এবারও গোড়ার দিকে আমার ভাগ্য খুলে গেল বলেই মনে হলো। ধরেই নিলাম এবার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবেই হবে। কিন্তু অচিরেই খুবই সাধারণ একটা ঘটনা প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াল।
আমার বাঞ্ছিতা, আমার বাগদত্তাকে শহরের গণ্যমান্য লোকের মেলায় হঠাৎ দেখতে পেয়েই আমি তাকে অভিবাদন জানাবার জন্য ব্যস্তপায়ে ছুটে গেলাম। উভ্রান্তের মতো একে ঠেলে, ওকে ধাক্কা মেরে তার মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ানো মাত্র আচমকা কি যেন একটা বস্তু, উড়ে এসে আমার চোখে পড়ল। ব্যস, মুহূর্তের মধ্যেই আমি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে একেবারে অন্ধ হয়ে গেলাম।
আমি অস্থিরভাবে চোখ ডলাডলি করে দৃষ্টিশিক্ত ফিরে পাওয়ার অনেক আগেই আমার মনের মানুষটা কোথায় যেন হারিয়ে গেল।
আমার আকস্মিক ও ক্ষণিকের দৃষ্টিহীনতাকে পূর্বপরিকল্পিত চক্রান্ত জ্ঞান করে আমি বড়ই মর্মাহত, ক্ষুব্ধও কম হইনি।
আমি আকস্মিক অভাবনীয় ব্যাপারটায় এমনই স্তম্ভিত হয়ে পড়লাম যে, আমার জ্ঞানবুদ্ধি যেন নিঃশেষে আমার মধ্য থেকে উবে গেছে।
আমার অন্ধত্ব কিন্তু তখনও নিমূর্ল হয়নি, কিছুই স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি না। ঠিক তখনই সে অদ্ভুতদর্শন দেবদূত যেন আমার চোখের সামনে এসে হাজির হলো।
আমি তখনও চোখের সমস্যা নিয়ে নাজেহাল হচ্ছি। কিন্তু সে দেবদূত আমার সামনে উপস্থিত হয়েও এমন বিনয়ের সঙ্গে আমাকে সাহায্য করতে আগ্রহ প্রকাশ করল, যা আমার কাছে নিতান্তই অপ্রত্যাশিত ছিল।
সে এগিয়ে এসে আমার একেবারে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে আমার চোখের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ সেরে ফেলল। এবার খুবই সতর্কতার সঙ্গে তার কাছে থেকে কী যেন একটা বস্তু বের করে আনল। তার সহানুভূতি আমাকে বাস্তবিকই অবর্ণনীয় স্বস্তি দান করল।
না, খুব হয়েছে ভাবলাম, ভাগ্য যখন এতই মন্দ তখন আর ধরে প্রাণটাকে মিছে জিইয়ে রেখে ফায়দাই বা কি? এর চেয়ে বরং মরে যাওয়াই অনেক, অনেক ভালো।
আমি আত্মহত্যাকেই একমাত্র শান্তির পথ হিসেবে বেছে নিলাম। কিন্তু সেটা কিভাবে? নিজের মনের সঙ্গে দীর্ঘ বোঝাপড়ার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম, নদীর
জলে প্রাণ বিসর্জন দেওয়াই সহজতম উপায়। শেষপর্যন্ত নদীর পানিকেই শান্তির পথ। হিসেবে চূড়ান্তভাবে বেছে নিলাম।
এবার পরিকল্পনা অনুযায়ী আমি গুটিগুটি অদূরবর্তী নদীটার দিকে হাঁটতে লাগলাম।
কিছুক্ষণের মধ্যেই নদীর পাড়ে পৌঁছে গেলাম। স্থানটা বড়ই নির্জন নিরালা। ধারে-কাছে তো নয়ই, এমনকি দূরেও কোনো মানুষজনের চিহ্নও দেখা যাচ্ছে না। ব্যস, মুহূর্তমাত্র সময় নষ্ট না করেই আমি ব্যস্ত-হাতে পোশাক-পরিচ্ছদ খুলে নদীর পাড়ে রেখে দিয়ে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র অবস্থায় আচমকা নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়লাম।
