মূর্তি ধারণ করে তুমি আর একবার উঠে এসে আমার সামনে দাঁড়িয়েছ।
না না, তুমি তো ছায়াবৃত শীতল উপত্যকার আজকের তুমি নও। ঠিক যেমন তোমার হওয়া দরকার তেমন তো নও। সে তুমি তোমার মাতৃভূমি, তোমার নিজের দেশ ভেনিসের এক গাম্ভীর্যপূর্ণ মহৎ জীবনকে অবহেলা-অবজ্ঞায় অপচয়ের মাধ্যমে শেষ করে দিয়েছিলে, সে তুমি তো বর্তমানের তুমি নও।
সত্যি, আমি আবারও বলছি, তোমার যেমন হওয়া উচিত সে তুমি তো নও।
এ লোকটা ছাড়া আর লোকের অস্তিত্ব অবশ্যই আছে। মানুষের ভাবনা চিন্তা ছাড়া অন্য চিন্তা-ভাবনাও আছে; কূটনীতিবিদদের মতবাদ ছাড়া অন্য মতবাদের অস্তিত্ব আছে। অতএব তোমার চরিত্র সম্বন্ধে কে প্রশ্নের অবতারণা করবে? তোমার স্বপ্ন-দেখা দিনগুলো সম্বন্ধে তোমার ওপর কেই বা শেষ চাপিয়ে দেবে? আর তোমার যেসব কাম-কাজ শাশ্বত শক্তির ধারামাত্র তাকে কে জীবনের অবক্ষয় বলবে, কুৎসা গাইবে?
ভেনিসের মানুষ যে পথকে পন্ডে দ্য সমৃপিরি বলে সম্বোধন করে, (মাথার ওপরে ছাউনি দেওয়া বিশেষ ধরনের পথের কথা বলছি) –তারই তলায় যে লোকটার সঙ্গে আমার তৃতীয় অথবা চতুর্থবার দেখা হয়েছিল তার কথাই আমি বলতে চাইছি।
আর সেখানকার যে পরিবেশে আমাদের সাক্ষাৎ ঘটেছিল সে কথাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা স্মৃতিগুলোকে ঘেঁটে এখন আমি ব্যক্ত করছি। তবুও আমার স্মৃতিতে ভেসে উঠছে, উফ! সে-কথা কি আমি স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে পারি, নাকি ভুলে যাওয়া সম্ভব? সেই মাঝরাত, সেই ব্রীজ অব সাইজ। সে অতুলনীয় নারী আর সে রোমান্স–খালের এপাড় থেকে ওপাড়ে প্রতিভা যে ঘুরে ঘুরে বেড়াত।
রাত! মাঝরাত! ঘুটঘুঁটে অন্ধকার রাত। চকের ইয়া পেল্লাই ঘড়িটায় ইতালীয় সন্ধ্যার পঞ্চম ঘণ্টা গম্ভীর আওয়াজ তুলে বেজে গেছে।
ক্যাম্পানাইল স্কোয়ারটা জনমানবশূন্য। অবর্ণনীয় নিস্তব্ধতা সেখানে বিরাজ করছে।
প্রাচীন ডিউক প্রাসাদের অত্যুজ্জ্বল বাতিগুলো এক এক করে নিভতে শুরু করেছে। একটু একটু করে অন্ধকার নামতে নামতে এক সময় অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে গেল অতিকায় প্রাসাদটা।
আমি ছোট চক থেকে বড় খালের গা-বেয়ে ভিঙি নিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম।
কিন্তু খাল বরাবর আমার ডিঙিটা সান সার্কো খালের মোহনার বিপরীতে পৌঁছতে-না পৌঁছতেই রাতের অন্ধকার ভেদ করে বাতাস বাহিত নারীকন্ঠের তীব্র ও দীর্ঘ আর্তনাদ আমার কানে এলো।
আকস্মিক আর্তস্বরটা শোনামাত্র আমি সচকিত হয়ে এক লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। আমার আকস্মিক লাফে ভিঙিটা একদিকে কাত হয়ে ডুবতে ডুবতে কোনোরকমে বেঁচে গেছে।
