ক্যাপ্টেন প্যান্ট নীরবে মুচকি হাসলেন। তিনি মুখ খোলার আগেই আমার খুল্লতাত বলে উঠলেন–সবই তো হল, কিন্তু ডাব এলো ডী’
ক্যাপ্টেন স্মিদার্টন এবার অপেক্ষাকৃত গলা চড়িয়ে বললেন–এবার ক্যাপ্টেন প্যান্টের কথাটা বিবেচনা করা যাক। কি বলেন?
ক্যাপ্টেন প্যান্ট ঘাড় তুলে তার দিকে নীরব চাহনি মেলে তাকালেন।
তিনি মুখ খোলার আগেই ক্যাপ্টেন স্মিদার্টন আবার বলতে আরম্ভ করলেন–‘হ্যাঁ, যে কথা বলছিলাম, অন্য দিকে ক্যাপ্টেন প্র্যান্ট যখন এখান থেকে আমার বিপরীত দিকে, অর্থাৎ ক্রমাগত পশ্চিমদিকে জাহাজ চালিয়ে, এক হাজার মাইল পাড়ি দিলেন তখন হলো এক ঘণ্টা–এভাবে ক্রমাগত জাহাজ চালাতে চালাতে যখন চব্বিশ ঘণ্টা জাহাজ চালানো হবে তখন দেখা যাবে তিনি চব্বিশ হাজার মাইল পাড়ি দিয়েছেন। অতএব দেখা যাবে লন্ডনের সময় থেকে তিনি পুরো একটা দিন পিছিয়ে পড়েছেন। ব্যাপারটা এবার খোলসা হলো তো?’
আমার বুড়ো হাড় গিলে কাকাটি নিতান্ত বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন।
ক্যাপ্টেন স্মিদার্টন পূর্ব প্রসঙ্গের জের টেনে বলে চললেন–‘এবার বুঝলেন তো, এভাবেই আমার কাছে গতকাল রবিবার ছিল। আর ক্যাপ্টেন এ্যান্টের কাছে হিসাব মতো আগামীকাল হবে রবিবার।
আমরা সবাই তার বিশ্লেষণ ক্ষমতা দেখে সবিস্ময়ে তার মুখের দিকে নীরব চাহনি মেলে তাকিয়ে রইলাম। তিনি বলে চললেন–‘মি. ক্যাবলাকান্ত, আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ কথা কি জানেন?
আমার পরম পুজ্যাস্পদ খুল্লতাত জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে তাঁর মুখের দিকে তাকালেন। ক্যাপ্টেন স্মিদার্টন আগের মতোই বলে চললেন–‘আরও গুরুত্বপূর্ণ কথাটা হচ্ছে, আমাদের প্রত্যেকের বক্তব্যই ঠিক। আর আমাদের একজনের ধারণা অন্যের ধারণার চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করার পিছনে কোনো দার্শনিক কারণ অবশ্যই থাকা সম্ভব নয়।
আমার হাড়গিলে বুড়ো খুল্লতাত উল্লসিত হয়ে বললেন–‘আরে বাবা! একী অদ্ভুত কথা শুনলাম! সত্যি আজ আমার চোখ খুলে গেছে! আরে কেট আর ববি, দেখ তো কী অদ্ভুত কাণ্ড! এখন বুঝছি, তোমরা ঠিকই বলেছ।’
কেট আর আমি সচকিত হয়ে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকালাম।
তিনি পূর্ব প্রসঙ্গের জের টেনে বলে চললেন–‘সত্যি, তোমাদের কথাই ঠিক, স্বীকার না করে উপায় নেই। ওই যে, তোমরা একটু আগে বলেছিল, আমার বিচার হচ্ছে, এটাই সত্যি। তবে মনে রেখো, আমি এক কথার মানুষ। আমার কথার নড়চড় হয় না। তোমার যেদিন, যখন খুশি কেটকে গ্রহণ করতে পার। জোভের নামে দিব্যি কেটে বলছি, সবই মিটে গেল। তিনটি রবিবার পর পর সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছে।
