীর্ঘদেহী ও সুঠাম যুবকটার মূর্তির দিকে। তাকিয়ে রইল ইউরোপের প্রায় সর্বত্র প্রতিটা আনাচে কানাচেও যার নাম লোকের মুখে মুখে উচ্চারিত ও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সত্যি যুবকটা এক অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছে। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার। উদ্ধারকারী যুবক একটা কথাও উচ্চারণ করল না। সে গম্ভীর মুখে জীবিত শিশুটাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
কিন্তু মারচেসা? মারচেসা তো তার সন্তানকে ফিরে পাবে, জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদকে বুকে জড়িয়ে ধরবে। আদরে-সোহাগে তাকে বিপর্যস্ত করে তুলবে।
হায়! এ কী অবিশ্বাস্য কাণ্ড! মুহূর্তের মধ্যে আর এক জোড়া হাত এগিয়ে এসে বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে শিশুটাকে নবাগত যুবকটার হাত থেকে তুলে নিল। বহু বহুদূরে নিয়ে চলে গেল। তাকে নিয়ে গেল সবার চোখের আড়ালে, প্রাসাদের ভেতরে হাজির হলো।
