সে বোতলটা সামান্য কাৎ করতেই তার গায়ে সাটা একটা লেবেল আমার নজর এড়াল না। তাতে বড়-বড় হরফে লেখা রয়েছে–কার্যওয়াসার কথাটা।
আগন্তুক বিচিত্র দেবদূতের মমত্ববোধ আমাকে মুগ্ধ করল। ফলে আমার ক্রোধ অনেকাংশে লাঘব হয়ে গেল। আর আমার মদের গ্লাসে একাধিকবার পানি মিশিয়ে দিয়েও সে মন জয় করে নিল। ফলে আমার মন মেজাজ স্বাভাবিক হয়ে এলো। এবার সে যে অসাধারণ একটা ভাষণ দিল তা-ও আমি মন দিয়ে শুনলাম। সে যে কি বলল, তা পুরোপুরি বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে যেটুকু হৃদয়ঙ্গম করতে পারলাম তা হচ্ছে, সে হচ্ছে একজন অশুভ শক্তির সাক্ষাৎ-নিয়ন্তা। আর সে এসব বিচিত্র দুর্ঘটনায় লিপ্ত থাকে যা নাস্তিকদের মনে বিস্ময় জাগিয়ে তোলে, অস্থির করে ফেলে।
আমি তার কথা অবিশ্বাস করায়, তার কাজে বাধা সৃষ্টি করায় সে চটে এমন রুদ্রমূর্তি ধারণ করল যাতে শেষপর্যন্ত আমি ঘাবড়ে গিয়ে সামলেসুমলে নিতে বাধ্য হলাম। আর সে-ও মওকা পেয়ে এক নাগাড়ের বকবকানি শুরু করে দিল। রীতিমত কথার ফুলঝুরি।
তার ভাষণ চলতেই লাগল। আমি কোনোরকম বাধা না দিয়ে চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে পরমানন্দে এলাচি চিবুতে ব্যস্ত রইলাম।
কিন্তু আমার এ আচরণটা দেবদূতের পছন্দ হলো না। সে হঠাত্র রেগে একেবারে অগ্নিমূর্তি ধারণ করল। রাগ সামলাতে না পেরে সে দুহাতে নিজের চোখ দুটো ঢেকে মোক্ষম একটা অভিশাপ আমাকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে দিল। আর রাগে কাঁপতে কাঁপতে এমন ভাষায় আমাকে শাসাল, ভয় দেখাল যে তার অর্থ একটা বর্ণও আমি বুঝতে পারলাম না।
শেষপর্যন্ত অদ্ভুতদর্শন দেবদূত নতজানু হয়ে আমাকে অভিবাদন জানিয়ে আর্চবীশপ জিল-ব্লাসের ভাষায় আমার মঙ্গল কামনা করল। আমার কাছ থেকে হাসিমুখে বিদায় নিয়ে পথে নামল।
আমি কিন্তু এতে তেমন খুশি হতে পারলাম না। বরং সে চলে যাওয়ায় আমি কেমন একটা অবর্ণনীয় অস্বস্তিই বোধ করতে লাগলাম।
পর পর কয়েক গ্লাস মদ উদরস্থ করায় শরীরে ঝিমুনি অনুভব করলাম। ঘুমে চোখের পাতা দুটো জড়িয়ে আসতে লাগল। ফলে ঘুমিয়ে পড়লাম।
মিনিট পনের-বিশ ঘুমিয়ে নিলাম।
ছয়টায় এক জায়গায় আমার যাবার কথা। খুবই জরুরি দরকার। যত অসুবিধাই থাক না কেন যেতে আমাকে হবেই। আমার বসতবাড়ির বীমার পলিসির মেয়াদ গতকাল শেষ হয়ে গেছে। এ নিয়ে কিছু গোলযোগের সূত্রপাত হয়েছে। তাই কথা বলে স্থির করেছি ঠিক ছয়টায় কোম্পানির বোর্ড অব ডিরেক্টরদের সঙ্গে দেখা করে আমি বীমার পলিসি নবীকরণ করিয়ে নেব।
ঘাড় ঘুরিয়ে ম্যান্টেলপিসের ওপরে রক্ষিত ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বুঝে নিলাম, এখনও পঁচিশ মিনিট সময় হাতে আছে।
