সত্যি বলছি, আমার যেন পরিষ্কার মনে হলো সে যেন কোচের নিচে দাঁড়িয়ে থেকে হাত-বাড়িয়ে আমার মশারিটা সামান্য ফাঁক করল। মদের বোতল খালি আর আমি যে তার প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতে গিয়ে চোখ-মুখ বিকৃত করে বিরক্তিকর শব্দ করেছিলাম, সে এখন তারই বদলানিচ্ছে।
আমি তার উদ্দেশ্য বুঝতে না বুঝতেই সে ঝট করে আমার মাথার ছড়ানো টুপিটাকে খুলে ফেলে দিল। আমি তো ব্যাপার দেখে ভিরমি খাওয়ার জোগাড় হলাম।
আমি আরও অবাক হলাম যখন দেখলাম, আমার গলার ভেতর দিয়ে একটা নল গলিয়ে দিয়ে তার বগলের নিচে ঝুলিয়ে রাখা বোতল থেকে কার্থওয়াসার বের করে আমার পাকস্থলিটাকে কানায় কানায় ভরে দিল। আমি সে বিশেষ পানীয়টার স্রোতে ভেসে যাওয়ার উপক্রম হলাম।
আমি যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলাম। আমার যন্ত্রণা যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেল, তখন আচমকা আমার স্বপ্ন ভেঙে গেল। ঘুম ভেঙে যাওয়ায় আমিনিদারুণ
অস্থিরতার শিকার হয়ে যন্ত্রচালিতের মতো দ্রুত বিছানার ওপর বসে পড়লাম।
জ্বলন্ত মোমবাতিটার দিকে চোখ পড়তেই আমি যারপরনাই অবাক হয়ে পড়লাম। দেখলাম, একটা ইঁদুর জ্বলন্ত মোমবাতিটাকে দাঁত কামড়ে ধরে পালাতে গিয়ে অঘটনটা ঘটিয়েছে।
মুহূর্তের মধ্যেই দম বন্ধকরা একটা উৎকট গন্ধ আমার নাকের ভেতর দিয়ে সোজা ফুসফুসে ঢুকে গেল। খুবই অস্বস্তির মধ্যে পড়লাম।
অস্থিরভাবে খাট থেমে নেমে খোলা জানালা দিয়ে বার কয়েক এদিক-ওদিক চোখ ঘোরাতেই বুঝতে পারলাম, বাড়িতে আগুন লেগে গেছে। মিনিট কয়েকের মধ্যে বাড়ির সর্বত্র দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে লাগল। সম্পূর্ণ বাড়িটাই জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে।
আমি উন্মাদের মতো চারদিকে তাকিয়ে পরিস্থিতিটা সম্বন্ধে আঁচ করে নিতে গিয়ে নিঃসন্দেহ হলাম, জানালা ছাড়া অন্য কোনো পথেই আমার পক্ষে ঘরটা থেকে বেরনো সম্ভব নয়।
তবে পরমুহূর্তেই দেখতে পেলাম, পল্লীবাসীরা লম্বা একটা মই জোগাড় করে এনে আমার জানলায় রাখল।
মইটা জানালায় লাগতে না লাগতেই আমি উম্রান্তের মতো মইটার দিকে ছুটে গেলাম। মুহূর্তমাত্র সময় নষ্ট না করে সেটা বেয়ে তর তর করে নিচে নেমে যেতে লাগলাম।
মইটা বেয়ে আমি কিছুটা নেমে যেতেই হঠাৎ একটা নাদুসনুদুস শুয়োরকে দেখে থমকে গেলাম। তার ইয়া মোটা পেট আর দৈহিক গঠন দেখেই প্রথমেই যার কথা আমার মনে পড়ল–সে আর কেউ না ওই অদ্ভুত দেখতে দেবদূত।
বিশালদেহী শুয়োরটা পানি-কাদার মধ্য থেকে উঠে ঘোৎ ঘোৎ করতে করতে এসে আমার মইটার গায়ে পরম আনন্দে গা ঘষতে আরম্ভ করল। ব্যাপার দেখেই তো আমার আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে পড়ার জোগাড় হলো। মিনিট খানেকের মধ্যেই প্রমাণ হয়ে গেল, আমার ভীতিটা অমূলক নয়। বরং যা আশঙ্কা করেছিলাম, কার্যত ঘটলও ঠিক তাই। মইটার সঙ্গে আমিও হুড়মুড় করে পথে আছাড় খেয়ে পড়ে গেলাম। ব্যস, যা ঘটার ঘটে গেল। আমার একটা হাত ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।