আগেই বলেছি, মানুষ জনের নামগন্ধও ধারে কাছে ছিল না। তাই গাছের ডালে বসে থাকা একটা কাক আমার এ-কাজের একমাত্র প্রাণবন্ত সাক্ষী রইল। হতচ্ছাড়াটা মদে ভেজানো শাকে উদর পূর্তি করে নেশার ঘোরে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
হায়! এ কী সর্বনাশা কাণ্ড রে বাবা? আমি পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ামাত্রই হতচ্ছাড়া পাখিটা আমার পোশাক-পরিচ্ছদের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় অংশটা ঠোঁটে কামড়ে ধরে উড়ে গেল। কেন যে সেটা এমন একটা কাজে উৎসাহি হয়ে পড়ল, তা আমি কিছুই বলতে পারব না।
তাই নিতান্ত নিরুপায় হয়েই আমাকে আত্মহত্যার ইচ্ছাটাকে তখনকার মতো শিকেয় তুলে রাখতে হলো। ব্যস্ত হয়ে পানি থেকে উঠে এসে শরীরেরনিম্নাংশকে কোটের মধ্যে ঢুকিয়ে কোনোরকমে লজ্জানিবারণ করে নচ্ছার শয়তান পাখিটার খোঁজে ছুটতে আরম্ভ করলাম।
কিন্তু অদৃষ্টের বিড়ম্বনাও আমাকে অনুসরণ করে চলল। আমি কাকটাকে আকাশের দিকে নিবদ্ধ রেখে উদ্ধশ্বাসে পোশাক-চোর ওই শয়তান পাখিটার পিছন পিছন ধেয়ে চললাম। এক সময় হঠাৎ আমার খেয়াল হলো মাটির সঙ্গে আমার পা দুটোর কোনো সম্পর্কই নেই, পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
আসল ব্যাপারটা হচ্ছে, উদ্রান্তের মতো ছুটতে ছুটতে আমি কখন যে পাহাড়ের ওপরে উঠে গিয়েছিলাম, বুঝতেই পারিনি। এর অনেক আগেই আমি আছড়ে পড়ে থেঁতলে যেতাম। অবশ্য ভাগ্যগুণে বাতাসের কাঁধে ভর করে ভাসমান একটা বেলুনের গা থেকে ঝুলন্ত দড়ি ধরে যদি ঝুলে পড়তে না পারতাম তবে আমার অবস্থা যে কি হতো তা ভাবলেই আমার অন্তরাত্মা শুকিয়ে আসতে লাগল।
ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই আমি গলা ছেড়ে চিৎকার করে মাথার ওপরের বেলুনটার চালককে লক্ষ্য করে আমার চরমতম দুর্গতির কথা জানোনোর জন্য প্রাণপণে চেষ্টা চালাতে লাগলাম। দীর্ঘসময় ধরে আমি বুককাঁপা চিৎকার করলাম। কিন্তু কোনো ফলই হলো না। এর দুটো কারণ হতে পারে। বোকাহাদাটা হয়তো আমার চিল্লাচিল্লি শুনতেই পায়নি। আবার এমনও হতে পারে, শয়তানটা সবকিছু শুনে বুঝেও আমার দিকে নজর দিতে উৎসাহি হলো না।
ইতিমধ্যে দৈত্যাকৃতি যন্ত্রটা খুবই তাড়াতাড়ি ওপরে উঠে যেতে লাগল। আর আমার শক্তি-সামর্থ্যও সে অনুপাতে কমে যেতে আরম্ভ করল। আমি উঠছি তো উঠছিই।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি হয়তো অদৃষ্টের কাছে আত্মসমর্পণ করে সমুদ্রের বুকে আছাড় খেয়ে পড়ে নিঃশব্দে ডুবেই যেতাম। ঠিক সে মুহূর্তে অকস্মাৎ আমার মাথার ওপর থেকে এর গম্ভীর ফাঁকা এক আওয়াজ বাতাসে ভেসে কানে এলো। আওয়াজটা কানে আসার পরই আমার মনোবল যেন হঠাৎ বেড়ে গেল। আচমকা ওপরের দিকে চোখ ফেরাতেই বিচিত্র সেই দেবদূত আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল।
