‘আসলে আবেগের বশে আপনারা সবাই সবকিছু গোলমাল করে ফেলছেন দেখছি। আমি ভালোই জানি, রবার্ট এত ভুললামন নন। তবু তিনিও যেন সবকিছু গুলিয়ে ফেলছেন।’
‘সবই মেনে নিচ্ছি, কিন্তু আসল ব্যাপারটা কী?
‘যে রবিবার নিয়ে আপনারা এত কচলাকচলি করছেন, তা কিন্তু অবশ্যই আগামীকাল নয়–আজই তো রবিবার।
আমার পরম পূজ্যাস্পদ খুল্লতাত ক্যাবলাকান্ত মুহূর্তে মিইয়ে গিয়ে জিভ কেটে বললেন–দেখ দেখি কী কেলেঙ্কারি ব্যাপার, কী লজ্জার ব্যাপার দেখুন তো! সত্যি আমার সবকিছু কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে! ঠিক, ঠিক তো! আজই তো রবিবার!
ক্যাপ্টেন প্র্যান্ট তাদের কথার মধ্যে নাক গলালেন–‘দেখুন, আমি আগেই আপনাদের উভয়ের কাছেই মার্জনা ভিক্ষা করে নিচ্ছি। আমি কিন্তু এখনও দৃঢ়তার সঙ্গেই বলছি, আমার এত ভুল হয়ই না। তাই আমি এখনও বলছি আজ না, আগামীকালই রবিবার।
কেট কপালের চামড়ায় ভাঁজ এঁকে বললেন–‘কি বললেন? আগামীকাল রবিবার?
‘অবশ্যই! কারণ–
তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ক্যাপ্টেন স্মিদার্টন সবিস্ময়ে বলে উঠলেন–
‘আপনারা যে কি বলছেন আমার মাথায় যাচ্ছে না। আমি বলতে চাইছি, গতকাল কী রবিবার ছিল না।’
ক্যাপ্টেন স্মিদার্টন ছাড়া অন্য সবাই সমস্বরেই বলে উঠলেন–‘গতকাল গতকালই বটে। আপনি হেরে গেছেন।
আমার খুল্লতাত বললেন–‘আজ রবিবার, হ্যাঁ, আজই রবিবার। আমি কি এটা জানি না?’ ক্যাপ্টেন প্যান্ট বলে উঠলেন–‘না, আজ কিছুতেই নয়, আগামীকালই রবিবার।
স্মিদার্টন আবার মুখ খুললেন–‘আপনাদের সবারই মাথার দোষ দেখা দিয়েছে। আপনারা সবাই পাগল হয়ে গেছেন দেখছি। এই যে আমি এখানে, এই চেয়ারে বসে রয়েছি এটা যেমন সত্য আর আগামীকাল যে রবিবার ঠিক তেমনই সত্য।
কেট উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠে রীতিমত ফুঁসতে লাগল–‘আমি সবই বুঝতে পেরেছি। কাকা এটা কি আপনার বিচার সভা বসেছে নাকি? এখানে কি তোমার জ্ঞান বৃদ্ধির বিচার হচ্ছে?
‘হুম! আমার খুল্লতাত প্রায় অস্ফুটস্বরে উচ্চারণ করলেন।
কেট আগের মতোই ফুঁসতে ফুঁসতে এবার বলল–‘কাকা তর্কাতর্কি বাদ দিয়ে ব্যাপারটার নিষ্পত্তির দায়িত্ব আমার হাতে ছেড়ে দিন। দেখবেন, এক মিনিটের মধ্যেই কেমন অনায়াসেই ফয়সালা করে দিচ্ছি। প্রকৃতপক্ষে ব্যাপারটা কিন্তু পানির মতোই পরিষ্কার।
‘খুবই সহজ সরল।’
‘অবশ্যই। নিতান্তই সহজ সরল একটা ব্যাপার নিয়ে তোমরা এতগুলো লোক নিজেদের মধ্যে কথা-কাটাকাটিতে লিপ্ত হয়েছ। এখন আমি কি বলছি সবাই ধৈর্য ধরে শোন–ক্যাপ্টেন স্মিদার্টন বলছেন গতকাল ছিল রবিবার, ছিলও ঠিক তাই। অর্থাৎ তিনি ঠিকই বলেছেন–ববি, কাকা আর আমার বক্তব্য হচ্ছে, আজই রবিবার তিনিও ঠিক, আবার আমরাও ঠিকই বলছি। আবার ক্যাপ্টেন প্যান্ট এ দুটোর কোনো মতকেই সমর্থন করছেন না। তিনি বলছেন, আগামীকাল রবিবার। তাই হবে, মেনে নিচ্ছি। তিনিও ঠিকই বলেছেন। তবে কার্যত কি দেখা যাচ্ছে, বলুন তো?
