দেখলাম, সে সুবিশাল আকাশযানটার ওপর থেকে ঝুঁকে, অদ্ভুতভাবে হাত দুটো ভাঁজ করে বসে রয়েছে। তার দুটো ঠোঁটের ফাঁকে একটা পাইপ আটকে রয়েছে। আর সেটা থেকে থেকে ধোয়া ছাড়ছে। মৌজ করে তামাকের সদ্ব্যবহার করে চলে।
তার ভাবগতিক দেখে মনে হল, এ পৃথিবীতে সে পরমানন্দেই দিন গুজরান। করছে।
আমি তখন কথা বলার শক্তিটুকুও হারিয়ে বসেছিলাম। তাই নিতান্ত অনন্যোপায় হয়েই চোখে-মুখে মিনতির সুস্পষ্ট ছাপ এঁকে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। সে মুহূর্তে তার করুণাই আমার একমাত্র ভরসা।
সে আমাকে জিজ্ঞাসা করল–তোমার কি নাম হে? আর তুমি কোন সাহসে এভাবে চলাফেরা করছ? কেনই বা তুমি এ অবস্থায় এখানে এসেছ, বলবে কী?
লোকটার নির্মম নিষ্ঠুর আচরণ আর বাহানার জবাবে আমার মাথায় একটা মাত্রই কথা বেরিয়ে এলো রক্ষা কর, বাঁচাও আমাকে।
আমার কথাটা শেষ হওয়ামাত্র সে যন্ত্রটার ভেতর থেকে কার্থওয়াসর-এর বড়সড়ও ভারি একটা বোতল ছুঁড়ে দিল। সেটা এসে দুম করে আমার মাথায় পড়ল। উফ! কী নিষ্ঠুর লোকটা। আর একটু হলেই আমার মাথাটাই ফেটে যেত। তার আচরণে বীতশ্রদ্ধ হয়ে আমি ধরে-থাকা দড়িটাই ছেড়ে দিতে চাইলাম।
আমার মনোভাব বুঝতে পেরে কে যেন চেঁচিয়ে বলল–আরে, করছ কী! করছ। কী! ভুলেও এমন কাজ করো না! দড়িটা শক্ত করে ধরে থাক, মাথা গরম করে এরকম চরম ভুল করতে যেয়ো না।
আমি তার কথার কি জবাব দেব ভেবে না পেয়ে কপালের চামড়ায় পর পর কয়েকটা ভাজ এঁকে নীরবে তাকিয়ে রইলাম।
সে বলে চলল–শোন, তোমার যদি আরও কাথওয়াসর-এর বোতল দরকার হয়ে থাকে বল, দিচ্ছি। কিন্তু দড়িটা যেন ভুলেও ছেড়ে দিও না। নাকি, একটাতেই তোমার কাজ মিটে গেছে? বিবেক বিচার-বিবেচনা বোধ ফিরে পেয়েছ? নাকি–
আমি মুখে কিছু না বলে ব্যস্তভাবে দুবার মাথা নাড়লাম। প্রথমবার মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিতে চাইলাম, এ মুহূর্তেরই আমার আর বোতল দরকার নেই। আর দ্বিতীয় বার হ্যাঁ সূচক, অর্থাৎ আমি বিবেক-চৈতনা ফিরে পেয়েছি। এবার দেবদূতের রাগ অনেককাংশে কমে গেছে বলেই মনে হলো।
দেবদূত আবার মুখ খুলল। সে এবার বেশ নরম গলায় আরও বেশি সহানুভূতি প্রকাশ করে বলল–তবে তুমি শেষপর্যন্ত মেনে নিচ্ছ যে, অদ্ভুত কাণ্ডও দুনিয়ায় ঘটে থাকে, কী বল?
আমি আবার মাথা নেড়ে তার কথার সম্মতি জানালাম। এবারও মুখে টু-শব্দটিও করলাম না।
এবার সে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল–তুমি তবে আমাকে না, মানে বিচিত্র দেবদূতকে বিশ্বাস করছ, তাই না?