আর ডিঙি চালকের হাত থেকে একমাত্র বৈঠাটা হঠাৎ ঝপাৎ করে হাত ফসকে পানিতে পড়ে গেল। ব্যস, একে ঘুটঘুঁটে অন্ধকার তার ওপর স্রোতের টানে বৈঠাটা যে ভেসে কোথায় চলে গেল হদিসই পেলাম না।
বৈঠাটা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় স্রোতের টানের ওপরই আমাদের ভিঙিটার গতি অব্যাহত রাখা সম্ভব হলো। তাই অন্যন্যোপায় হয়ে আমরা স্রোতের টানে এগিয়ে চললাম।
আমরা তখন যেখানে অবস্থান করছিলাম সেখানকার সব স্রোতই বড় খাল থেকে ছোট খালের দিকে প্রবাহিত হয়।
আর আমরা এর ফলে অতিকায় শুকনের মতো ব্রীজ অব সাইজ-এর দিকে আমাদের ভিঙিটা মন্থর গতিতে এগিয়ে চলল।
ভিঙিটা আমাদের নিয়ে এগিয়ে চলেছে। ঠিক তখনই ডিউকের সুবিশাল প্রাসাদটার প্রতিটা জানালা আর সিঁড়ির ধাপগুলোতে হাজার হাজার জ্বলন্ত মশালের আলো ঠিকড়ে চোখের পলকে সে ঘুটঘুঁটে অন্ধকার রাত যেন দিনের মতো ঝলমলিয়ে উঠল। সীসা-রঙের অস্বাভাবিক দিনের আলোয় সবকিছু উদ্ভাসিত হয়ে পড়ল।
একটু পরেই সুবিশাল ও সুউচ্চ প্রাসাদটার ওপর তলাকার একটা জানালা দিয়ে মায়ের কোল থেকে হঠাৎ ফসকে একটা শিশু নিচের গভীর অন্ধকার খালের পানি পড়ে গেল।
খালের শান্ত পানি পড়ায় হতভাগ্য শিশুটা সহজেই তলিয়ে গেল। সে মুহূর্তে তার কাছাকাছি আমার ভিঙিটাই ছিল। তা সত্ত্বেও বহু দক্ষ সাঁতারুই ইতিমধ্যে ঝাঁপিয়ে তার খোঁজে বৃথাই পানি তোলপাড় করতে লাগল।
হায়! যে হারানিধির খোঁজে তারা অনবরত পানি তোলপাড় করে চলেছে সে যে এতক্ষণে কোন অতল গহ্বরে তলিয়ে গিয়ে থিতু হয়ে গেছে।
তখন পানি থেকে মাত্র সিঁড়ির কয়েকটা ধাপ ওপরে, প্রাসাদের সদরদরজার গায়ে কালো পাথরে বাঁধাই চওড়া পাথরটার ওপরে দাঁড়িয়ে-থাকা মূর্তিটাকে তখন যারা দেখতে পেয়েছিল তারা কেউ কোনোদিনই তাকে মন থেকে মুছে ফেলতে পারবে না।
কে সে? সেটা কার অতিকায় মূর্তি? তার নাম মারচেসা এফেফাদিতে। সারা ভেনিসের মানুষের চোখের মণি, বড়ই আদরের মানুষ, সদাহাস্যময় নারী, সুন্দরীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুন্দরী, সুন্দরী শ্ৰেষ্ঠা-বুড়ো অস্থিরমতি প্রেমিকা তরুণী স্ত্রী, প্রথম এবং একমাত্র সন্তান এ রূপবান শিশুটার মা এখন যে খালের শীতল পানির তলায় শায়িত।
নারী একা, একদম একা দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার রূপার মতো সুদৃশ্য খোলা পা দুটো নিচের আয়নার মতো মসৃণ কালো পাথরের ওপর ঝলমল করছে।
রূপসি নারীর বল-নাচের কায়দায় বাঁধা চুলের গোছাটা আধখোলা অবস্থায় পিঠের ওপর এলিয়ে পড়েছে। তার গায়ে হীরার একটা মালা জড়িয়ে দেওয়ায় তার সৌন্দর্য অনেকাংশে বেড়ে গিয়েছে।
বরফের মতো ধবধবে সাদা সুতোয় বোনা একটা মাত্র বস্ত্রখণ্ড দিয়ে তার রূপ লাবণ্যকে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অন্য কোনো আবরণের চিহ্নমাত্রও নেই।