আমি কি করব, কী-ই বলব ভেবে না পেয়ে নীরবে তার পরবর্তী মন্তব্য শোনার জন্য অধীর প্রতীক্ষায় রইলাম।
তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে বললেন–‘আমি এবার যাচ্ছি; এ ব্যাপারে ডাবল এলো. ডী কোন্ মত দেন, আমার জানা দরকার। আমি চললাম। কথা বলতে বলতে তিনি থপ থপ আওয়াজ তুলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
দ্য অ্যাঞ্জেল অব দ্য অড
নভেম্বরের এক বিকেল।
নভেম্বরের শীতের এক বিকেল।
এইমাত্র আহার সেরে উঠেছি। খাদ্যবস্তুর মধ্যে প্রধানতম ছিল ক্ৰফে নামক ছত্রাকের একটা তরকারি। পেটের রোগীদের উপযুক্ত খাদ্য।
আহার সেরে আমি একাই খাবার ঘরের চুল্লির ঢাকনার ওপর পা দুটো রেখে আয়েশ করে সময় কাটাতে লাগলাম। হাতের নাগালের মধ্যেই ছোট টেবিলটার ওপর হরেক রকম মদের বোতল সাজানো রয়েছে।
সকাল থেকে একে একে টাকারম্যান লিখিত সিসিল, গ্রিসওল্ড লিখিত পুরাকীর্তিকথা, গ্লোভার লিখিত লিওনিডাম আর উইল্কির, এপিগোনিয়াড প্রভৃতি বই পড়ে কাটিয়েছি। তাই নির্দিধায় মেনে নিচ্ছি নিজেকে এখন যেন কেমন বোকা হাদা মনে হচ্চে। একটু পওে পরে লাফিও দিয়ে গলাটা ভিজিয়ে নিয়েছি, মনে-প্রাণ সতেজও করে নিয়েছি বটে।
না, লাফিও থেকে কোনো ফল পেলাম না। তাই হতাশ হয়ে হাত বাড়িয়ে একটা সংবাদপত্র টেনে নিলাম।
একের পর এক পাতা উলটে কুকুর বেপাত্তা, বাড়ি ভাড়া, শিক্ষানবীশ ও পত্নীদের বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ প্রভৃতি ব্যাপার-স্যাপারে চোখ বুলিয়ে সম্পাদকীয় পাতাটা খুললাম। আগোগোড়া পড়ার পর একটা বর্ণও বুঝতে না পেরে ভাবলাম, চীনা ভাষা। আবার গোড়া থেকে শেষ অবধি পড়েও তেমন ফল হলো না।
শেষপর্যন্ত আমার মধ্যে বিরক্তি জাগল। বিরক্তিবশত হাতের কাগজ ছুঁড়ে ফেলে দিতে গিয়ে থমকে গেলাম। আসলে নিচের লেখাটুকুর দিকে চোখ পড়তেই সেটাকে ফেলে দেওয়া সম্ভব হলো না।
মৃত্যুর উপায় অদ্ভুত এবং অগণিত। লন্ডন থেকে প্রকাশিত একটা খবরের কাগজে একটা বিচিত্র মৃত্যুর কথা ছাপা হয়েছে। লোকটা ফু-র সাহায্যে তীর ছোঁড়ার খেলায় মেতেছিল। খেলার পদ্ধতিটা হচ্ছে বেশ লম্বা একটা সুঁচের ছিদ্রে পশমের সূতো পরিয়ে সজোরে ফুঁ দিয়ে টিনের একটা নলের ভেতর দিয়ে বের করে লক্ষ্যভেদ করতে হবে।
খেলাটা বাস্তবিকই অত্যক্তৃত, তাই না? যা-ই হোক, খেলা শুরু হল, লোকটা ভুল করে বিপরীত দিকে সঁচটাকে রাখল। এবার সঁচটার গতি যাতে তীক্ষ্ণতর হয় সে জন্য ফুসফুস ভরে শ্বাস নিতে গিয়েই প্রমাদটা ঘটল। সূঁচ দ্রুত তার গলার ভেতরে ঢুকে গেল। মুহূর্তের মধ্যে সেটা গলার ভেতর দিয়ে সরাসরি ফুসফুসে হাজির হয়। ব্যস, মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই তাকে দুনিয়ার খেলা শেষ করে পরলোকে চলে যেতে হয়।