এবার আমি বাস্তবিকই মহাফাপড়ে পড়ে গেলাম। বীমার জন্য ক্ষতি, মাথার সব চুল পুড়ে ছাই হয়ে যাবার জন্য ক্ষতি–বাস্তবিকই দুর্ঘটনাটা আমাকে দুর্ভাবনার সাগরে ছুঁড়ে দিল। আর আমি বে-সামাল পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে রীতিমত খাবি খেতে লাগলাম।
কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হয়ে হাপিত্যেশ করতে করতে আমি মনস্থির করে ফেললাম, এবার একটা সহধর্মিনী গ্রহণ না করলে আর চলছে না।
আমার পরিচিত গণ্ডির মধ্যেই এক বিধবা অপরূপ সুন্দরি–অকালে স্বামী রত্নটাকে খুইয়ে বড়ই মর্মপীড়ার মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। এক নজর তাকে দেখলেই শরীর ও মন রোমাঞ্চে ভরে ওঠে।
আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, যাকে প্রতিজ্ঞাও বলা চলে–সে রূপসি যুবতি বিধবাটার ক্ষতস্থানে যেন শান্তির প্রলেপ দিয়ে দিল।
আমি সদ্য স্বামীহারা সে বিধবা যুবতির কাছে আমার অভিলাষের কথা ব্যক্ত করতেই সে বার কয়েক আমতা আমতা করে হলেও শেষমেশ আমার টোপটা গিলল। আমার প্রস্তাবে পুরোপুরি মতো দিয়ে দিল।
আমার আকাঙ্ক্ষিতার সম্মতি পাওয়ায় আমি যেন আকাশের চাঁদকে হাতের মুঠোর মধ্যে পেয়ে গেলাম। মহাবিস্ময় ও পুলকানন্দে স্তবস্তুতি করতে করতে আমি সটান তার পায়ের কাছে পড়ে গেলাম।
আমার অবস্থা দেখে তিনি লজ্জায় মিইয়ে গিয়ে নিজের কালো চুলের গোছাটা দিয়ে আমার মাথার ধার করা পরচুলোকে ঢেকে দিল।
ব্যাপারটা যে কিভাবে ঘটেছিল তা আমার পক্ষে বলা বাস্তবিকই কঠিন। আমি যখন উঠে সোজাভাবে দাঁড়ালাম তখন দেখলাম অত্যাশ্চর্য, একেবারেই অবিশ্বাস্য এক কাণ্ড! আমার মাথার পরচুলা যেন ভোজবাজির মতো কোথায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। আর সে জায়গায় রয়েছে কুচকুচে কালো চুল।
আর সে বিধবা যুবতি? তিনি মাথার অর্ধেকটা অন্যের চুলে ঢাকা রয়েছে। আর তা দেখেই তিনি সক্রোধে রীতিমত হম্বিতম্বি শুরু করে দিলেন। রাগে, ঘৃণায় আর অপমানে তার সর্বাঙ্গ থরথরিয়ে কাঁপছে।
ব্যস, বিধবা যুবতিটাকে সহধর্মিনী হিসেবে পাওয়ার আকাঙ্খটা এভাবেই এমন একটা অঘটনের মাধ্যমে চিরদিনের মতো নিঃশেষ হয়ে গেল। যাকে একেবারেই অভাবনীয় ছাড়া কিছুই ভাবা সম্ভব নয়।
তবে এও সত্য যে, স্বাভাবিক কার্য-কারণের ব্যাপারটা ঘটেছিল।
আমি কিন্তু এতেই হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিলাম না, বরং তার চেয়ে কম নির্মম, নিষ্ঠুর কোনো এক নারীকে পটিয়ে আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ করার জন্য আদাজল খেয়ে লেগে গেলাম।