প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিয়েই কেট এক এক করে সবার মুখের দিকে তাকাতে লাগল।
সবার মুখের ওপর মুহূর্তের জন্য চোখ বুলিয়ে নিয়ে কেট আবার সরব হল– ‘এখন দেখা যাচ্ছে, আসলে আমাদের সবার কথাই ঠিক, অর্থাৎ একটা সপ্তাহে তিনটি রবিবার হয়ে গেছে। আমাদের কারো কথা মিথ্যা নয়, কেউই কারো কাছে হেরে যাইনি, আপনারা কী বলেন?
কেটের কথা শেষ হলে সবাই একে অন্যের মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাতে লাগল।
মুহূর্তের জন্য থেমে স্মিদার্টন এবার মুখ খুললেন–‘ক্যাপ্টেন প্র্যান্ট, এটা কেমন কথা হল। কেট বাজিমাৎ করে দেবে? আমাদের ওপর দিয়ে টেক্কা মেরে এভাবে নাস্তানাবুদ করবে?
‘হ্যাঁ, কার্যত তা-ই তো দেখছি। বিমর্ষমুখে ক্যাপ্টেন প্র্যান্ট জবাব দিলেন।
স্মিদার্টন বলে চললেন–‘আমরা কী আহাম্মক! মি. ক্যাবলাকান্ত, এখন দেখা যাচ্ছে ব্যাপারটা এরকম আমরা, সবাই জানি, পৃথিবীর পরিধি চব্বিশ হাজার মাইল তাই না?
‘হ্যাঁ, তা তো আমরা অবশ্যই জানি।
‘এখন কথা হচ্ছে, পৃথিবীটা নিজের অক্ষের ওপরে চব্বিশ ঘণ্টা ধরে অনবরত চক্কর খেয়ে বেড়ায়। মানে পশ্চিম দিক থেকে পূর্বে চব্বিশ হাজার মাইল একবার পরিক্রমা করে। এবার আমার পরম পুজ্যাস্পদ খুল্লতাতর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তিনি বললেন–‘মি. ক্যাবলাকান্ত, আশা করি ব্যাপারটা এবার আপনার কাছে পানির মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে, কি বলেন?
আমার খুল্লতাতটি ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে ঘাড় কাৎ করে তার প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বললেন–‘অবশ্যই অবশ্যই, ডক্টর ডাব–‘
তাঁকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে ক্যাপ্টেন স্মিদার্টন বললেন–ক্যাপ্টেন প্যান্ট, তবে। ব্যাপারটা দেখা যাচ্ছে, এটা ঘণ্টায় এক হাজার মাইল গতিতে চলছে, তাই তো?’
‘হ্যাঁ, হিসেবে তো এরকমই দাঁড়াচ্ছে।
‘এবার মনে করুন, আমি এখান থেকে জাহাজে চেপে এক হাজার মাইল পূর্বদিকে গেলাম। তবে আমি অবশ্যই লন্ডনে এখানে লন্ডনে সূর্যোদয় আশা করব এক ঘণ্টায়। অতএব ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে আপনার এক ঘণ্টা আগে আমি সূর্যের মুখ দেখছি, ঠিক কি না?’
‘যা নির্ভেজাল বাস্তব তাকে তো অস্বীকার না করে উপায় নেই।
‘এবার যদি একই দিকে, অর্থাৎ পূর্ব-দিকেই আর এক হাজার মাইল গেলে, দুঘণ্টা আমি সূর্যোদয় আশা করব। তারপর একই দিকে, একই গতিতে ক্রমাগত চলতে থাকলে আমি সম্পূর্ণ পৃথিবীটাকে চক্কর মেরে আবার একই জায়গায় ফিরে আসব। তখন এক হাজার মাইল পূর্বদিকে অগ্রসর হবার ফলে আমি চব্বিশ ঘণ্টা আগে লন্ডনে সূর্যোদয় দেখতে পাব–এরকম প্রত্যাশা তো করা যাবে না। এবার আশা করি বুঝতে পারছেন, আপনার চেয়ে আমি এক ঘণ্টা এগিয়ে রয়েছি। ক্যাপ্টেন প্যান্ট, আমি কি মনে করতে পারি, ব্যাপারটা আপনাকে বোঝাতে পেরেছি?