এখন পাঁচটা ত্রিশ মিনিট। হেঁটে মাত্র পাঁচ মিনিটে বীমা কোম্পানির দপ্তরে পৌঁছে যেতে পারব। আর আমার দিবান্দ্রিা কোনোদিনই পঁচিশ মিনিটের বেশি স্থায়ী হয় না। তাই খুবই নিশ্চিতে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। উদ্দেশ্য ঘুম থেকে উঠেই বীমা কোম্পানির দপ্তরের উদ্দেশ্যে হাঁটা জুড়ব।
হঠাৎ আমার ঘুম চটে গেল। হুড়মুড় করে উঠে বিছানায় উঠে পড়লাম। ঘড়িটার দিকে চোখ পড়তেই অবাক হয়ে গেলাম। দেখলাম মাত্র তিন মিনিট আমি ঘুমিয়েছি। কারণ আমার হাতে এখনও সাতাশ মিনিট সময় রয়ে গেছে। অবাক হবার মতো ব্যাপারই বটে, মনে হলো বেশ কিছু সময় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলাম। কিন্তু কার্যত দেখা যাচ্ছে, মাত্র তিন মিনিট আমি ঘুমিয়ে কাটিয়েছি। আবার বিছানায় শরীর এলিয়ে দিলাম। অচিরেই ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম।
দ্বিতীয় বার যখন ঘুম ভাঙল তখন ঘড়ির দিকে চোখ ফিরিয়েই সচকিত হয়ে বিছানায় সোজা হয়ে বসে পড়লাম। দেখলাম সাড়ে সাতটা বাজে।
ঘড়িটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই স্বগতোক্তি করলাম–সাড়ে সাতটা বেজে গেছে। এখন না গিয়ে কাল সকালে বীমা কোম্পানির দপ্তরে গিয়ে বিলম্বের জন্য
মার্জনা ভিক্ষা করেনিলেই ল্যাঠা চুকে যাবে। কিন্তু ব্যাপারটা কেমন হলো। ঘড়িটা কোনো-না-কোনোভাবে বিকল হয়ে যায়নি তো? খাট থেকে নেমে ম্যান্টেলপিসের ওপর থেকে ঘড়িটাকে নামিয়ে আনলাম। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে সহজেই নজরে পড়ল, মেওয়া খাওয়ার সময় তার খোসাগুলো ঘরের মেঝেতে ফেলেছিলাম। তাদেরই একটা কণা বাতাসে উড়ে গিয়ে কাঁচের ফাঁক দিয়ে ডায়ালে ঢুকে গিয়ে মিনিটের কাঁটাটার গতি রোধ করে দিয়েছে। ফলে সেটা সে মুহূর্ত থেকেই একই জায়গায় থমকে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
আপন মনেই বলে উঠলাম–ধ্যুৎ! এ ব্যাপার। একে নিছকই একটা অঘটন বলা যায়। এরকম ব্যাপার তো যে কোনো মুহূর্তেই ঘটতে পারে।
ঘড়ির ব্যাপারটাকে সামান্যতম আমল না দিয়ে আমি আবার বিছনায় কাৎ হয়ে পড়লাম।
হাত বাড়িয়ে শিয়য়ের কাছে ছোট পড়ার টেবিলটায় একটা মোমবাতি জ্বালালাম। এবার ঈশ্বর সর্বভূতে বিরাজমান বইটা টেনে নিলাম। বইটাকে খুলে চোখের সামনে ধরলাম। কিন্তু বেশিদূর অগ্রসর-হওয়া সম্ভব হলো না। আমি বিশ সেকেন্ডের মধ্যেই ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম। মোমবাতিটা জ্বলেই চলল।
কখন যে আমি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম বলতে পারব না। তবে এটুকু অন্তত বলতে পারি, ঘুমিয়ে পড়ার অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই যে বিচিত্র দেবদূত বার বার আমার সামনে হাজির হতে লাগল।
