আমি নীরবে মাথা ঝাঁকালাম।
সে বলেই চলল–আমার পরিচয় মুখ ফুটে নাই বললাম। একটু পরেই আমার পরিচয় তুমি স্বচক্ষেই চাক্ষুষ করতে পারবে। আর সে জন্যই আমি এখানে হাজির হয়েছি, বুঝলে?
আমি নির্দিধায় বললাম–তুমি একটা আস্ত মাতাল। একজন পয়লা নম্বরের ছন্নছাড়া বাউণ্ডুলে। আমি এখনই ঘণ্টা বাজিয়ে আমার পরিচারককে ডাকব। তাকে বলব, যেন লাথি মেরে তোমাকে সদর দরজার বাইরে, একেবারে রাস্তায় পৌঁছে দিয়ে আসে।
হতচ্ছাড়া আগন্তুকটা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে হো-হো করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতেই বলল–আমি ভালোই জানি এ তোমার কর্ম নয়। তুমি পারবে না, কিছুতেই না।
আমি ভ্রূ কুঁচকে বললাম–কী বললে, পারব না!
অবশ্যই না। বললামই তো তুমি ও কাজ কিছুতেই করতে পারবে না।
কী পারব না? আমি কি করতে পারব না? তুমি কী বলতে চাইছ? সাক্ষাৎ শয়তানের মতো ফিকফিক করে হেসে সে এবার বলল–ওই কাজ, মানে ঘণ্টাটা বাজাতে পারবে না?
তার কথাটা শুনেই আমি সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করলাম।
কিন্তু হতচ্ছাড়াটা আমাকে কিছুতেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে দিল না। আমি চেয়ারের আশ্রয় ছেড়ে ওঠার চেষ্টা করা মাত্র সে তার শক্ত বোতলের হাত দিয়ে আমার কপালে আচমকা এমন সজোরে একটা আঘাত হানলো যার ফলে আমি আবার ধপাস করে চেয়ারটার ওপর বসে পড়লাম।
তার কাণ্ড দেখে আমি কপালের ব্যথা-বেদনার কথা ভাবার অবকাশই পেলাম না। এতই অবাক হলাম যে, হঠাৎ করে বুঝে উঠতে পালাম না এ মুহূর্তে আমার কর্তব্য কি?
আমি মুখ খোলার আগেই লোকটা বিশি স্বরে হেসে বলল কি হে, ব্যাপারটা তো নিজের চোখেই দেখলে। এখন যা বলছি, লক্ষ্মী ছেলের মতো শোন, এখানে চুপটি করে বসে থাক। এবারই জানতে পারবে, আমি কে–কি আমার পরিচয় কী?
আমি তার দিকে নীরব চাহনি মেলে তাকিয়ে রইলাম। সে বলেই চলল–আমার পরিচয় জানতে চাইছ, তাই না? ভালো কথা, আমার দিকে তাকাও। হ্যাঁ, তাকাও দেখ! আমিই কদাকার অদ্ভুত দেবদূত।
আমি বুকে সাহস সঞ্চয় করে বলে উঠলাম–হ্যাঁ, রীতিমত বটে! তুমি নিজেকে দেবদূত বলে পরিচয় দিচ্ছ? দেবদূতের একজোড়া পাখা থাকে বলেই তো আমি জানতাম।
পাখা! ডানা! রেগে একেবারে আগুন হয়ে গিয়ে সে এবার খেঁকিয়ে উঠল– আমার ডানার কি দরকার হে! হায় ঈশ্বর! হায় আমার কপাল! তুমি কী ভেবেছ, আমি একটা মুরগির ছানা? আমার সম্বন্ধে তোমার ধারণাটা কী খোলসা করে বলতো?
