লেখাটা পড়া শেষ করেই আমি বিষণ্ণমুখে খবরের কাগজটাকে চোখের সামনে থেকে সরিয়ে ফেললাম। আসলে কাহিনীটা পড়ার পরই আমি রাগে ভেতরে ভেতরে দারুণ ফুঁসতে লাগলাম।
কেন যে আমার মধ্যে এমন আকস্মিক ক্রোধের সঞ্চার ঘটল তা আমারই জানা নেই, অন্য কাউকে বলার তো প্রশ্নই ওঠে না।
আমি হাতের কাগজটাকে সজোরে টেবিলে ছুঁড়ে মেরেই গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে উঠলাম–মিথ্যা কথা! নির্ভেজাল মিথ্যো কথা! লোককে বোকা হদা বানাবার ফন্দি ছাড়া আর কিছুই নয়। অন্য যে নিরেট বোকা পাঠকদের মনে চমক লাগিয়ে দিতে পারলেও আমার মতো বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ পাঠককে এমন একটা মনগড়া অদ্ভুত কাহিনী দাঁড় করিয়ে ধাপ্পা দেওয়া এত সহজ নয়।
মনে পুঞ্জিভূত ক্রোধটুকু অব্যাহত রেখে আমি আবার ক্রোধে স্বগতোক্তি করতে লাগলাম। এবার থেকে বিচিত্র বা অদ্ভুত শিরোনাম দেওয়া কোনো কাহিনীর দিকে আমি কোনোদিন ভুলেও ফিরে তাকাব না। কোনো সাংবাদিক এমন কোনো কাহিনী কানের কাছে ফিসফিস করে বললেও বিশ্বাস করব না, কোনোদিনই না।
হায় ঈশ্বর। হায় পোড়া কপাল, তুমি তবে কী বোকার মতো কথাটাই না বলে ফেললে।–কথা গোপন অন্তরাল থেকে এমন মিষ্টি মধুর কণ্ঠে উচ্চারিত হলো যা এর আগে কোনোদিনই শুনিনি। কথাটা শোনামাত্র আমার মনে কেমন খটকা লাগল, গোড়ার দিকে আমার মনে হল, আমার শোনারই ভুল, নুতবা কানে কোনো ভোঁ ভোঁ শব্দ করছে বলেই এমনটা বোধ হচ্ছে।
পরক্ষণেই নিজের মনের সঙ্গে দীর্ঘসময় ধরে বোঝাপড়া করার পর আবার ভাবলাম, তা-ই যদি হয় তবে এমন অর্থপূর্ণ কথাই বা কি করে সম্ভব। তাই ঘরে কে ঢুকেছে তা দেখার জন্য ঘাড় ঘুরিয়ে বার বার ঘরটার চারদিকে অনুসন্ধিৎসু নজরে তাকিয়ে নিলাম। ঘরে কেউ ঢুকেছে কি না তার আড়চোখে দেখে নেওয়াই আমার উদ্দেশ্য। না, কারও নজরে পড়ল না। নিঃসন্দেহ হলাম, কেউ নেই, আমার কাজের সাক্ষী কেউ নেই।
উফ! একটু আগে শোনা সে কণ্ঠস্বর।
সেই অবিশ্বাস, একেবারেই বিচিত্র যে কণ্ঠস্বরেই কে যেন এবার চঞ্চল–তুমি দেখছি মদের নেশায় শুয়োরের মতো একেবারে কুঁদ হয়ে রয়েছে হে! আমি তোমার পাশে, ধরতে গেলে প্রায় গা-ঘেঁষেই বসে তবু আমার অস্তিত্বই অনুভব করতে পারছ না? এ কী অবাক কাণ্ড হে?