আমি এবারও মুখে কিছু না বলে মাথা নেড়ে তার কথার জবাব দিলাম।
সে এবার বলল–তুমি যে আমাকে বিশ্বাস করছ, সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করছ, তার প্রমাণ কী? আমি উপযুক্ত প্রমাণ চাই। আমার কাছে আত্মসমর্পণের প্রমাণস্বরূপ তোমার ডান হাতটাকে বাঁদিকের জ্যাকেটের পকেটে ঢুকিয়ে আমার কাছে আত্মসমর্পণের প্রমাণ দাও।
না, তার নির্দেশ পালন করা স্বাভাবিকভাবেই আমার পক্ষে সম্ভব হলো না। কারন, আমি তো অনে আগেই মই থেকে পড়ে গিয়ে ডান হাতটাকে খুইয়েছি। আর অন্য হাতটা যদি ছেড়ে দেই তবে তো আমি সঙ্গে সঙ্গেই অক্কা পাব। আর জ্যাকেট? হায় আমার কপাল! সেই সদাশয় কাকটার দেখা না পেলে আমি জ্যাকেট পাবই বা কোথায় যে পকেটে হাত ঢোকাব? তাই নিতান্ত অনন্যোপায় হয়েই আমি এমন ভাবে মাথা নাড়লাম যাতে সে বোঝে তার নির্দেশ পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
কিন্তু আমি এ-কাজটা করে কী ভুল, বোকামিই যে করেছিলাম, তা আর শোধরাবার নয়।
আমি মাথা নাড়ানো থামাতে-না-থামাতেই বিচিত্র দেবদূত রেগে গর্জে উঠল– ঠিক আছে, তুমি তবে জাহান্নামেই যাও।
কথাটা বলতে বলতেই যে একটা চকচকে ঝকঝকে ছুরি দিয়ে ব্যস্ত-হাতে আমার ধরে-থাকা দড়িটাকে ঘ্যাঁচ করে কেটে দিল।
ভাগ্য ভালো যে আমি তখন আমার নিজের বাড়িতে পৌঁছে গেছি। আর আমার অবর্তমানে মিস্ত্রিরা ঝটপট বাড়িটাকে মেরামত করে প্রায় নতুনের মতো করে ফেলেছে। তাই দড়িটা কাটার ফলে আমি ছাদের চিমনিটার মধ্যে ঢুকে গেলাম। তারপর সেটা দিয়ে গলে একেবারে ঘরের মেঝেতে আছড়ে পড়লাম।
মেঝেতে পড়ার ফলে আমি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললাম। কতক্ষণ যে আমি অচৈতন্য অবস্থায় মেঝেতে পড়েছিলাম, তা বলতে পারব না।
সংজ্ঞা ফিরে পাবার পর বুঝতে পারলাম, ভোর হতে চলেছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি, চারটা বাজে।
দড়িটা কেটে দেওয়ার ফলে আমি ঘরের মেঝের যেখানে পড়েছিলাম, সেখানেই অলসভাবেই পড়ে রইলাম। মাথায় হাত দিয়ে দেখি, নিভে থাকা চিমনির ছাই কালি মাখামাখি হয়ে রয়েছে। আর উলটে থাকা ভাঙা টেবিলটার ওপর আমার পা দুটো উঠে রয়েছে।
ঘরের বাকি অংশের অবস্থাও একই রকম। ঘরময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে গ্লাস আর বোতলের ছোট-বড় টুকরো, খাবারদাবারের টুকরো, একটা ছেঁড়া-ফাটা খবরের কাগজ, সিডাম কৰ্থওয়াস-এর একটা অলি পাত্র এবং আরও কত কি সে চোখে পড়ল সব বলা সম্ভব নয়।
বিচিত্র দেবদূত আমার কাজের মাধ্যমে ক্ষুব্ধ হয়ে এভাবেই বদলা নিয়ে আত্মতৃপ্তি লাভ করে।
দ্য অ্যাসাইনমেন্ট
রহস্যময় এক মানব!
রহস্যময় এক অদৃষ্ট-বিড়ম্বিত মানব।
সে হতভাগা নিজের কল্পনার উজ্জ্বল আভায় নিজেই পথ হারিয়ে ফেলেছে। পতঙ্গের মতো উদ্ভ্রান্ত হয়ে নিজের যৌবনের আগুনে নিজেই ঝাঁপিয়ে পড়েছে। বাস্তবে নয়, কল্পনার মাধ্যমে তোমাকে আবার দেখছি, দেখতে পাচ্ছি। দেখতে পাচ্ছি,