আমি ভয়ে মুখ কাচুমাচু করে আমতা আমতা করতে লাগলাম–আরে না, না, তুমি অবশ্যই মুরগির ছানা নও। তোমার সম্বন্ধে আমি ভুল ধারণা করেছি।
বহুৎ আচ্ছ। তাই যদি হয় তবে চেয়ারটায় চুপটি করে বসে থাক। আর কথা বলার সময় আগপাছ চিন্তা করে তবেই কথা বলবে, বুঝলে বাছাধন। আর যদি হম্বিতম্বি করার চেষ্টা কর তবে আবার এমন এক ঘা বসিয়ে দেব যে, একেবারে দফা রফা হয়ে যাবে।
আর কিছু বলার মতো সাহস আমার হলো না। বাধ্য হয়েই মুখে কুলুপ এঁটেই বসে রইলাম।
সে আগের মতো ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল–শোন আহাম্মক, পেঁচার ডানা লাগে, মুরগির ডানা লাগে আর ডানা দরকার হয় ক্ষুদে শয়তানের, ঠিক কিনা? দেবদূতের ডানা অবশ্যই থাকে না, আর আমি যে কিম্ভুতকিমাকার দেবদূত হে।
আমি ভয়ে ভয়ে হাত কচলে বললাম। বেশ তো, কিন্তু তুমি এখানে, আমার এখানে হানা দিয়েছ কেন? কোন দরকারে।
আমার মুখের কথা কেড়েনিয়ৈ আগন্তুক বলল–দরকার, কি কাজ? কি দরকারে? তুমি যে কী নিচ কূলের লোক তা ভেবে আমি অবাক হচ্ছি যে, একজন বিশিষ্ট ভদ্রলোককে অর্থাৎ এক দেবদূতকে জিজ্ঞেস করছ, এখানে কোন্ কাজে এসেছে। তুমি কেমন নিচ বংশোদ্ভুত এবং এক আহম্মক হে!
সত্যি বলছি, আগন্তুক দেবদূত হলেও তার কথাগুলোকে আমি স্বাভাবিকভাবে নিতে পারলাম না, বরং আসহ্যই মনে হলো। ক্রোধ সম্বরণ করতে না পেরে হাতের কাছে লবনের পাত্রটা পেয়ে সেটাকে যন্ত্রচালিতের মতো তুলে নিয়ে তার কপাল বরাবর ছুঁড়ে মারলাম। এমনও হতে পারে, আমার লক্ষ্য ঠিক ছিল না, নতুবা সে তড়াক করে একদিকে সরে গিয়েছিল। তাই লবনের পাত্রটা ছুটে গিয়ে দুম করে ম্যান্টেল পিসের ওপর রাখা ঘড়িটার গায়ে আঘাত হানলো যার ফলে মুহূর্তে তার ডায়ালটা ভেঙে গেল।
আগন্তুক দেবদূতের বদলা নিতে ছাড়ল না। সে আমার কপালে বোতল হাত দিয়ে দমাদম কয়েক ঘা হেঁকে দিল।
আঘাতের চোটে আমি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে গেলাম। বরং বাধ্য হলাম বলাই উচিত। স্বীকার করতে লজ্জায় মরে যাচ্ছি, বিরক্তিবশতই হোক, আর যন্ত্রণাতেই হোক, আমার চোখে দুটোর কোণে পানি ভিড় করল, কয়েক ফোঁটা পানি গলা দুটো বেয়ে মাটিতেও পড়ল।
আমার বেহাল পরিস্থিতি দেখে কদাকার দেবদূত সহানুভূতির স্বরে অনুচ্চকণ্ঠে বলল–হায় ঈশ্বর! লোকটা হয় অনেক দুঃখ-যন্ত্রণায় ভূগেছে, নতুবা গলা অবধি মদ গিলে একেবারে বে-হেড হয়ে গেছে।
মুহূর্তের জন্য থেমে আমাকে লক্ষ্য করে সহানুভূতির স্বরে এবার বলল শোন হে, এত কড়া মদ কেন যে গিলতে যাও, ভেবে পাই না। একটু পানি ঢেলে হালকা করে নিলেই তো পার। এই নাও, ভালো ছেলের মতো এটা খেয়ে ফেল। কান্না থামাও। এটা খেয়ে নাও।
কথা বলতে বলতে কদাকার অদ্ভুতদর্শন দেবদূত তার বোতল-হাত থেকে কিছুটা বর্ণহীন তরল পদার্থ আমার মদের গ্লাসে ঢেলে দিল।