তার কথাটা শেষ হতে না হতেই আমি চোখ তুলে সরাসরি তার মুখের দিকে তাকালাম। সম্পূর্ণ সত্য যে, আমার মুখোমুখি লোকটা অবস্থান করছে সেও দেখতে অদ্ভুত, বাউণ্ডুলে প্রকৃতির হলেও কিম্ভুতকিমাকার, ভাষায় বর্ণনা করা একেবারেই অসম্ভব নয়।
তার শরীরটার বিবরণ দিতে গিয়ে বলা যেতে পারে যে একটা মদের গ্লাস, একটা মদের নল, নইলে ওরকমই কিছু একটা, আরও যথাযথভাবে বলতে গেলে লোকটার চেহারার তুলনা একমাত্র ফলস্টাফের সঙ্গেই চলতে পারে। নিচের দিকে দুটো খিল… লাগিয়ে নেওয়া হয়েছে, যা দিয়ে পায়ের অভাব পূরণ করা যেতে পারে।
আর হাত? শরীরের কাঠামোর ওপর থেকে দুটো লম্বা, বোতল দুপাশে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর তার মাথা? দেহখাঁচার ওপরে একটা মদের পেয়ালার ওপর পুরু করে বস্তা জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আর নস্যির বড় কৌটোর মতো দুটো ছিদ্র মুখের দুপাশে করে দেওয়া আছে। আর সে ছিদ্র দুটো আমার দিকেই অবস্থান করছে। যা কিছু শব্দ উচ্চারিত হয়ে আমার শ্রুতিগোচর হচ্ছে সবই কিন্তু ওই ছিদ্র দুটো দিয়েই বেরিয়ে আসছে। আর সে শব্দ দুটো দিয়ে যেসব কথা বেরিয়ে আসে সবই সহজবোধ্য বলেই তার বিশ্বাস।
অবিশ্বাস্য বিচিত্র মূর্তিটা একই দুর্বোধ্য, অবোধ্যও বলা চলে। এবার বলল আমি তো তোমার ব্যাপার স্যাপার দেখে বড়ই অবাক হচ্ছি হে!
আমি মুখ তুলে তার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলাম।
সে আগের মতো চোখে মুখে বিস্ময়ের ছাপ একে বলতে লাগল–ধ্যুৎ! তুমি দেখছি, হাঁসের মতোই বোকা হাঁদা হে!
আমি তার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধই রাখলাম।
সে আগের কথার জের টেনে বলল–শোন, তুমি যদি নিছকই একটা বোকা না হতে তবে কী খবরের কাগজের পাতায় যে বক্তব্য ছাপা হয়েছে তাতে অবিশ্বাস করতে। আমার কথা শোন, ওসব সত্যি, সবই শতকরা একশো ভাগই সত্যি।
তার কথায় আমি কিছুটা হকচকিয়ে গেলেও কণ্ঠস্বরে গাম্ভীর্য এনেই বললাম–তুমি কে হে? কি তোমার পরিচয়?
সে কিছু বলল না। আসলে আমি তাকে কিছু বলার জন্য উপযুক্ত সময় না দিয়ে আমিই আবার বলতে লাগলাম আর তুমি এখানে ঢুকলেই বা কি করে তা-ও তো আমার মাথায় আসছে না। আর তুমি কি যে বলতে চাচ্ছ মথামু কিছু বুঝছি না। তুমি এখানে ঢুকলে কি করে এ মুহূর্তে এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।
আমার কথা শেষ হতেই মূর্তিটা আগের মতোই দুর্বোধ্য শব্দ ব্যবহার করে কি যেন বরে আমার কথার উত্তর দিল–শোন হে, আমি এখানে কিভাবে ঢুকেছি তা নিয়ে। তো হেতামার মাথাব্যথা হওয়ার কথা নয়। আর এটাও শুনে রাখ, আমি কি বলব আর বলবনা তা-ও তোমার ব্যাপার নয়। পুরোপুরি আমার, নিতান্তই আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার।
আমি তার চাছালোলা কথাগুলো শুনে সবিস্ময়ে তার মুখের দিকে নীরবে তাকিয়ে রইলাম।
সে আমাকে একই রকম অবাক করল–আমার সাফ কথা তুমি শুনে রাখ, আমার মন যা চায় তা-ই আমি বলতে পারি। আর বলবও ঠিক তা-ই। আর আমার পরিচয়, মানে আমি কে, তাই তো তুমি জানতে চাইছ, ঠিক কি না?
